১৮ আগস্ট ২০১৯

উৎসব-ঐতিহ্যে দায়িত্ববোধ

-

বহু প্রাচীনকাল থেকেই সন গণনা প্রচলিত। যেমন সম্রাট বখতে নসরের জন্মতারিখ থেকে চালু হয় ব্যাবলনীয় সন, মিসর থেকে হিজরত করে বনি ইসরাইল যেদিন আজাদ হয়, সে দিন থেকে তাদের সন গণনা শুরু। গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা উজ্জয়িনীর কিংবদন্তি রাজা বিক্রমাদিত্য ভারতবর্ষে বিক্রমাব্দ চালু করেন খ্রিষ্টপূর্ব ৫২ অব্দে। ইয়েমেনের খ্রিষ্টরাজা আবরাহা যখন কাবাঘর ধ্বংস করতে হস্তিবাহিনী প্রেরণ করেছিল, তখন থেকে শুরু হওয়া সনকে আমুল ফিল বলা হতো।
ঈসায়ী বা ইংরেজি সনের প্রচলন হলো হজরত ঈসা আ:-এর জন্মদিন থেকে। সুতরাং দেখা যাচ্ছেÑ কোনো বিশেষ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সব ধরনের সন গণনার রেওয়াজ চলে এসেছে। কিন্তু আরব ভূখণ্ডে গোষ্ঠীগত বিভাজনের কারণে তাদের মাঝে সার্বজনীন গ্রহণযোগ্য কোনো সন বা বর্ষ ছিল না। যার কারণে আন্তর্জাতিক ব্যবসাবাণিজ্য ও লেনদেনের ক্ষেত্রে খ্রিষ্টপূর্ব ৭৫৩ অব্দে শুরু হওয়া রোমান সনই অনুসরণ করা হতো। ৬৩৯ খ্রিষ্টাব্দে কুফার গভর্নর হজরত আবু মুছা আল আশয়ারি রা: প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে সন-তারিখ নির্ধারণের জন্য তখনকার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ফারুক রা:-এর কাছে আবেদন জানান। তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে খলিফা ওমর রা: একটি নীতিনির্ধারণী সভা আহ্বান করেন। ওই সভায় বিভিন্ন প্রস্তাবের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে হজরত আলী রা: বিশ্বনবী সা:-এর হিজরতের বছরকে সন গণনার বছর নির্ধারণের আহ্বান জানালে সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। হিজরি সন বা ইসলামী বর্ষ গণনা শুরু হয় তখন থেকে।
হিজরির প্রথম শতাব্দী অর্থাৎ, ৭১১ খ্রিষ্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাশেম ভারতবর্ষে আগমন করেন। তখন থেকে ইসলামী সংস্কৃতির অন্যান্য উপাদানের মতো হিজরি সনও ভারতবর্ষে প্রবেশ করে। মোগল সম্রাট জালাল উদ্দীন মোহাম্মদ আকবর সিংহাসনে আরোহণের ২৮ বছর পর অর্থাৎ ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে তার রাজস্ব কর্মকর্তা পণ্ডিত আমির ফতেহ উল্লাহ শিরাজিকে স্থানীয় পরিবেশ ও ফসল তোলার সাথে সঙ্গতি রেখে একটি নতুন অব্দ চালু করার নির্দেশ দেন। অমাত্য শিরাজি উদ্ভাবিত নতুন অব্দ বা সনই হচ্ছে বাংলা সন। যা কার্যকর হয় ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাটের সিংহাসনে আরোহণের বছর থেকে। সেটি ছিল ৯৬৩ হিজরি সন। হিজরি চন্দ্রাব্দ। কিন্তু আকবর যে অব্দ প্রবর্তন করেন, তা হচ্ছে সৌর অব্দ। ফসল উৎপাদনের সাথে সৌর অব্দের বিশেষ সঙ্গতি থাকে বলেই সম্রাট আকবর তা গ্রহণ করেন। হিজরি সনকে সৌর সনে রূপান্তর করে বাদশাহ আকবরই বাংলা সালের প্রবর্তক বলে মত দিয়েছেন বেশির ভাগ ইতিহাসবিদ, পণ্ডিত-মনীষী ও জ্যোতির্পদার্থ বিজ্ঞানীরা। এ সন প্রচলনের উদ্দেশ্য ছিল খুবই মহৎ এবং গরিব হিতকর। জনসাধারণ ফসল ঘরে তুলে তা বিক্রি করার পর যাতে অনায়াসে খাজনা দিতে পারে এবং অর্থাভাবে কেউ কষ্ট না পায় সে দিকটি বিবেচ্য ছিল। তাই ফসল তোলার সাথে সম্পর্কিত হওয়ার কারণে একে ফসলি সনও বলে থাকে। কোনো একসময় বাংলাদেশের কৃষকের মুখ্য ফসল ছিল আমন ধান। এ ধান অগ্রহায়ণ মাসে কৃষকের ঘরে উঠত। এ কারণে তখন বছরের প্রথম মাস হিসেবে ধরা হতো অগ্রহায়ণকে। কিন্তু এখন আমরা বৈশাখকেই বাংলা সনের প্রথম মাস হিসেবে নির্ধারণ করেছি। উৎসবের দিন হিসেবে ১ বৈশাখ আমাদের কাছে অতি প্রিয়। বিশাখা থেকে বৈশাখ। রুদ্র হলেও বৈশাখ মাধব, সে কারণে এ মাসে আমের মুকুল দৃশ্যমান হয়। হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। ৯৬৩ হিজরির মহররম মাসের সময় ছিল বাংলা মাসের বৈশাখ। যেহেতু হিজরি সন বাংলা সনের জননী, সেহেতু বৈশাখ হয়ে গেল মহররম মাসের মতোই বাংলা সনের প্রথম মাস।
নাজির আহমেদ ‘প্রাচীন বাংলার ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, সুবেদার ইসলাম খাঁ চিশতি ঢাকাকে রাজধানী হিসেবে রূপ দেয়ার প্রাক্কালে পয়লা বৈশাখকে উৎসবের দিন ঘোষণা করেন। এর পর থেকে প্রতি বছর পয়লা বৈশাখে তার বাসভবনের উঠোনে প্রজাদের সাথে কুশল বিনিময়, মিষ্টি বিতরণ ও ভোজসভার আয়োজন করা হতো। নতুন জামাকাপড় পরে আধিকারিক, জমিদার, ব্যবসায়ীসহ সব শ্রেণী-পেশার মানুষ মিলেমিশে একাকার। প্রজারা খাজনা আদায়ের পর অংশ নিতেন লোকগাথা, কাবাডি ও গরু-মহিষের লড়াইয়ে। ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ হালখাতা শেষে খরিদ্দারদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করাতেন। মানুষ মন খুলে প্রাণ খুলে আনন্দে মেতে উঠতেন।
দক্ষিণ এশিয়ার নেপাল এবং মিয়ানমারে নববর্ষের সূচনা হয় বৈশাখ মাসে। শ্রীলঙ্কায় সিংহলি বর্ষপঞ্জি হিসেবে ১৪ এপ্রিল বর্ষ শুরু। ত্রিপুরাতে নববর্ষ পালন করে ত্রিপুরাব্দ মোতাবেক ১৫ এপ্রিল। সুতরাং দেখা যাচ্ছে- নববর্ষ আসে বৈশাখে উপমহাদেশের অন্যান্য এলাকাতেও। বিশেষ করে পূর্ব ভারতে। বৈশাখকে ঘিরে নববর্ষ উদযাপন আমাদের পাহাড়ি এলাকার নৃগোষ্ঠীর মাঝেও বিদ্যমান। ঐতিহ্যবাহী ‘বৈসাবি’ উৎসব পালন প্রধান তিনটি নৃগোষ্ঠীর মাঝে পরিলক্ষিত হয়। বৈসু থেকে (বৈ), সাংগ্রাই থেকে (সা) আর বিজু থেকে (বি) শব্দত্রয়ের মিলিত রূপ ‘বৈসাবি’। বাংলাদেশের সব নাগরিকের কাছে বৈশাখের প্রথম দিন যেমন উৎসবের, তেমনি দরিদ্র মানুষের প্রতি দায়িত্বেরও। যে উদ্দেশ্য নিয়ে মোগল সম্রাট আকবর হিজরি সনের তারিখ অনুযায়ী পারস্যের সাফাভিদ রাজাদের সৌর অব্দ অনুকরণ করে বাংলা সন প্রবর্তন করেছিলেন, তা অবশ্যই মনে রাখা উচিত। উৎসবে অবশ্যই আনন্দ অভিরুচি থাকবে। কিন্তু সেটা কোনোভাবে যেন অর্থ-বিত্তশালীদের হাতের মুঠোয় চলে না যায়। খেয়াল রাখতে হবে, কারো আনন্দ যেন কারো বেদনা বা বিরক্তির কারণ না হয়। আমরা নববর্ষে সুন্দর, রুচিশীল, পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করব। সম্ভব হলে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে পরিচ্ছন্ন পরিবেশে মানসম্মত খাওয়াদাওয়ার আয়োজন হবে। (পান্তা-ইলিশের নামে গরিবের প্রতি উপহাস নয়)। সারা দিন পরিবার পরিজনসহ সবুজ অঞ্চল, অটবি, বড় হৃদের তটভূমিতে কিংবা অভয়ারণ্যে ঘুরে বেড়ানো, সাঁতার কাটা, সুযোগ পেলে বই পড়া ইত্যাদি। এ ধরনের Journey তে শিশুদের প্রতি খেয়াল রাখা এবং তাদের খুশি করার চেষ্টা থাকা বাঞ্ছনীয়। সবাই মিলে আনন্দ করার সময় যেটা অত্যন্ত জরুরি সেটা হচ্ছেÑ অন্য কারো ধর্মীয় এবং পার্থিব জীবনে সমস্যার সৃষ্টি হয় এমন কিছু না করা। সময় ও অর্থের অপচয় হচ্ছে কি না সেটাও মনে রাখতে হবে। আবার বিনোদনের সীমারেখা থাকা খুব বেশি প্রয়োজন। যাতে কোনো ধরনের পাপাচার আমাদের স্পর্শ করতে না পারে।
আজ অনুশোচনার ভাষা নেই। আমরা প্রতি পদে পদে, পলে পলে, অবিচারে-পাপাচারে লিপ্ত হচ্ছি। জাতি হিসেবে নিজস্ব ঐতিহ্য, গৌরব, চেতনা ভুলে গিয়ে, স্বকিয়তা হারিয়ে বিজাতীয় অপসংস্কৃতির প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছি। স্যাটেলাইট বেহায়াপনার বিস্তার ঘটিয়েছে। যৌন উত্তেজনাকর বিজ্ঞাপন কোথায় নেই। ইন্টারনেট অভিশাপ হয়ে নৈতিকতা হরণ করছে। আমেরিকা, ইউরোপ, ভারতীয় মিডিয়ার মারফতে তাদের রুচিহীন সংস্কৃতি বিরতিহীনভাবে আমাদের ধ্যান-ধারণা, মননে-মগজে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। মিডিয়ায় প্রকাশ্যে অতি আধুনিক হতে গিয়ে নারী-পুরুষের পোশাক-আশাক শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করছে। সামাজিক মূল্যবোধপরিপন্থী এসব কাজ জাতীয় অগ্রগতি ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। হ
লেখক : রাজনৈতিক কর্মী


আরো সংবাদ

মিরপুরে বস্তির ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য ও পুনর্বাসনের দাবী জামায়াতের গৃহবধূকে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগে স্বামী আটক হত্যার আগে শিক্ষিকা জয়ন্তীকে ধর্ষণ করে ছিলো ডিস লাইনম্যানরা ময়মনসিংহে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২ বাংলাদেশকে পরাশক্তি বানাতে চান ডোমিঙ্গো বাস-সিএনজি সংঘর্ষে একই পরিবারের ৬ জনসহ নিহত ৮ বিশ্বাস নেই, তাই ১০ কোটির প্রস্তাবে না শিল্পার পাকা না হওয়ায় রাস্তায় ধানের ‘চারা’ রোপণ করে এলাকাবাসীর প্রতিবাদ ঈদের ছুটি কাটাতে ভারতগামী যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় বেনাপোলে বাবা-মাকে পিটিয়ে ১৩ বছরের মেয়েকে তুলে নিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ ‘কিছু বিষয় যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, ওইভাবে আসলে কিছুই হয়নি’

সকল




bedava internet