১৮ আগস্ট ২০১৯

সরকার কি দুর্নীতি নির্মূল করতে পারবে?

-

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বনের কথা বলেছেন। কিন্তু জনমনে প্রশ্ন : সরকার দুর্নীতি নির্মূল করতে পারবে কি? দুর্নীতি যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে দুর্নীতিকে উচ্ছেদ করা দুরূহ কাজ হয়ে উঠেছে। জাতির ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা দুর্নীতিকে যদি এ মুহূর্তে আঘাত করা না যায়, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ হয়ে উঠবে খুবই দুর্বিষহ। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতি ডালপালা বিস্তার করেছে এবং ঋণখেলাপির দৌরাত্ম্য দিন দিন বাড়ছে। আর্থিক খাতে অব্যবস্থাপনা সীমাহীন ঋণখেলাপি এখন দেশের আরেকটি আপদ। কিভাবে ব্যাংকের টাকা পকেটে পুড়ে খেলাপি হওয়া যায় তার প্রতিযোগিতা চলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যাংক খাত থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেয়া শতাধিক গ্রহীতার হদিস মিলছে না। নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করে তারা গা ঢাকা দিয়েছে। অনেকে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। এসব ঋণগ্রহীতা নিয়ে বিপাকে পড়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো। এক দিকে তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, অন্য দিকে এসব ঋণগ্রহীতা ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছে। এমন প্রতারণার সাথে জড়িয়ে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি খাতের ব্যাংকের কিছু পরিচালক। তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের অসৎ কর্মকর্তাদেরও যোগসাজস রয়েছে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
আরো জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে ঋণ জালিয়াতির অভিনব পদ্ধতি হচ্ছেÑ একটি কোম্পানির সব ধরনের কাগজপত্র সঠিকভাবে উপস্থাপন করে ঋণ নেয়া। এ ঋণ নেয়ার সময় ওই কোম্পানির বিপরীতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে অনুমোদনের অতিরিক্ত অর্থ তুলে নেয়ার ঘটনা ঘটেছে। এমনকি পুরোপুরি ভুতুড়ে অ্যাকাউন্ট করে কোটি কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে। ঋণ জালিয়াতির আরেকটি পদ্ধতি এখন এসএমই তথা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত। এ খাতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ জোর দেয়ার কারণে কর্মকর্তারা ভুয়া মর্টগেজ ঋণ তৈরি করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই জনতা ব্যাংক কয়েক হাজার কোটি টাকা এসএমই ঋণ দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে বিষয়টি ধরা পড়ে। একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ৪১৮ কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক আটকও করে। কারণ, এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংক থেকে করপোরেট ঋণ গ্রহণ করেন, তাতে থাকে না কোনো নিরাপত্তা গ্যারান্টি। সে কারণে ভুয়া নামে ব্যাংক ঋণ বাড়ছে। একই কারণে বাড়ছে খেলাপির পরিমাণও। আদালতে মামলা গড়ালেও তা স্থগিত করে প্রভাবশালীরা এ সুবিধা নিয়ে থাকেন। এর মধ্যে আবার ৪৫ হাজার কোটি টাকা অবলোপন করা হয়েছে। অর্থাৎ পাঁচ বছরেও আদায় না হওয়ায় এসব মন্দ ঋণ ব্যাংকের মূল খাতা বাদ দিয়ে আলাদা খাতায় নেয়া হয়েছে। এটা অর্থনীতির জন্য দুসংবাদ।
আইনি নানা ফাঁকফোকড়ের মাধ্যমে খেলাপিরা পার পেয়ে যাওয়ায় দিন দিন ঋণখেলাপিরা পার পেয়ে যাওয়ায় খেলাপি ঋণ ও ঋণ আত্মসাতের ঘটনা বাড়ছে। টিআইবির গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ২০১৮ সালে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান ১৩তম। আগের বছরে ছিল ১৭তম। অবশ্য ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে আমাদের অবস্থার অবনতি ঘটেছে। বাংলাদেশে দুর্নীতি চার ধাপ বেড়েছে। এ দিকে দুর্নীতি দমন কমিশরের (দুদকের) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেছেন, ‘দুর্নীতির মহাসমুদ্রেÑ কাকে ধরব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স গ্রহণ করেছেন। এটা নির্বাচনী অঙ্গীকার বটে। এর মাধ্যমে প্রতীয়মান হয়, দেশে দুর্নীতি আছে।
শুরু করা যাক দেশের দক্ষিণ প্রান্ত, বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে ১৭ জানুয়ারি একটি দৈনিকের সংবাদ শিরোনামÑ পণ্যভর্তি ১২ হাজার কন্টেইনার গায়েব। এ সম্পর্কে লেখা হয়েছেÑ ‘চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যতম বন্দরে জব্দ করা প্রায় ১২ হাজার পণ্যভর্তি কন্টেইনার গায়েব হয়ে গেছে। কম্পিউটারে সংরক্ষিত পণ্যের বিলের গোপন পাসওয়ার্ড চুরি করে কন্টেইনারগুলো গায়েব করা হয়। একই দিনের অন্য একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ শিরোনামÑ ‘অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও আইডিতে পণ্য খালাস/চট্টগ্রাম কাস্টমসে দুর্ধর্ষ জালিয়াতি’। বেপরোয়া সাহসে অবৈধ পণ্য খালাসের কারণ, আমদানি করা চালানের বিরুদ্ধে বিপুল রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ ছিল। এমন মনে করার কারণ নেই, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। চট্টগ্রামসহ বন্দরগুলোতে বেআইনি কর্মকাণ্ড চলছে। দুর্নীতি প্রমাণে আরো একটি সংবাদ শিরোনাম উদ্ধৃতি করছি। ‘ব্যাংক খাতে জালিয়াতি দমনে কঠোর পদক্ষেপ’। ব্যাংক খাতে ও আলোচ্য ভুতের উপদ্রব কম নয়, তার প্রমাণ মেলে বিভিন্ন সময়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে। কিছু দিন আগের বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘটনাবলি উল্লেখযোগ্য। সমাজ রাষ্ট্রের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের শাখা-প্রশাখায় অনুসন্ধান চালানো দরকার। কারণ সেসব ক্ষেত্রে দুর্নীতি উদ্ঘাটিত হবে অনায়াসে। মনে রাখতে হবে, দুর্নীতি আমাদের সমাজের বড় শত্রু। প্রতি বছর টাকা পাচার দুর্নীতির খবর ছাপা হয় দুটো আন্তর্জাতিক সংস্থার কল্যাণে। এবারও তাই হয়েছে। এ জন্য দরকার সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) তাদের ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারা পৃথিবী থেকে শত কোটি ডলার উন্নত দেশে পাচার হচ্ছে। যুগান্তরের এক রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, ২০১৫ সালে শুধু বাংলাদেশ থেকে ৫৯০ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। এর দাম বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। দেখা যাচ্ছে, ২০১৫ সালে বিদেশে টাকা পাচারের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে ১৯তম। বিগত ১০ বছরে বিদেশে পাচার হয়েছে পাঁচ লাখ ২২ হাজার ৫৬৪ কোটি টাকা। এটা অকল্পনীয় একটা তথ্য। জিএফআই বলছে, তিন-চারটি পথে বিদেশে টাকা পাচার হয়। একটা হচ্ছে ‘ওভার ইনভয়েসিং’ (অতি মূল্যায়ন) আর একটি হচ্ছে ‘আন্ডার ইনভয়েসিং’ তৃতীয়টি হুন্ডি এবং চতুর্থ পন্থায় পড়ে বিভিন্ন পাচারব্যবস্থা। দেখা যাচ্ছে, আমদানি-রফতানি ব্যবস্থার মাধ্যমে টাকা পাচার হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তো ব্যবসায় করেন না। তাদের মধ্যে যারা দুর্নীতিবাজ ঘুষখোর, তারা কিভাবে বিদেশে টাকা পাঠাবেন? পাঠাতে গেলে ব্যবসায়ের মাধ্যমে করতে হবে। তাহলে ভারটা গিয়ে পড়ে যারা আমদানি-রফতানি করে তাদের ওপর। দ্বিতীয়ত পড়ে হুন্ডিওয়ালাদের ওপর। সবচেয়ে বড় কথা, টাকা বিদেশে কোথায় রাখা হয়? নিশ্চিতভাবে বিদেশে ব্যবসায়বাণিজ্যের টাকা বিনিয়োগ হয় এবং তা বেসরকারিভাবে। এ ধরনের খবর অনেকের কাছে আছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই, অষ্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইউরোপে কারা ব্যবসায় করেন, তাদের বাড়িঘর আছে, সহায় সম্পদ আছে, মুখে মুখে ঢাকা শহরে তা প্রচারিত হচ্ছে। লাখ লাখ টাকা বিদেশে আছে। তাদের কেউ না কেউ এসব টাকার গন্তব্যস্থল থাকবে, যতদিন ‘ট্যাক্স হেভেন’ ধরনের দ্বীপরাষ্ট্র থাকবে। যত দিন বিদেশী রাষ্ট্রগুলো বিদেশ থেকে পাওয়া অবৈধ টাকা গ্রহণে অস্বীকৃতি না জানাবে, তত দিন দুর্নীতি লাগাম টেনে ধরা কঠিন হবে। অন্য দিকে, দুর্নীতি পরিস্থিতি উন্নয়নসংক্রান্ত স্কোরে ১০০ নন্ব^রের মধ্যে এবার বাংলাদেশ পেয়েছে ২৬। আগের বছর ছিল ২৮। অর্থাৎ টিআইয়ের তিন সূচকেই বাংলাদেশে দুর্নীতি বেড়েছে। তুলনামূলক বিশ্লেষণে বলা যায়, ২০০৫ সালের পর পরিস্থিতি অনেকটা উত্তরণ ঘটেছে। কিন্তু এরপর যা আছে তা সহনীয় পর্যায়ে তা বলার উপায় নেই। বাংলাদেশের দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক চিত্রের অনুজ্জ্বলতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে, তা বলার অবকাশ নেই। দুর্নীতির রাহুগ্রাস আমাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে শুধু বাধাগ্রস্ত করছে না, এর বহুমুখী বিরূপ প্রভাব সমাজ দেহে পড়েছে এবং সামাজিক অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্রও স্ফীত হচ্ছে। দুর্নীতি বন্ধ করব, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চালাব এমন অঙ্গীকারের কার্যকারিতা নিয়ে যেসব প্রশ্ন আছে, সে সব নিরসনের ব্যাপারে অটল থাকতে হবে। সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জাতীয় সংসদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, কার্যকর জাতীয় সংসদ জনপ্রত্যাশা মোতাবেক এখনো আমরা পাইনি। দুর্নীতি কমাতে বা দুর্নীতি নির্মূলে সর্বাগ্রে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। দুর্নীতি দমন কমিশনের যেসব সঙ্কট, সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তাও দূর করতে হবে। অঙ্গীকার, প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন যদি দৃশ্যমান করতে হয়; তাহলে এসব শর্তের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা দূর করতে হবে। আমাদের অভিজ্ঞতা আছে, কোনো দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে মামলা হলে সেখানে নানা ধরনের জটিলতা ও ফাঁক থাকে এবং এর সুযোগ নেয় দুর্নীতিবাজ কিংবা দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তি। এটা অবশ্য বড় সমস্যা বলে মনে করি এবং এ জন্যই দুর্নীতিবাজ চক্র শত অঙ্গীকারের পর ও ভাঙা যাচ্ছে না। দুর্নীতির ব্যাপারে মামলাগুলো যত তাড়াতাড়ি সুরাহা করা যায়, এ ব্যাপারে বিশেষ পদক্ষেপ নেয়া দরকার। যে যে ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতা রয়েছে, সেসব চিহ্নিত করে তা বন্ধ করতে হবে। আর দুর্নীতি বন্ধ করতে যদি সদিচ্ছা থাকে, তাহলে ধরতে হবে ওপর থেকে। সম্পদের হিসাব শুধু সরকারি কর্মচারী কেন, রাষ্ট্রশক্তির বিভিন্ন স্তরে যারা আছে, তাদের সবার নেয়া দরকার। হ
লেখক : সাংবাদিক


আরো সংবাদ

bedava internet