২৪ মার্চ ২০১৯

নৈতিকতা মূল্যবোধ ও অবক্ষয়

-

অষ্টাদশ শতকে ফরাসিদের মধ্যে যে দুটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যেত, তা হলোÑ মূল্যবোধ ও ন্যায্যতায় আপসহীনতা। সমসাময়িক ভারতীয় উপমহাদেশের অবস্থা ফরাসিদের সাথে তুলনীয় না হলেও সে সময় ভারতবর্ষে যে মূল্যবোধের চর্চা ছিল না, তা বলা যাবে না। কিন্তু এখন সে অবস্থা আর অবশিষ্ট নেই। এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশের অবস্থাটা আরো বেহালদশায় পৌঁছেছে। যা স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র ও সভ্য সমাজের চরিত্র এবং বৈশিষ্ট্যকেই দুর্বল ও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বস্তুত মূল্যবোধের অনুপস্থিতিই অবক্ষয়ের সূচনা করে। অবক্ষয় বলতে আমরা সাধারণত সামাজিক কিছু স্খলন বা চ্যুতি-বিচ্যুতিকেই বুঝি। যেমন- মাদক; ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা, হেরোইন, প্যাথেড্রিন, পর্নোগ্রাফি আসক্তি অনিয়ন্ত্রিত-অন্যায্য এবং অপরিণত যৌনাচারসহ কিছু সামাজিক অপরাধকে অবক্ষয় হিসেবে চিত্রিত করা হয়। বাস্তবে এর ব্যাপ্তি আরো অনেক বেশি বিস্তৃত। মূলত ক্ষয়প্রাপ্তি, সামাজিক মূল্যবোধ তথা সততা, কর্তব্য নিষ্ঠা, ধৈর্য, উদারতা, শিষ্টাচার, সৌজন্যবোধ, নিয়মানুবর্তিতা, অধ্যবসায়, নান্দনিক সৃজনশীলতা, দেশপ্রেম, কল্যাণবোধ, পারস্পরিক মমতাবোধ ইত্যকার নৈতিক গুণাবলি লোপ পাওয়া বা নষ্ট হয়ে যাওয়াকে বলে অবক্ষয়। মূল্যবোধ ও অবক্ষয় পরস্পর বিরোধী; সাংঘর্ষিক। তাই মূল্যবোধ যেখানে দুর্বল, অবক্ষয় সেখানেই প্রবল। আলো-আঁধারের মধ্যে যেমন সহাবস্থান নেই, ঠিক তেমনিভাবে অবক্ষয় ও মূল্যবোধ একসাথে চলতে পারে না।
মূল্যবোধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে জাগ্রত হয় না বরং রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও পারিবারিক পরিসরে এ জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে নৈতিক শিক্ষার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় রাষ্ট্রই নাগরিকের সবকিছুই দেখভাল করে, তাই মূল্যবোধের লালন ও চর্চার পরিবেশ সৃষ্টির দায়িত্বও রাষ্ট্রের। তাই নাগরিকদের জন্য রাষ্ট্্েরর প্রথম কর্তব্য হবে নৈতিকশিক্ষা ও মূলবোধের চর্চাকে উৎসাহিত করা এবং সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া। এ ক্ষেত্রে সব নাগরিকের জন্য শিক্ষাকে অবারিত করাকে অধিকতর গুরুত্ব দেয়া জরুরি। তবে সব শিক্ষিতই যে নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন হবে বা অবক্ষয় মুক্ত থাকবে এমনটা আশা করাও ঠিক নয়। যেসব মানুষ সুশিক্ষিত হতে পারেনি অর্থাৎ শিক্ষার মাধ্যমে সুকুমার বৃত্তির পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারেনি তাদের মাধ্যমে মূল্যবোধ ও ন্যায্যতার চর্চা কখনো সম্ভব নয়।
এ ক্ষেত্রে সুশিক্ষাই কাক্সিক্ষত ও প্রত্যাশিত। কেউ যখন সুশিক্ষিত হয়ে ওঠে তখন তার মধ্যে আপনা-আপনিই নৈতিকতা ও মূল্যবোধের সৃষ্টি হয়। তিনি অবক্ষয় মুক্ত থাকার চেষ্টা করেন। আর তা ফুলে-ফলে সুশোভিত করার জন্য প্রয়োজন হয় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের অনুকূল পরিবেশ বা পৃষ্ঠপোষকতা। সুশিক্ষিত তিনিই যিনি তার শিক্ষাকে সৎ আর ন্যায়ের পথে নিয়োজিত করেন। যৌক্তিক বিষয়াদিকে যৌক্তিক বোঝার পর নিজ স্বার্থের দিকে নজর না দিয়ে, অযৌক্তিকতাকে দূরে ঠেলে দিয়ে সুন্দরকে প্রতিষ্ঠিত করার ব্রত গ্রহণ করেন।
সম্প্রতি আবু সালেকের অপরাধে জাহালম নামে এক নিরপরাধ শ্রমিকের তিন বছরের কারাবাস নিষ্ঠুরতার দিকেই অঙুলি নির্দেশ করে। এ ধরনের জাহালমের সংখ্যা আমাদের দেশে নেহাত কম নয়। ভিন্নমতের জাহালমদের আর্তনাদ তো এখন আর কারো কর্ণকুহরেই প্রবেশ করে না। এসব রাষ্ট্রীয়পর্যায়ের অবক্ষয়ের ক্ষত চিহ্ন। মূলত আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রেই এখন অবক্ষয়ের জয়-জয়কার চলছে। শেয়ার মার্কেট, জনতা ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, ডেসটিনি, হলমার্ক সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ কেলেঙ্কারির ঘটনা নৈতিক মূল্যবোধের বিচ্যুতি ও অবক্ষয়ের ব্যাপকতার প্রতিই অঙুলি নির্দেশ করে।
এখন সব ক্ষেত্রেই অবক্ষয় সর্বগ্রাসী রূপ লাভ করেছে। পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সব পর্যায়েই এর পরিসর বিস্তৃতি। অবক্ষয় যে আমাদের দেশে প্রাতিষ্ঠানিকতা পেয়েছে তা সদ্যসমাপ্ত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহ থেকেই প্রমাণিত। সম্প্রতি পরকীয়া, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুপ্তহত্যা, গুম ও অপহরণ বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। মূল্যবোধের অনুপস্থিতি ও অবক্ষয়ের ব্যাপক বিস্তৃতির কারণেই এ ধরনের অপরাধ এখন ক্রমবর্ধমান। এ জন্য দেশে গণমুখী ও সুস্থধারার রাজনীতির বিচ্যুতিকেই অনেকেই দায়ী করেন।
রাজনীতির পরিসর খুবই বৃহৎ। রাজনীতি দেশ ও জনগণের আমূল কল্যাণের জন্য আবর্তিত হয়। এতে মূল্যবোধ আর ন্যায্যতার ভিত্তি মজবুত না থাকলে কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণই হয় বেশি। রাজনীতিকদের যদি মূল্যবোধের স্তর নিম্নমানের হয় তবে তা আর রাজনীতি থাকে না বরং অপরাজনীতি হিসেবে বিবেচিত হয়। এর কুপ্রভাবে হাজারো মূল্যবোধ নষ্ট হয়। ব্যক্তির মূল্যবোধ নষ্ট হলে ক্ষতি শুধু একজনের কিন্তু শাসক শ্রেণীর মূল্যবোধ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই প্রবাদ আছে, ‘রাজার দোষে রাজ্য নষ্ট প্রজা কষ্ট পায়’। আমাদের প্রেক্ষাপটও বোধহয় তা থেকে আলাদা নয়।
অবক্ষয়ের মূলে রয়েছে ধর্মবিমুখতা, ধর্মের অপব্যবহার, ধর্মীয় সঙ্কীর্ণতা, অসহিষ্ণুতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অভাব এবং সর্বগ্রাসী অশ্লীলতার মতো আরো কিছু বিষয়। ধর্মের যথাযথ চর্চা ও অনুশীলন কখনোই ধর্মান্ধতা শেখায় না বরং ধর্মীয় আদর্শের মাধ্যমেই ধর্মান্ধতার অভিশাপ মুক্ত হওয়া সম্ভব। ধর্মই মানুষের জীবনপ্রণালী অন্যান্য ইতর প্রাণী থেকে আলাদা করেছে; মানুষকে সভ্য, সংবেদনশীল ও পরিশীলিত করেছে। সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে আমরা ধর্মকে মনে করি এগিয়ে চলার পথের প্রধান অন্তরায়। কিন্তু বাস্তবতা সে ধারণার অনুকূলে কথা বলে না।
প্রতিটি সভ্যতাই গড়ে উঠেছিল কোনো না কোনো ধর্মকে আশ্রয় করে। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন একটি সভ্যতা খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেটি ধর্মকে বিসর্জন দিয়ে গড়ে উঠেছে। তাই একটি নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন জাতি সৃষ্টি ও অবক্ষয়হীন সমাজ বিনির্মাণ করতে হলে নাগরিকদের মধ্যে জবাবদিহিতার অনুভূতি সৃষ্টি, ধর্মীয় মূল্যবোধের সম্প্রসারণ, লালন ও অনুশীলনের কোনো বিকল্প নেই। মনীষী সাইয়্যেদ কুতুবের ভাষায়, ‘যে সমাজে মানবীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার প্রাধান্য থাকে সে সমাজই সভ্য সমাজ’। হ
[email protected]


আরো সংবাদ




iptv al Epoksi boya epoksi zemin kaplama Daftar Situs Agen Judi Bola Net Online Terpercaya Resmi

Hacklink

hd film izle instagram takipçi satın al ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme

instagram takipçi satın al