১৬ নভেম্বর ২০১৮

রাস্তাঘাটের দুঃসহ পরিবেশ

-

২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারির শেষে একদিন গুলশানের জার্মান দূতাবাস থেকে উত্তরা ফেরার পথে রেললাইন পার হবÑ এমন সময় ট্রেন আসছে, ব্যারিয়ার পড়ে যাচ্ছে। এ সময় সবার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল রেললাইন পার হওয়ার। রিকশা, সিএনজি, মোটরসাইকেল, সাইকেল ও ব্যক্তি সবাই হুড়োহুড়ি করে রেললাইন পার হলো। ব্যারিয়ার পড়ার পরও সাইকেলসহ মানুষ পার হচ্ছে। এমনকি মোটরসাইকেলগুলো নিয়েও মানুষ ব্যারিয়ারের নিচ দিয়ে পার হচ্ছে। কী ভয়াবহ দৃশ্য! যেন মনে হয় এরা সবাই তাদের প্রাণ বাসায় রেখে এসেছেন। ট্রেন এসেও গেল প্রায়। এমন সময় কে একজন আমাকে ও আমার মেয়েকে বলছেÑ যান, যান যেতে পারবেন। আমরা ঠায় দাঁড়িয়ে। মনে হলো এ কী খেলা! আমাদের এতটুকুও পার হওয়ার প্রয়োজন বা ইচ্ছা নেই দেখেও আমাদের যেতে বলছে? মুহূর্তে গা কাঁটা দিয়ে উঠল এবং ভাবতে থাকলাম যারা হুলস্থুল করে রেললাইন পার হলো এবং যারা বলছেনÑ যান, যান, যেতে পারবেন; এরা কি মানুষ?
শিশু-কিশোরদের আন্দোলনের পরও ঠিক একই অবস্থা দেখলাম মগবাজার রেললাইনের একপাশে রিকশায় বসে। রিকশাওয়ালা আমার কথামতো স্থির দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হলেন, নইলে হয়তো তিনিও পার হয়ে যেতেন। মানুষের হয়েছে কী? রাস্তার অবস্থা একই। গাড়ি চলছে, বাস চলছে, অন্য যানবাহন চলছে। মানুষও চলছে। কেউ দৌড়ে পার হচ্ছে, কেই ধীরে ধীরে, কেউ মোবাইল কানে, কেউ আবার হেডফোন কানে গান শুনতে শুনতেÑ কেন এত উন্মাদনা! জেব্রা ক্রসিং তো রয়েছেই। ওভারব্রিজে উঠে পার হওয়ার ইচ্ছে কারো নেই। নেই তো নেইই। গাড়ি চলছে সেই আগের মতোই গা ঘেঁষে ঘেঁষে, মোচড়াতে মোচড়াতে কে কার আগে যাবে সেই ভাবনায়। আবার দুই গাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ছে অসংখ্য মানুষ, সাইকেল ও মোটরসাইকেল। কত যে মোটরসাইকেলÑ তার ইয়ত্তা নেই। মনে হয় সারা বিশ্বেও বুঝি এত মোটরসাইকেল নেই। ট্রাফিক সিস্টেমের চিত্র আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের মতো বিচ্যুতিতে ভরা, এ তো শিশু-কিশোরের আবিষ্কৃত দৃশ্যে আমরা দেখলামই। ট্রাফিক সিস্টেমে কি পাঁচ টাকা করে প্রতি রিকশা থেকে তোলার নিয়ম আছে? গাড়ি থেকে, বাস থেকে? ওই কুকীর্তিতে তাদের এত আগ্রহ কেন? কেন তারা যত্রতত্র রাস্তা পারাপারকারীদের বাধা দিচ্ছে না। সব ক্ষেত্রে বড় আকারের জরিমানা নেই কেন? হাজারো আইন করে মৃত্যুর মিছিল কি ঠেকানো যাবে? নাকি আইনের যথাযথ প্রয়োগ প্রয়োজন? আইনের যথাযথ ব্যবহার হতে বাধা বা দ্বিধা কেন? কারা আইন ভাঙতে এগিয়ে, বেপরোয়া? সবই আমরা দেখেছি।
আইনের প্রয়োগের ফলেই এসিড সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রিত হয়েছে বলেই আমরা মনে করি। আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে সর্ষের মধ্যে যে ভূত আছে, তা তাড়ানো যাবে না বলেই হয়তো গা-ঢিলা ভাব। এ জন্যই হয়তো এক কিশোর বলেছিলÑ ‘মামা আমাদের অস্ত্র দেখাবেন না, আমাদের কাছে ৪৭ বছরের রাষ্ট্র মেরামতের অস্ত্র আছে।’ আমাদের জনগণ যতই আগ্রহভরে রাস্তার আইন অমান্য করুক না কেন; একটি অকালমৃত্যুর দায় কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রেরই। সুতরাং, সর্ষের মধ্যের ভূত খুঁজে বের করার দায়িত্ব কার? আর কোনো মায়ের কোল যেন খালি না হয়, কেউ যেন না হয় স্বজনহারা।
জনগণ ও রাষ্ট্রযন্ত্র উভয়েই যখন আন্তরিকভাবে চাইবে তখনই হবে এক-একটি সমস্যার সমাধান। কোনটা আমরা চাই কোনটা চাই না, তা তো দেখাই গেল কোরবানি ঈদে দেশী গরুর প্রাচুর্য তথা দেশী স্টেরয়েডমুক্ত গরুর প্রাচুর্য অবলোকনে।
আমরা সড়ক দুর্ঘটনায় আর মৃত্যুর মিছিল চাই না। প্রতিদিন গড়ে দশজন প্রাণ হারায়। এমন দেশ আর কোথায় আছে জানি না, জানতেও চাই না। এখন তো দেখা গেল স্বয়ং এসআইকে পিষে মেরে ফেলল সেই ড্রাইভার, যাকে ওই এসআই থানায় নিয়ে যাচ্ছিলেন। তাহলে এসব চালকের মানসিক অবস্থারও চেকিং প্রয়োজন, তারা ড্রাগ নিচ্ছে কি না দেখা দরকার।
ঢাকা শহরে আর স্কুল, কলেজ ও বিশ^বিদ্যালয় চাই না। চাই না হাসপাতাল, ক্লিনিক, কোচিং সেন্টার, ব্যাংক প্রভৃতি। এগুলো এখন থেকে বিভাগীয় শহরগুলোতে নয় কেন? হতে পারে এসবেও সর্ষের ভূত কাজ করছে। তাই হয়তো একই বিল্ডিংয়ে তিন বিশ^বিদ্যালয়। হ
লেখক : বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ
প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


আরো সংবাদ