২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

আলাদা ভূখণ্ডের ধারণা কাদের মস্তিষ্কপ্রসূত!

-

গত ১ সেপ্টেম্বর দৈনিক নয়া দিগন্তে ‘মানবতন্ত্রী সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে এবনে গোলাম সামাদের কলাম। তিনি লিখেছেন, ‘১৯২৫ সালে লালা লাজপৎ রায় একটি রাজনৈতিক লেখায় বলেন যে, ব্রিটিশ ভারতের হিন্দু-মুসলমান সমস্যা সমাধান করার জন্য ব্রিটিশ ভারতের পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে দুটি স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ গড়তে হবে। এ থেকে বলা যায়, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ধারণা ঠিক মুসলমানদের মাথা থেকে আসেনি।’ এমন ধারণা অবশ্যই খণ্ডনীয়।
Lorry Collins & Dominique Lapierre-এর Mountbatten and the Partition of India নামক বইয়ের ১৪৩ পৃষ্ঠায় উদ্ধৃত স্বয়ং মাউন্টব্যাটেনের উক্তি, যেমনÑ ‘নেহরুর ধারণায় একদিন-না-একদিন পূর্ববাংলা ভারতের সঙ্গে পুনঃএকত্রিত হতে বাধ্য হবে।’ ভারত ভাগের পরেই ১৯৪৭ সালের ১৮ আগস্ট অমৃতবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত কংগ্রেস সভাপতি আচার্য কৃপাণলীর মন্তব্যটি হলো, ‘না কংগ্রেস, না জাতি ঐক্যবদ্ধ ভারতের দাবি পরিত্যাগ করেছে।’ এই একই সময়ে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বল্লভ ভাই প্যাটেলের ‘দেশের প্রতি আমাদের সর্বজনীন আনুগত্যের জন্য একদিন-না-একদিন আমরা পুনরায় একত্রিত হবো।’ এই মন্তব্য আইয়ুব খানের Friends not Masters নামক বইয়ের ১১৫ পৃষ্ঠায় উদ্ধৃত। রাজমোহন গান্ধীর Understanding the Mustim Mind বইয়ের ২২৩ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘জিন্নাহর মৃত্যুর পরে জর্জ বার্নার্ড শ নেহরুকে লেখেন যে, ‘জিন্নাহর যোগ্য উত্তরাধিকারী না থাকলে গোটা উপদ্বীপ তাকেই শাসন করতে হবে।’ এসব ইচ্ছা ও উক্তির বাস্তবায়নে জনমতকে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টায় ইতিহাসকে বিকৃতির চেয়ে বরং আধুনিকীকরণ শুরু হয়েছে অনেক আগেই। মনে হয়, এমনি নব্য তথ্যনির্ভরে কলাম লেখক এ ধরনের মন্তব্য করেছেন।
পাঞ্জাবের সিংহ বলে খ্যাত লাল লাজপৎ রায় ছিলেন আইনজীবী এবং পাঞ্জাবে আর্য সমাজ প্রতিষ্ঠাতা। পশ্চিম বাংলা সরকার কর্তৃক প্রকাশিত ‘মুক্তির সংগ্রামে ভারত’ বইয়ের ৫৭ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘লাল-বাল-পাল’ নামে পরিচিত লালা লাজপৎ বায়, মহারাষ্ট্রের বাল গঙ্গাধর তিলক ও বাংলার বিপিণচন্দ্র পালÑ এরা তিনজনই চরমপন্থী নেতা হিসেবে গণ্য ছিলেন। প্রথম থেকেই এরা স্বদেশী আন্দোলনের অগ্রগণ্য নেতা ছিলেন। কয়েক বছর আমেরিকায় থাকার পরে সরকারের অনুমতিসাপেক্ষে লালা দেশে ফিরে আসেন ১৯১৯ সালে। ১৯২০ সালের ৩০ অক্টোবর তার নেতৃত্বেই বম্বেতে নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা ও এর সম্মেলনে তিনিই সভাপতিত্ব করেন। পূর্বোল্লিখিত রাজমোহন গান্ধীর বইয়ের ৭ পৃষ্ঠা মতে, তখন তার ধারণা জন্মে যে মুসলমানের ইতিহাস ও আইন হিন্দু-মুসলিম ঐক্যে একটি কার্যকর বাধা। ড. প্রদীপ কুমার লাহেড়ীর Bengal Muslim thought, 1818-1947 বইয়ের ১০৪ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘(অনুবাদিত) দেশের রাজনৈতিক অবস্থা অত্যধিক সাম্প্রদায়িক ভাবনায় ভরপুর। লাজপৎ রায়ের পরিচালনায় হিন্দু মহাসভার উত্থানে সারা দেশে ইসলাম হতে হিন্দুতে পুনঃধর্মান্তরিতে সাম্প্রদায়িকতার শিকারীদের মানসিক যন্ত্রণা নিরসনে সভা সংগঠিত হচ্ছে। ২১ নম্বর ফুট নোট মতে, ১৯২৫ সালের ১০ এপ্রিল কলকাতায় লাজপৎ রায়ের সভাপতিত্বে হিন্দু মহাসভার সভা অনুষ্ঠিত হয়। (মনে হয় এর পরেই) ১৯২৫ সালে হিন্দু মিশন প্রতিষ্ঠায় কুমিল্লার অভয় আশ্রমে হিন্দু অভিপ্রায় প্রচারের জন্য শিবাজি উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। ১৯২৬ সালে হিন্দু সংঘ নামে অনুজাচরণ সেনগুপ্তের সম্পাদনায় প্রকাশিত সাপ্তাহিক পত্রিকায় শুদ্ধি অভিযানের উদ্দেশ্য প্রচার করা হয়।’ রাজমোহন গান্ধীর পূর্বোল্লিখিত বইয়ের ১৩৮ পৃষ্ঠা মতে, ১৯২৭ সালে পাঞ্জাবে মুসলমানেরা পৃথক নির্বাচনীব্যবস্থার দাবি করে। কিন্তু লাজপৎ রায় শিখদের সমর্থনে ও হিন্দুদের নেতৃত্বে এর বিরোধিতা করেন।’ তথ্য মতে, ১৯২৮ সালের ডিসেম্বরে ‘সাইমন কমিশন’ বয়কটের মিছিলে লাহোরে পুলিশের লাঠির আঘাতে লাজপৎ রায় আহত হয়ে পরে মারা যাওয়ার তারিখটি বিতর্কিত।
নরেশ কুমার জৈন-এর Muslim Biographical Dictionary, V-11, P-176-এ উদ্ধৃত হয়েছে কংগ্রেসে সভাপতি বদরুদ্দীন তায়াবজির চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ১৮৮৮ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি স্যার সৈয়দ আহাম্মদ খানের উত্তর। এর শেষ লাইনটি, ‘ÔI object to every Congress, in any shape or form whatever, which regards India as one Nation.Õ এ জন্য তিনিই দ্বিজাতিতত্ত্বের সর্বপ্রথম উত্থাপক বলে বিবেচ্য। এর প্রায় ৪১ বছর পরে ভারতের পশ্চিমাংশে মুসলমানদের জন্য সর্বপ্রথম আলাদা ভূখণ্ড দাবি করেন মুসলিম লীগের লাখনৌ অধিবেশনে এর সভাপতি ড. মহাম্মদ ইকবাল। এ প্রসঙ্গে প্রফেসর স্টিফেন ফিলিপ কোহেন তার The Idea of Pakistan নামক বইয়ের ৫ পৃষ্ঠায় বলেছেন, ‘১৯৩০ এর পূর্বে মুসলমানদের জন্য আলাদা ভূমির কোনো ধারণা ছিল না।’ এ কারণেই ভারতীয়দের কাছে ড. ইকবাল যতই সমালোচিত, তার গানের ‘সারা জাহাছে আচ্ছা হিন্দুস্তান হামারা’ জন্য ততই সমাদৃত। তার তিন বছর পরে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত পাঞ্জাবের চৌধুরী রহমত আলী ও তার কয়েকজন সহপাঠী ১০টি স্বায়ত্তশাসিত রাজ্য নিয়ে গঠনের দাবিকৃত দেশের নাম পাকিস্তান বলে সর্বপ্রথম তারাই এটা প্রচারপত্রে ব্যবহার করেন।
উপমহাদেশের নামকরণ, ধর্মীয় বিবেচনা ও রাজনৈতিক কারণে কংগ্রেসের বা অন্য কোনো হিন্দু নেতা (বাংলার তফসিল ফেডারেশনের কেউ কেউ ব্যতীত) দ্বিজাতিতত্ত্ব স্বীকার করেননি। শেষ দিকের অবস্থাগত কারণে দু-একজন কথায় স্বীকার করলেও কার্যত ভারত ভাগে আদৌ কেউ সম্মত ছিলেন না। লালা লাজপৎ রায় প্রথমত ছিলেন চরমপন্থী, দ্বিতীয়ত, স্বদেশী আন্দোলনের নেতা, তৃতীয়ত, হিন্দু মহাসভার মতো দলের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত এবং চতুর্থত, ১৯২৫ সালে ছিলেন শুদ্ধি অভিযানের নেতৃত্ব দানকারী। ওই একই বছরেই তার কথিত রাজনৈতিক চিন্তার লেখনীতে মুসলমানের জন্য পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথাটি তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বলা যায় না। তা ছাড়া তার এমন ধারণার প্রকাশে কংগ্রেস দলের জন্য অবশ্যই হতো বিব্রতকর।

 


আরো সংবাদ