১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯

বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে গ্রেনেড হামলার ১৫তম বার্ষিকী আজ

বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে গ্রেনেড হামলার ১৫তম বার্ষিকী আজ - ছবি : সংগৃহীত

আজ ২১ আগস্ট। ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশস্থলে গ্রেনেড হামলার ১৫তম বার্ষিকী। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের এই দিনে বঙ্গবন্ধু এভিনিউর আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে। এতে ২৪জন নিহত এবং অন্তত ৩০০ আহত হয়। গত বছরের অক্টোবরে এই মামলায় বিচারিক আদালত ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড দিয়ে রায় প্রদান করেন। রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করা হয়।

২১ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের পর মতিঝিল থানায় মামলা হয়। প্রথমে এই মামলাটির তদন্ত করেন মতিঝিল থানার এসআই আমির হোসেন। মামলাটি ডিবি পুলিশে স্থানান্তর হলে মামলার তদন্ত করেন ডিবির ইন্সপেক্টর মো: শামসুল ইসলাম। পরবর্তীতে মামলাটি সিআইডিতে স্থানান্তর হয়। এরপর মামলা তদন্তের দায়িত্ব ন্যস্ত হয় তৎকালীন এএসপি আব্দুর রশিদ এবং মুন্সী আতিকের ওপর। এক এগারোর তত্ত্বাবধায়কের আমলে তদন্ত করেন সিআইডির এএসপি ফজলুল কবির। তিনি ২০০৮ সালের ১১ জুন ওই মামলায় ২২জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করলেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের আগস্টে মাসে মামলা দু’টির অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। তদন্ত শেষে সিআইডির এস এস আব্দুল কাহহার আখন্দ ২০১১ সালের জুলাই মাসে আদালতে সম্পূরক চার্জশিট প্রদান করেন। এই ঘটনায় মুফতি হান্নানসহ ৮ হরকাতুল জিহাদ সদস্য আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী প্রদান করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আদালতে দাখিলকৃত আবেদনে গ্রেনেডের উৎস এবং এই ঘটনার নেপথ্যে কারা রয়েছে তা জানার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। এর আগে সিআইডি কর্মকর্তা ফজলুল কবিরের দেয়া চার্জশিটে বিএনপি নেতা আব্দুস সালাম পিন্টু, হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামীর (হুজি) নেতা মুফতি আব্দুল হান্নান, তার ভাই মাওলানা মফিজুর রহমান ওরফে অভি, পিন্টুর ছোট ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন, মাওলানা আবু তাহের, শরীফ শাহিদুল ইসলাম ওরফে বিপুল, মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে ডাক্তার জাফর, মুফতি মঈন ওরফে আবু জান্দাল, আবুল কালাম বুলবুল, জাহাঙ্গীর আলম, আরিফ হাসান ওরফে সুমন ওরফে আব্দুর রাজ্জাক, আনিসুল মুরসালিন ওরফে সুজন, তার ভাই মহিবুল মুক্তাকিন ওরফে শাহীন, হোসাইন আহম্মেদ ওরফে তামিম, শাহাদাত উল্লাহ ওরফে জুয়েল, ইকবাল, মাওলানা আবু বকর, মাওলানা লিটন ওরফে জোবায়ের ওরফে দেলোয়ার, রফিকুল ইসলাম গাজী ওরফে শফিক ওরফে খালিদ সাইফুল্লাহ ওরফে সবুজ ওরফে রতন, উজ্জল ওরফে রতন, জাহাঙ্গির হোসেন ওরফে জাহাঙ্গির বদর ও মাওলানা খলিলুর রহমান ওরফে খলিলকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। ফজলুল কবিরের চার্জশিটে ২২জনকে অভিযুক্ত করা হলেও আরো ছয়জনের জড়িত থাকার ব্যাপারে তথ্য ছিল। তাদের মধ্যে দু’জন মারা যাওয়ায় এবং বাকি চারজনের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ না থাকায় চার্জশিট থেকে তাদের বাদ দেয়া হয়। ওই সময় মুরসালিন এবং মুক্তাকিন ভারতের কারাগারে বন্দী ছিল। 

২০১১ সালের ৩ জুলাই এই মামলায় নতুন করে ৩০জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে সম্পূরক চার্জশিট প্রদান করা হয়। এর মধ্যে বিএনপির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাবেক সংসদ সদস্য শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব:) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, এনএসআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) আব্দুর রহিম, হারিছ চৌধুরী, হানিফ পরিবহনের মালিক মো: হানিফ, ওয়ার্ড কমিশনার আরিফুর রহমান, ইসলামিক ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (আইডিপি) আহ্বায়ক মাওলানা আব্দুস সালাম, আব্দুল মজিদ ভাট ওরফে ইউসুফ ভাট, আব্দুল মালেক ওরফে গোলাম মোহাম্মদ ওরফে গোলাম মোস্তফা, মাওলানা আব্দুর রউফ, মাওলানা আব্দুল হান্নান ওরফে সাব্বির, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আব্দুল হাই, আব্দুস সালাম পিন্টুর ছোট ভাই রাতুল বাবু ওরফে বাবুল, পুলিশের সাবেক আইজি শহিদুল হক, আশরাফুল হুদা এবং খোদা বক্স, ডিআইজি খান সাঈদ হাসান, এসপি ওবায়দুর রহমান, সাবেক এসপি রুহুল আমিন, সাবেক এএসপি মুন্সী আতিকুর রহমান, সাবেক এএসপি আব্দুর রশিদ, খালেদা জিয়ার ভাগ্নে লে. কমান্ডার (অব:) সাইফুল ইসলাম ডিউক, লে. কর্নেল (বরখাস্তকৃত) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার এবং মেজর জেনারেল (অব:) এ টি এম আমিন রয়েছেন। এরমধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং ২০০৪ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলার মামলায় মুফতি হান্নানের ফাঁসির রায় ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে। গত বছর ১০ অক্টোবর বিচারিক আদালত এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিএনপি নেতা লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯জনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। আর তারেক রহমানসহ ১৯জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ প্রদান করা হয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়েছে হাইকোর্টে; যা এখন শুনানির অপেক্ষায় আছে। 

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী : এদিকে ২১ আগস্ট উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ তার বাণীতে বলেছেন, ২১ আগস্ট ঘাতকচক্রের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বহীন করে দেশে স্বৈরশাসন ও জঙ্গিবাদ প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ তা হতে দেয়নি। 
রাষ্ট্রপতি বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ওপর প্রথম আঘাত আসে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। এদিন স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতকচক্রের হাতে অকালে জীবন দিতে হয়েছে স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের। এছাড়া ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কারাগারে বন্দী অবস্থায় হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে। এর পরও ঘাতকচক্র থেমে থাকেনি। তারা বঙ্গবন্ধু তনয়া বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট পরিকল্পিতভাবে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জনসভা চলাকালীন ইতিহাসের বর্বরতম গ্রেনেড হামলা চালায়। 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণীতে বলেছেন, গ্রেনেড হামলা মামলায় দণ্ডিতদের রায় কার্যকর করার মধ্য দিয়ে দেশ থেকে হত্যা, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের চির অবসান হবে এবং দেশে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। তিনি ২১ আগস্টের শোককে শক্তিতে পরিণত করে সন্ত্রাস ও জঙ্গিমুক্ত একটি শান্তিপূর্ণ, উদার, গণতান্ত্রিক উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে দেশের সব নাগরিক ঐক্যবদ্ধ হতে আহ্বান জানান। শেখ হাসিনা বলেন, এ হামলার মূল লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, শান্তি ও উন্নয়নের ধারাকে স্তব্ধ করে দেয়া। বাংলাদেশকে নেতৃত্বশূন্য করে হত্যা, ষড়যন্ত্র, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও দুঃশাসনকে চিরস্থায়ী করা; মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করা।’
প্রধানমন্ত্রী ২১ আগস্টের সব শহীদের রূহের মাগফিরাত কামনা এবং আহতদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।


আরো সংবাদ