২০ আগস্ট ২০১৯

প্রিয়া সাহার নালিশ গভীর ষড়যন্ত্র

ট্রাম্পের সাথে প্রিয়া সাহা - ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন চলছে বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয়া সাহা যে অভিযোগ করেছেন তা নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে। সব মহল থেকে এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে প্রিয়া সাহা যে তথ্য উপস্থাপন করেছেন তাকে শুধু জঘন্যতম অসত্য নয় বরং তাকে দেশদ্রোহিতা এবং দেশের বিরুদ্ধে ভয়ঙ্করতম এক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এমন মিথ্যাচার আর অপবাদের খবরে বিস্ময়ে হতবাক সারা দেশের কোটি কোটি সচেতন মানুষ। প্রিয়ার বক্তব্যের ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই এর বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা, প্রতিবাদ আর ধিক্কারের ঝড় বইছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। দেশের বিরুদ্ধে এমন মিথ্যাচারে চুপ থাকতে পারছেন না কেউ। তারা প্রতিবাদে সরব হয়েছেন। অনেকে রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছেন প্রতিবাদে। রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকেও জানানো হয়েছে তীব্র নিন্দা আর প্রতিবাদ। এমনকি বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতও তাৎক্ষণিকভাবে প্রিয়ার বক্তব্যের বিরোধিতা করে বলেছেন তার বক্তব্য সঠিক নয়। 

এ দিকে প্রিয়া সাহার বক্তব্যের প্রতিবাদের পাশাপাশি এর পরিণতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অনেকে। কেন কী উদ্দেশ্যে প্রিয়া সাহা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে এমন বক্তব্য রাখলেন তার কারণ খোঁজার চেষ্টা করছেন অনেকে। হঠাৎ করে মামুলি কোনো কারণে তিনি এমন তথ্য উপস্থাপন করেছেন এটা বিশ্বাস করতে পারছেন না কেউ। এর পেছনে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র কাজ করছে বলে বিশ্বাস তাদের। বাংলাদেশের ক্ষতি করাই এর আসল উদ্দেশ্য। বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নস্যাৎ করা, পরিস্থিতি ঘোলাটে করে বাংলাদেশকে চাপে ফেলা এবং দেশী-বিদেশী অশুভ শক্তির ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করে তাদের স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্য এর পেছনে থাকতে পারে বলে মনে করেন অনেকে। অনেকে বলছেন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এ ধরনের আজগুবি অনেক বক্তব্য পাশের দেশের একটি ধর্মীয় রাজনৈতিক দল ও তাদের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের উগ্র নেতারা দিয়ে থাকেন। 

গত ১৬ থেকে ১৮ জুলাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে সে দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক তিন দিনব্যাপী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে যোগ দেয়া বিভিন্ন দেশের ২৭ জন প্রতিনিধি সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে হোয়াইট হাউজে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয়া সাহাও ছিলেন। তিনি এ সময় ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বলেন, বাংলাদেশ থেকে তিন কোটি ৭০ লাখ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান নিখোঁজ হয়েছেন। তিনি ট্রাম্পকে বলেন, আমরা দেশে থাকতে চাই, আমাদের দয়া করে সাহায্য করেন। সেখানে এখনো এক কোটি ৮০ লাখ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান রয়েছে। প্রিয়া বলেন, আমার বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে, জমি কেড়ে নেয়া হয়েছে। মুসলিম উগ্রবাদীরা এটা করছে এবং তারা সব সময় রাজনৈতিক আশ্রয় পাচ্ছে। 
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গতকাল শনিবার ছড়িয়ে পড়ে প্রিয়ার এসব বক্তব্য। 

প্রিয়ার বক্তব্য জনসম্মুখে আসার পর বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি রানা দাশগুপ্ত গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন প্রিয়ার বক্তব্য তার নিজস্ব। এটি সংগঠনের নয়। আর তারা তাদের সংগঠন থেকেও প্রিয়াকে সেখানে পাঠাননি। সংগঠন থেকে তিনজনকে সেখানে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে প্রিয়ার নাম নেই। তবে রানা দাশগুপ্ত স্পষ্ট করেননি তাদের ছাড়পত্র ছাড়া প্রিয়া কিভাবে সেখানে শুধু গেলেন না উপরন্তু, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এই ধরনের জঘন্য কাজ করলেন যা কোনো দেশপ্রেমিকের নাগরিকের কাছ থেকে চিন্তাও করা যায় না। অন্য দিকে প্রিয়া যেসব অভিযোগ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে করেছেন রানা দাশগুপ্তও অহরহ সেসব অভিযোগ করে থাকেন। 
প্রিয়ার বক্তব্যের বিরুদ্ধে নিন্দা ও প্রতিবাদ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছাড়িয়ে রাজপথে গড়িয়েছে। গতকাল ধানমন্ডিতে তার বাসার সামনে সচেতন ছাত্রসমাজের ব্যানারে মানববন্ধন করা হয়। 

প্রিয়াকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানানো হয়েছে বিভিন্ন মহল থেকে। 
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ নেত্রীর দেশবিরোধী বক্তব্যে নিন্দার ঝড় : বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত রবার্ট মিলার গত শুক্রবার রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় বৌদ্ধ মন্দিরের এক অনুষ্ঠানে প্রিয়ার বক্তব্য প্রসঙ্গে বলেন, তার অভিযোগ সঠিক নয়। বরং বাংলাদেশ ধর্মীয় সম্প্রীতির ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য নাম। এখানকার ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকজন একে-অপরকে শ্রদ্ধা করে। 

প্রিয়া সাহার বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ উচ্চপদস্থ বিভিন্ন কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে। 
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কড়া প্রতিবাদে প্রিয়ার বক্তব্যকে ভয়ঙ্কর মিথ্যা আখ্যায়িত করে বলা হয়েছে এর পেছনে অশুভ উদ্দেশ্য রয়েছে। গতকাল এক বিবৃতিতে বলা হয় প্রিয়া সাহার এই চরম মিথ্যাচার এবং সাজানো গল্পের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ করা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহার এই ভয়ঙ্কর মিথ্যা অভিযোগের কঠোর প্রতিবাদ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাতিঘর, এখানে সকল বিশ্বাসের লোকেরা দীর্ঘকাল ধরে শান্তিতে বসবাস করে আসছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল সাংবাদিকদের বলেছেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে করা অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারলে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, প্রিয়া যা বলেছেন তা সম্পূর্ণ অসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এ বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। কেন অন্য রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির কাছে এসব কথা বলে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা নষ্ট করার অপচেষ্টা করেছেন সে বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এরপরই তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী কার কার বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, কোথায় এসব ঘটনা ঘটেছে তা আমরা দেখব। 

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রিয়া সাহার বক্তব্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই দেশের নাগরিক হয়ে দেশের বিরুদ্ধে এই ধরনের অসত্য, উদ্দেশ্যমূলক ও দেশদ্রোহ বক্তব্য রেখেছে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই হবে এবং সেই প্রক্রিয়া চলছে।’

ওবায়দুল কাদের বলেন, তার এই বক্তব্য সম্পূর্ণ অসত্য এবং কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি একটি নিন্দনীয় অপরাধই শুধু নয়; এই ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য দেশের অভ্যন্তরে লুকায়িত মতলববাজ ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীকে সহায়তা করবে।
তিনি বলেন, আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, বাংলাদেশের কোনো বিবেকবান দেশপ্রেমিক হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সদস্য প্রিয়া সাহার বক্তব্যের সাথে কোনোভাবেই একমত হবে না। আমি পারসোনালি অনেকের সাথে আলাপ করেছি, তারা এই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা করেছে।

এ দিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, প্রিয়া সাহা ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশ নিয়ে যে অভিযোগ করেছেন, তা সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। তার বক্তব্য দেশবিরোধী। এটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ। তাকে আইনি প্রক্রিয়ায় আনতে ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে। 
আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘আমরা রথযাত্রা, উল্টো রথযাত্রা, দুর্গাপূজাসহ হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও বড়দিনে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিয়ে থাকি। সংখ্যালঘুদের ওপর কেউ যেন নির্যাতন ও হামলা চালাতে না পারে, সেজন্য আমরা তৎপরতার সাথে ভূমিকা পালন করে থাকি। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে কারো জমি ছিনিয়ে নেয়ার মতো ঘটনা বাংলাদেশে ঘটেনি। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে (বিএফডিসি) এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন তিনি। 

ফেসুবকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গত শুক্রবার থেকে প্রিয়া সাহার বক্তব্য নিয়ে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় বইছে এবং তা ক্রমে বেড়েই চলেছে। লিখিত প্রতিবাদের পাশাপাশি অনেকে লাইভ ভিডিও বার্তা তৈরি করে তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছেন এবং বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সঠিক চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। অনেকে প্রিয়ার এ বক্তব্যকে নানা আঙ্গিকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করছেন। 

অপর দিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রিয়া সাহার এ বক্তব্যের পর কে এই প্রিয়া সাহা তা নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে। গতকাল পর্যন্ত গণমাধ্যমে তার বিষয়ে যেসব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায় তিনি বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক ছাড়াও থথমাসিক ‘দলিত কণ্ঠ’ নামের একটি পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক। এ পত্রিকার ঘোষণাপত্রে তার নাম প্রিয় বালা বিশ্বাস হিসেবে দেখা যায়। এ ছাড়া তিনি বেসরকারি সংস্থা বা এনজিও ‘শারি’-এর নির্বাহী পরিচালক হিসেবেও দায়িত্বরত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি মহিলা ঐক্য পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলায়।


আরো সংবাদ




bedava internet