১৬ জুন ২০১৯

জাতীয় পার্টিতে নতুন সমীকরণ! জি এম কাদেরকে আশ্বাস এরশাদের

এরশাদ রওশন ও কাদের - সংগৃহীত

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান, বিরোধীদলীয় নেতা, সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অনুজ জি এম কাদেরকে পার্টির কো-চেয়ারম্যান পদে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। আগামী দুই-এক দিনের মধ্যেই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

গতকাল বুধবার পার্টি চেয়ারম্যান এরশাদের সাথে একান্ত বৈঠকে জি এম কাদেরকে ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র ও দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। এরশাদের বারিধারার বাসভবন প্রেসিডেন্ট পার্কে রংপুরের নেতাদের সাথে বৈঠক করেন এরশাদ। এর আগে মঙ্গলবার টেলিফোনে রংপুরের মেয়রকে ঢাকায় এসে কথা বলার আহ্বান জানান তিনি।

বৈঠক শেষে মেয়র মোস্তফা বলেন, আমার সাথে একান্তে চেয়ারম্যানের আট মিনিট কথা হয়েছে। স্যার (এরশাদ) আমাকে বলেছেন, তুমি যখন বলছো, করে দেবো। আমার ধারণা, দুই-এক দিনের মধ্যে কাদের ভাইকে (জিএম কাদের) কো-চেয়ারম্যান পদে বহাল করা হবে। তিনি বলেন, কিছু দালাল স্যারকে কাদের ভাই সম্পর্কে বিভ্রান্ত করেছে। ৫ তারিখের মধ্যে ব্যবস্থা না হলে ৬ এপ্রিল গণপদত্যাগ হবে। রংপুরের আট জেলায় কোথাও জাতীয় পার্টির কোনো কর্মসূচি পালন করতে দেয়া হবে না। কিছু নেতা সম্ভবত স্যারকে বলেছে, আমরা পদত্যাগ করলে কোনো সমস্যা হবে না। তাদের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি দিয়ে মেয়র বলেন, বাড়াবাড়ি করলে এসব নেতার চামড়া থাকবে না।

এ দিকে পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জি এম কাদেরকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করার দাবিতে মানববন্ধন করেছে জাতীয় পার্টি ঐক্যজোট ও তৃণমূল জাতীয় পার্টি। গতকাল বুধবার বেলা ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে নেতাকর্মীরা দাবি করেন, উত্তরবঙ্গের অহঙ্কার, মিস্টার ক্লিন ম্যান খ্যাত জি এম কাদেরের মতো পরিচ্ছন্ন মানুষকে জাতীয় পার্টির সর্বোচ্চ দায়িত্বে দেখতে চাই। দেশের শান্তির জন্য জাতীয় রাজনীতিতে ভালো মানুষের বিকল্প নেই। তারা বলেন, জাতীয় পার্টির দুঃসময়ে এরশাদ জেলে গেলে জি এম কাদের চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়ে নেতাকর্মীদের ছায়া হয়ে পাশে এসে দাঁড়ান। পরে শেখ হাসিনার মহাজোট আমলে মন্ত্রী হয়েও তিনি অতি সাধারণ জীবনযাপন করেছেন। নীতি-আদর্শে সফলতার সাথে রাষ্ট্রের দায়িত্বও পালন করেছেন। তাই তৃণমূল নেতাকর্মীদের দেয়া আলটিমেটামের মধ্যে দলের আগামী দিনের অভিভাবক জি এম কাদেরকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও কো-চেয়ারম্যান পদে পুনর্বহালের জোর দাবি জানান।

জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা বলেন, এরশাদের অবর্তমানে জাতীয় পার্টির প্রধান হিসেবে জি এম কাদেরকেই দেখতে চাই। এ সময় মানববন্ধনে অংশ নেয়া শত শত নেতাকর্মী এ বক্তব্যের পক্ষে নানা ধরনের সেøাগান দিতে থাকেন। তিন ঘণ্টা ধরে চলা মানববন্ধনে নেতাকর্মীরা বলেন, পার্টির কয়েকজন দুর্নীতিবাজ প্রেসিডিয়াম সদস্য ছাড়া দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা ভবিষ্যতে জি এম কাদেরের হাতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেখতে চান। তারা এসব দুর্নীতিবাজ নেতাদের বিষয়ে দুদককে খোঁজখবর রাখারও আহ্বান জানান।

বক্তারা বলেন, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলতে চাই- জি এম কাদের একজন সাবেক পেশাজীবী ইঞ্জিনিয়ার। জাতীয় পার্টির দুঃসময়ে এরশাদ মুক্তি আন্দোলনেও তার রয়েছে উজ্জ্বল ভূমিকা। তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা রয়েছে। দশম জাতীয় সংসদে দলের চেয়ারম্যানের নির্দেশক্রমে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। দীর্ঘ সময় সরকারের মন্ত্রী ছিলেন জি এম কাদের। কিন্তু দুর্নীতির কালিমা তাকে সামান্যতম স্পর্শ করেনি।

তারা বলেন, গণতন্ত্রের বিকাশ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বিভিন্ন সময়ের ঘটনাবলি ও সমস্যা নিয়ে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় তার অসংখ্য কলাম বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। লেখক হিসেবেও তার যথেষ্ট সুনাম আছে। জাতীয় পার্টির অনেক নেতাকর্মীর কাছে বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন নেতা হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন ক্রমান্বয়ে। একজন পেশাজীবী থেকে সফল রাজনীতিবিদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন এভাবেই। জি এম কাদের সফল রাজনীতিবিদ এ কারণে যে, তার আচার-আচরণে সরলতা আছে। নেতাকর্মীদের সুখে- দুঃখে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে সবাইকেই তিনি তার পরিবারের সদস্য মনে করেন। জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের জন্য তার দরজা ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকে এবং থাকবে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নেতাকর্মীদের পদচারণায় মুখোরিত থাকে তার বাড়ির আঙ্গিনা। তিনি নেতাকর্মীদের মুখের দিকে তাকালেই বুঝতে পারেন কার কী সমস্যা। জি এম কাদের কোনো দিন দলীয় পদ-পদবি কিছুই চাননি। এরশাদ স্বেচ্ছায় তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছেন। এই সহযোগিতা নিয়ে দলের সাংগঠনিক অবস্থা গতিশীল করেছেন নতুন-পুরনোর সমন্বয়ে জাতীয় পার্টিকে সুসংগঠিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরে বেরিয়েছেন। জি এম কাদের দলের ত্যাগী, মেধাবী ও বলিষ্ঠ নেতাদের নিয়ে সুস্থ ধারার রাজনীতি শুরু করেছেন। 

সমাবেশে বক্তারা বলেন, বর্তমান সময় দলের ভেতর লুকিয়ে থাকা হাতেগোনা কয়েকজন নেতার ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছেন জি এম কাদের। আমরা হতবাক হয়ে লক্ষ করি যে, হঠাৎ করে তাকে কয়েকটি পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে। বিস্মিত হয়েছি যে, দায়িত্ব পালনে তিনি ব্যর্থ এমন কথাও বলা হয়েছে। সুনির্দিষ্টভাবে কোন বিষয়ে তিনি ব্যর্থ সেটি উল্লেখ করা হয়নি। তা ছাড়াও, তিনি পার্টিতে বিভাজন তৈরি করেছেন বলা হয়েছে। কিন্তু কী বিভাজন কেমন করে সৃষ্টি করা হলো বলা হয়নি।

সমাবেশ শেষে দলের নেতাকর্মীরা পার্টি চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সাথে দেখা করেন। তাকে একটি লিখিত বক্তব্য দেন। এতে বলা হয়, জি এম কাদেরকে পদ থেকে অপসারণ করার সময় তিনি তিনটি দায়িত্ব পালন করছিলেন। প্রথমত. কো-চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন বিগত প্রায় তিন বছর ধরে। এ সময় সার্বিক দায়িত্বে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে তার ওপরে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ও চেয়ারম্যান বর্তমান ছিলেন। তার নিচে দলের মহাসচিব সার্বিকভাবে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে কোনো ব্যর্থতার কথা বলা হলেও এককভাবে জি এম কাদেরকে দায়ী করা যুক্তিসঙ্গত নয়। 

দ্বিতীয়ত. জি এম কাদের পার্টির চেয়ারম্যানের তৎকালীন সর্বশেষ নির্দেশ মোতাবেক চেয়ারম্যানের অবর্তমানে অথবা চিকিৎসারত অবস্থায় বিদেশে থাকাকালীন পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনের সময় ছিল মাত্র ১০ দিন। কারণ এই সময়ে পার্টির চেয়ারম্যান চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে ছিলেন ১৪ দিন। এই সময়ে জি এম কাদেরও তার সাথে ছিলেন ৪ দিন। বাকি ১০ দিন তার অবর্তমানে জি এম কাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে দলীয় কর্মকাণ্ড বলতে দলীয় প্রধানের রোগমুক্তি কামনায় বিভিন্ন স্থানে দোয়া ও ফাতেহা পাঠের আয়োজন ছিল প্রধানত। তা ছাড়াও অন্য কিছু দায়িত্ব থাকলেও তা তিনি পালন করেছেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে এত কম সময়ের জন্য দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনের ব্যর্থতা বলাটা কতটা যুক্তিসঙ্গত। 

তৃতীয়ত. একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিরোধী দলীয় উপনেতা হিসেবে জি এম কাদের দায়িত্ব পালন করেছেন। সেখানে দলের পক্ষ থেকে সংসদে প্রারম্ভিক ভাষণ ও বিরোধী দলীয় নেতার পক্ষে তার নির্দেশক্রমে সমাপনী ভাষণ প্রদান করেছেন। এ দু’টি ভাষণই সংসদের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক প্রসংশিত হয়েছে। ভাষণের সূত্র ধরে প্রধানমন্ত্রী দুবারই দীর্ঘ ও মূল্যবান বক্তব্য রেখেছেন। এ ছাড়া জি এম কাদের সংসদ চলাকালীন অধিকাংশ সময় অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন এবং অধিবেশন ব্যতীত সংসদ সদস্য ও দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে সংসদ উপনেতার কক্ষে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতবিনিময় ও দিকনির্দেশনা প্রদান করতেন।


আরো সংবাদ