২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

বিনা বিচারে জেল খেটেছেন আরো অনেক ‘জাহালম’

জাহালম - সংগৃহীত

বিনাবিচার, বিনা দোষে কারাগারে জীবন কাটানো হতভাগাদের সাম্প্রতিক একটি প্রতীকী নাম টাঙ্গাইলের জুটমিল শ্রমিক জাহালম। তিন বছর জেল খেটে মুক্তি পেয়েছেন জাহালম। অসহায় সুরুজও ১৩ বছর পর মুক্তি পেয়েছেন, কিন্তু বের হয়নি খবর। মিতুল, কাজল, অনিকের মতো এ তালিকা অনেক অনেক দীর্ঘ! কী হয়েছিল এদের জীবনে? 

ট্রাক হেলপার সুরুজ মিয়ার বাড়ি যশোরের শার্শা উপজেলা সদরে। পরিবার বলতে কিছুই নেই তার। পথেই কাটছিল জীবন। কিন্তু হঠাৎ তার জীবনেও নেমে এলো অমানিশা। মাদক পরিবহনের অভিযোগে একদিন গ্রেফতার হয়ে ঠাঁই হয় কারাগারে। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণিত না হলেও মুক্তি মেলেনি তার। বিনা বিচারেই জীবনের ১৩টি বছর কাটাতে হয়েছে কারাগারে। 

২০০৬ সালের ২০ মার্চের ঘটনা। মালবোঝাই ট্রাক নিয়ে সুরুজ যশোর থেকে এসে ছিলেন ঢাকায়। পথে রাজধানীর ধানমন্ডি থানা পুলিশ ট্রাকটিকে থামিয়ে তল্লাশি করে। ট্রাকের ভেতরে মালামালের সাথে পাওয়া যায় মাদকদ্রব্য। তখন পুলিশ ট্রাকের হেলপার সুরুজ মিয়াকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। তার বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করে ধানমন্ডি থানা পুলিশ। সেই মামলায় আদালত তাকে পাঠিয়ে দেন জেলে। এই মামলায় সুরুজের সাজা হয়নি। এমনকি তার বিরুদ্ধে অভিযোগও প্রমাণিত হয়নি। কারণ ১৭ বছরের (গ্রেফতারের সময়) সুরুজ মিয়া জানতেনই না তার ট্রাকে কিভাবে মাদক এলো। দরিদ্র সুরুজের জামিনের জন্য আদালতে দাঁড়াননি কোনো আইনজীবী। ছিল না কোনো ওকালতনামা। 

অবশেষে অসহায় কারাবন্দীদের আইনি সহায়তা দিয়ে থাকে এমন একটি সেবামূলক সংস্থা লিগ্যাল অ্যাসিসটেন্স টু হেল্পলেস প্রিজনার্স অ্যান্ড পার্সনস (এলএএইচপি) তার সন্ধান পায়। তাদেরই আইনি সহায়তায় গত ১৪ জানুয়ারি ঢাকার কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্ত হন সুরুজ। 
গোপালগঞ্জের কাশিয়ানি উপজেলার আব্দুল নোয়ারুল হকের ছেলে এনামুল হক মিতুল। বিদেশ যাওয়ার জন্য গ্রামের শেষ সম্বল একখণ্ড জমি বিক্রি করে মিতুল টাকা নিয়ে আসেন ঢাকায়। মিরপুর ১২ নম্বরে একটি ট্রাভেল এজেন্সিকে অগ্রীম ৪৫ হাজার টাকা দেবেন বলে। পথে কাজীপাড়া এলাকায় পুলিশ তাকে টাকাসহ গ্রেফতার করে। পরে পুলিশ তাকে একটি বিস্ফোরক মামলার আসামি করে। মামলায় বলা হয়Ñ ‘আয়েশা সিদ্দিকা নামের একজনকে হত্যার উদ্দেশ্যে বোমা তৈরি করে তা বিক্রিবাবদ ৪৫ হাজার টাকা পায় মিতুল। সেই টাকাসহ মিতুলকে হাতেনাতে ধরা হয়েছে।’ এই মামলায় ২০১৪ সালের অক্টোবরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠান। চার বছর দুই মাস কারাভোগের পর গত বছরের ডিসেম্বরে এলএএইচপির সহায়তায় মুক্ত হন মিতুল। এত দীর্ঘ সময় এমন কেউ ছিলেন না যে, তার জন্য আদালতে কেউ জামিন চাইবেন। 
দুই যুবক কাজল ও অনিক। ২০১৬ সালের ২৫ নভেম্বর কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার দনিয়া কবরস্থানের পাশ থেকে গ্রেফতার হন। তারা জানতেনই না কেন পুলিশ তাদের গ্রেফতার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে ছিনতাই মামলা হয়। এ মামলায় তাদের জেলে পাঠান আদালত। কিন্তু হতদরিদ্র কাজল ও অনিকের মামলা চালানোর মতো কেউ ছিলেন না। তাই জীবনের দুই বছর ১৭ মাস কারাগারেই কাটাতে হয় তাদের। এরপর এলএএইচপির সহায়তায় গত ১৩ ডিসেম্বর মুক্ত হন তারা।
এমনিভাবে ঢাকার শাহীন এক বছর, জামালপুরের লাবনী দেড় বছর, কুমিল্লার আব্দুল হাই এক বছর ৯ মাস, ঢাকার নাদিম এক বছর তিন মাস বিনাবিচারে জেল খেটে বের হয়েছেন সম্প্রতি। 

এ ব্যাপারে এলএএইচপির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট তৌফিকা করিম বলেন, সুরুজ মিয়া, কাজল, অনিক, মিতুল, শাহীনের মতো অনেকেই অসহায়ত্ব আর মিথ্যা অভিযোগের দায়ভার নিয়ে বিনা বিচারে জেল খেটেছেন বা এখনো খাটছেন দেশের বিভিন্ন কারাগারে। তাদের যেন আর কারাগারের অন্ধকারে জীবন কাটাতে না হয় সে জন্য কাজ করছে এলএএইচপি। পাশাপাশি কারামুক্ত এসব অসহায়দের মানসিক অবস্থার উন্নতির জন্য উপযুক্ত কাউন্সিলিং দেয়া হচ্ছে। কারামুক্তির পর বাকি জীবন যেন সুন্দর কাটে সে লক্ষ্যে তাদের কর্মসংস্থানের বিষয়েও পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

তৌফিকা করিম আরো জানান, ২০০৯ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকে ২০১৯ সালের মার্চ পর্যন্ত ৫৫৮ জন অসহায় কারাবন্দীকে তারা জামিনে মুক্ত করেছেন। এলএএইচপির আইনজীবী প্যানেলের সদস্যরা বর্তমানে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নোয়াখালী, কক্সবাজার, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, রংপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে অসহায় কারাবন্দীদের মুক্তির বিষয়ে কাজ করছেন। 
অসহায় বন্দীদের মুক্ত করা প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেছেন, বিনাবিচারে কাউকে কারাগারে রাখাটা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। বর্তমান সরকার মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় যেখানে সচেষ্ট সেখানে বিনা বিচারে অসহায় মানুষকে জেল খাটার ঘটনা খুবই দুঃখজনক। তাই দেশের কোনো মানুষ যাতে মিথ্যা মামলায় অথবা শুধু দরিদ্র হওয়ার কারণে বিনা বিচারে কারাগারে না থাকেন সে ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।


আরো সংবাদ

জি কে শামীমের সাথে দু’টি ছবি নিয়ে না’গঞ্জে তোলপাড় কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে পরিবার ও সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্বে দেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে : ড. আব্দুর রাজ্জাক এরশাদের স্মরণসভায় জি এম কাদের জাতি দুর্নীতিমুক্ত সমাজ দেখতে চায় সমুদ্র নিরাপত্তা ও ব্লু-ইকোনমি বিষয়ক সেমিনার অনুষ্ঠিত জাতিসঙ্ঘের অধিবেশনে যোগ দিতে টেলিলিংক গ্রুপ চেয়ারম্যানের ঢাকা ত্যাগ শিশুদের যৌন হয়রানি রোধে ডুফার কর্মশালা আশুলিয়ায় গার্মেন্টে চাকরি নিতে এসে তরুণী ধর্ষিত হাতিরঝিল লেক থেকে লাশ উদ্ধার ভিক্টর ক্লাসিক বাসের চালক-সহকারী গ্রেফতার বাংলাদেশের শুভ সূচনা শ্রীলঙ্কাকে উড়িয়ে

সকল