১৬ অক্টোবর ২০১৯

দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে প্রবাসীদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান

প্রধানমন্ত্রী
দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে প্রবাসীদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান - ছবি : বাসস

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রবাসে বসবাসরত বাংলাদেশের প্রকৌশলীদের এ মাটিরই সন্তান আখ্যায়িত করে দেশের চলমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অবদান রাখার আহবান জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অনাবাসিক প্রকৌশলীগণ দেশের তথ্য প্রযুক্তি, কৃষি, শিল্পোৎপাদন, যোগাযোগ এবং সমুদ্র সম্পদ আহরণে ব্যাপক ভূমিকা পালন করতে পারেন।’

‘তারা পলিসি লেভেল চ্যালেঞ্জ এবং ইনস্টিটিউশন লেভেল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে দেশের চলমমান উন্নযনের ধারাকে এগিয়ে নিতে পারেন, যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক হোটেল সোনারগাঁওয়ে অনাবাসী (এনআরবি) প্রকৌশলীদের প্রথম কনভেনশনের উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির ভাষণে একথা বলেন।

বাংলাদেশের উন্নয়নটা কেবল শহর কিংবা রাজধানী ভিত্তিকই নয়, তার সরকার পুরো গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন করতে চায় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে আপনারা যারা বিদেশ থেকে এসেছেন, বাংলাদেশের কোনো না কোনো গ্রামেই আপনাদের বাড়িঘর, সেখানে আপনাদের শিকড় রয়ে গেছে। শিকড়ের সন্ধান করে আপনাদের যার যার অঞ্চলের কিভাবে উন্নয়ন করতে পারেন, আপনাদের কাছে সে অনুরোধ আমি করবো। আপনারা সেদিকটাতেও একটু বিশেষভাবে নজর দেবেন।’

তিনি প্রবাসী প্রকৌশলীদের উদ্দেশ্যে আরও বলেন, ‘বিদেশে আছেন এটা ঠিক, কিন্তু এই মাটির সন্তান আপনারা। এই দেশ এই মাটি ও মানুষ এটাই আপনাদের মূল জায়গা। এটাই আপনাদের শিকড়। আর এই শিকড়ের সন্ধানেই আপনারা আজকে এসেছেন।’

প্রধানমন্ত্রী এ সময় প্রবাসী প্রকৌশলীদের স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘আপনাদের এই উদ্যোগ বাংলাদেশের উন্নয়নকে আরো ত্বরান্বিত করতে পারবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), ব্রীজ টু বাংলাদেশ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক্সেস টু ইনফর্মেশন (এটুআই) প্রকল্পের যৌথ উদ্যোগে সরকারের নীতিগত পর্যায়ে এবং প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে অনিবাসী প্রকৌশলীরা কিভাবে সহযোগিতার মাধমে অবদান রাখতে পারেন সেজন্যই দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনের আয়োজন।

পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে জাতীয় অধ্যাপক ড.জামিলুর রেজা চৌধুরী এবং ব্রীজ টু বাংলাদেশ’র চেয়ারম্যান আজাদুল হক বক্তৃতা করেন। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সিনিয়র সচিব মনোয়ার আহমেদ স্বাগত বক্তৃতা করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, আপনারা যে পলিসি লেভেল চ্যালেঞ্জ এবং ইনস্টিটিউশন লেভেল চ্যালেঞ্জ ভালভাবে চিহ্নিত করেছেন সেই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অবলম্বনের মাধ্যমে এই দেশের যেন আমরা ভালোভাবে উন্নয়ন করতে পারি সে বিষয়গুলোও আপনারা দেখবেন। আর আপনাদের এই ফাস্ট কনভেনশন অব এনআরবি ইঞ্জিনিয়ার্স -২০১৯ এর প্রহণযোগ্য সুপারিশ সমূহ নিয়ে ভাল একটা নীতিমালা আমরা গ্রহণ করতে পারবো বলেই আমি মনে করি এবং সেভাবেই এটা তৈরী করবেন।

তার সরকার গত ১০ বছরে দেশের অভূতর্পূব উন্নয়ন করেছে উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, ‘আজকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৪১তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হিসেবে স্বীকৃত। অর্থনৈতিক অগ্রগতির সূচকে বিশ্বের শীর্ষ ৫টি দেশের একটি এখন বাংলাদেশ।’

তিনি বলেন, জনগণের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৭৫১ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ৮৬-এ উন্নীত হয়েছে, একে আমার দুই অংকে নিয়ে যেতে চাই। আর এই সময়ের মধ্যেই দারিদ্র্যের হার ২১ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে এবং মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৪ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘উচ্চ প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে এবং মূল্যস্ফীতি কম থাকলে তার সুফলটা দেশের সাধারণ জনগণ ভোগ করে। যেটা এখন তারা ভোগ করছে।’

তার সরকার উন্নয়নের ক্ষেত্রে গ্রামকে প্রাধান্য দেয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে খাদ্য উৎপাদনে যথেষ্ট স্বয়ং সম্পূর্ণতা অর্জন করেছে এবং তার সরকার এখন উদ্বৃত্ত খাদ্য উৎপাদন করছে।

তিনি বলেন, খাদ্য মজুদের জন্য সরকার আধুনিক খাদ্য গোডাউন এবং সাইলো তৈরি করছে কারণ আমাদের দেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রবণ দেশ বিধায় দুর্যোগ হলেও যেন খাদ্য সমস্যা না হয়। কখনো আর কারো কাছে যেন হাত পাততে না হয়।

তিনি এ সময় স্বাধীনতার পরে ১৯৭৪ সালে বহিবিশ্বের কারো কারো মদদে দেশে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ‘কারণ আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা রয়েছে যে, অন্যের কাছে খাবার আনতে যেয়ে আমাদের দেশে সময় মতো এই খাদ্য না পাঠিয়ে দুর্ভিক্ষ ঘটানোরও চক্রান্তে বাংলাদেশ পড়েছিল। সেটা যাতে না হয় তারজন্যই আমরা আপদকালিন খাদ্য মজুদের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।’

তিনি দেশের বর্তমান উন্নয়নে প্রবাসীদের অংশহণমূলক সহযোগিতার উল্লেখ করে বলেন, আমাদের দেশের উন্নয়নে প্রবাসীদেরও অবদান রয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রবাসীদের অর্জিত অর্থ আমাদের অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রাখে। কাজেই সেদিক থেকে আমরা সবসময়ই প্রবাসীদের সম্মানের চোখে দেখি।

প্রধানমন্ত্রী মেধা পাচার প্রসঙ্গে বলেন, একটা কথা সবসময় বলা হয় যে, ব্রেইন ড্রেইন। আমি সেটা মনে করি না। বরং আমাদের দেশেতো লোকের অভাব নেই, যুবসমাজের অভাব নেই। আমরা যদি তাদের সুশিক্ষিত করতে পারি তাহলে তারা দেশে থেকেই যে দেশের উন্নয়ন করতে পারে।

তিনি বলেন, আজকের বাংলাদেশটাকে যদি দেখেন তাহলে অবশ্যই সেটা সম্ভব বলে আপনারাও মেনে নেবেন।

তিনি এ সময় বলেন, বিদেশে যারা লেখাপড়া করতে গিয়ে থেকে যান বা বিভিন্ন ব্যবসায়িক কারণে বা কর্মসূত্রে বিদেশে গিয়ে যারা প্রবাসী হয়ে যান তারা যে অভিজ্ঞতাটা সঞ্চয় করেন তার মূল্যও কম নয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যদি বিশ্বকে না দেখি, কোথাও না যাই তাহলে আমরা জানবো কি করে যে বিশ্বের অন্যত্র কি হচ্ছে, সেখানেও একটি জ্ঞান অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হয়।’

প্রধানমন্ত্রী তার দেশে শিল্পায়নের জন্য বিনিয়োগ একান্তভাবে দরকার উল্লেখ করে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করায় সরকারের দেয়া বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা অনেক সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছি। অনেক দেশের সঙ্গে আমাদের চুক্তি থাকার ফলে ডাবল ট্যাক্সেশন আমরা অ্যাভয়েড (এড়িয়ে যেতে) করতে পারি। বিনিয়োগকারিরা চাইলেই তাদের মুনাফা এবং আসল সহ তারা চলে যেতে পারবেন। মেশিনারি আমদানিতে ট্যাক্স হলিডে পাবেন।’

তার সরকার সারাদেশে যে একশ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছে সেখানে সরকার প্রদত্ত সুযোগ গ্রহণ করে বিনিয়োগে বিদেশিদের পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশীরাও এগিয়ে আসবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, ‘প্রবাসীদের বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে তিনটা এনআরবি ব্যাংক আমরা করে দিয়েছি।’

রফতানির ক্ষেত্রে রফতানি বহুমুখিকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তৈরী পোশাক রপ্তানীর ক্ষেত্রে আমরা বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছি এটা ঠিক। কিন্তু একটা কথা মনে রাখতে হবে, একটা জিনিষের রফতানির ওপর নির্ভর করে কোন একটা দেশ চলতে পারে না। আমাদের রফতানি বহুমুখীকরণ করতে হবে।’

তিনি এ সময় বাংলাদেশে পাটের জীবন রহস্য উন্মোচনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলে, ‘পাট দিয়ে আমরা বহুমুখী পণ্য এখন উৎপাদন করতে পারি। কাজেই আমাদের এই সুযোগটা কাজে লাগাতে হবে।’

নদীমাতৃক এই বাংলাদেশ এখন মিঠা পানির মৎস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ উল্লেখ করে তিনি মিয়ানমার এবং ভারতের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে বিশাল সমুদ্রসীমা অর্জনের ফলে সমুদ্রসম্পদ আহরনের দ্বার উন্মোচিত হবার প্রসঙ্গও টেনে আনেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষিপণ্য উৎপাদন এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশে রপ্তানীর মাধ্যমেও আমরা বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারি।

আইসিটি খাতকে দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে উল্লেখ করে সরকার প্রধান হাইটেক পার্ক এবং বিভিন্ন ডিজিটাল পার্ক তৈরিতে তার সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে বলেন, সারাদেশে প্রথম পর্যায়ে আমরা ৫ হাজার ২৭৫টি ডিজিটাল সেন্টার করে দিয়েছি। আমরা দেখেছি এখানে গ্রামের মায়েরাও প্রবাসী আপনজনের সঙ্গে কথা বলার জন্য তাঁদের দেখার জন্য আঁচলে কয়েকটি টাকা বেঁধে বসে থাকছে।

বাংলাদেশের জনগণ যতটা শিক্ষিত বা অল্প শিক্ষিতই হোক না কেন তাঁরা আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়া বা দ্রুত শিখতে পারে বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের লোক শিক্ষিত, অশিক্ষিত সেটা হিসেবে করার দরকার নেই। আমাদের দেশের লোক অত্যন্ত মেধাবী এবং তারা যে কোনো ডিভাইস ব্যবহারটা দ্রুত শিখে নিতে পারে।’

প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে কম্পিউটার সামগ্রীর শুল্ক হ্রাস করে একে জনগণের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা, বেসরকারী খাতকে উন্মুক্ত করার মাধ্যমে মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইসকে জনগণের আওতার মধ্যে আনা এবং বিপুল সংখ্যক জনগণের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তার সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরেন।

তিনি বিএনপি সরকারের সময় দেশের বিনামূল্যে সাবমেরিন কেবলের সাথে সংযুক্ত হবার সুযোগ দেশের তথ্য পাচার হয়ে যাবার ওজর তুলে হারানোরও কঠোর সমালোচনা করে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট মহাকাশে উৎক্ষেপণসহ সারাদেশে ইন্টারনেট সার্ভিস চালু করায় সরকারের পদক্ষেপসমূহও তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২০ হাজার ৮৮৫ মেগাওয়াটে উন্নীত করায় দেশের শতকরা ৯৩ শতাংশ মানুষ এখন বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে। অচিরেই দেশের সকল ঘরে বিদ্যুতের আলো জ্বলবে।

তিনি বলেন, জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করেছি। কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে মানুষ ঘরে বসে স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে। ৩০ পদের ঔষধ বিনামূল্যে পাচ্ছে।

তার সরকারের পঞ্চবার্ষিক এবং দীর্ঘমেয়দি প্রেক্ষিত পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে এ সময় তিনি দেশের দ্রুত উন্নয়নে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের চিত্র তুলে ধরেন।

এরমধ্যে রয়েছে- পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, গভীর সমুদ্রবন্দর, ঢাকা ম্যাস-র‌্যাপিড ট্রানজিট প্রকল্প, এলএনজি টার্মিনাল, মহেশখালি মাতারবাড়ি সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম, পায়রা সমুদ্র বন্দর, পদ্মাসেতু রেল সংযোগ এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল লাইন স্থাপন এবং কর্ণফূলী নদী তলদেশে টানেল নির্মাণ।

২০২১ সাল নাগাদ দেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত হিসেবে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি।


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum