১৮ জুন ২০১৯

নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা বিএনপির

নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করছে বিএনপি - সংগৃহীত

৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আসনভিত্তিক অনিয়মের বিরুদ্ধে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করছে বিএনপি। বিদ্যমান বাস্তবতায় ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে না, সিনিয়র আইনজীবীদের এমন মতামত আমলে নিয়েই একযোগে সব প্রার্থী মামলা করার বদলে অতিমাত্রায় অনিয়ম হওয়া কয়েকটি আসনের বিষয়ে মামলা করার চিন্তা করা হচ্ছে। তবে অনিয়মের সব তথ্য জাতিকে জানাতে তথ্যপ্রমাণসহ একটি বই প্রকাশ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া ভিডিও ফুটেজের সিডিও প্রস্তুত করা হচ্ছে। এদিকে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্যে বিএনপির বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটি ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে পুরনো কমিটি। 

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মাত্র ৭টি আসনে জয় পায়। এরপর ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে তারা। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়ে স্মারকলিপি দেয়। এ ছাড়া নির্বাচনের তিন দিন পর ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থীদের বিএনপির গুলশান অফিসে ডেকে নির্বাচন নিয়ে তাদের বিস্তারিত অভিজ্ঞতা শোনা হয়। সেখানেই প্রার্থীরা নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। পরে জাতীয় সংলাপ অনুষ্ঠান, নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে দ্রুত মামলা দায়ের ও নির্বাচনী সহিংসতা কবলিত এলাকায় ফ্রন্টের শীর্ষ নেতাদের সফরসহ তিন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কর্মসূচির অন্যতম জাতীয় সংলাপের প্রস্তুতি এখন চলছে। আর নির্বাচনী সহিংসতা কবলিত এলাকাগুলো ফ্রন্টের শীর্ষ নেতাদের সফরও চলছে। তবে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে একযোগে মামলা করার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়েছে। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্বাচনের পরে সব ক’টি সংসদীয় আসনের প্রার্থীর সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপি নেতারা। সব প্রার্থীই মামলার ব্যাপারে একমত হন। এ জন্য প্রস্তুতি নেয়ার কথাও বলা হয় প্রার্থীদের। মামলা করার জন্য সব প্রার্থীর কাছে অনিয়মের দালিলিক প্রমাণ চাওয়া হয়। এরমধ্যে অনেক প্রার্থী বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত জমা দিয়েছেন। নির্বাচনে অনিয়ম, কারচুপি, এজেন্ট ও নেতাকর্মীদের গ্রেফতার, নির্বাচনী সহিংসতায় হতাহতদের তালিকা, প্রতিটি কেন্দ্রের অস্বাভাবিক ভোটের হিসাবসহ ৮টি বিষয়ে তথ্যপ্রমাণসহকারে প্রতিবেদন দেন প্রার্থীরা। এ ছাড়া নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে ফল প্রকাশ পর্যন্ত কী ধরনের প্রতিবন্ধকতার মধ্যে পরতে হয়েছে এসব বিষয়ের ভিডিও ফুটেজও দেন অনেক প্রার্থী। অনিয়মের পর্যাপ্ত দালিলিক প্রমাণ পাওয়ার পরে মামলার জন্য দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচন বিষয়ে আইনজীবীসহ অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নেয়া হয়। কিন্তু তাদের অনেকেই বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে মামলার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করেন। 

দলের সিনিয়র এক নেতা জানান, মামলা করার জন্য সব ধরনের দালিলিক প্রমাণ তারা হাতে পেয়েছেন। প্রার্থীদের নিজস্ব প্রমাণ ছাড়াও দেশী ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও নির্বাচনে অনিয়মের অনেক প্রমাণ তাদের কাছে আছে। এই অবস্থায় ট্রাইব্যুনালে মামলা করাই উচিত ছিল। কিন্তু চেয়ারপারসনের ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে আদালতকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপিকে ঘায়েল করা হয়েছে। এজন্য আদালতের ওপর বিএনপি আর আস্থা রাখতে পারছে না। নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করার বিষয়ে আইনজীবী বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হচ্ছে, আদালত থেকে ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে না বরং আইনিভাবে ৩০ ডিসেম্বরের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনকে স্বীকৃতি দেয়া হবে। তাদের পরামর্শ এবং নানা বিবেচনায় ট্রাইব্যুনালে মামলার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে বিএনপি। 

এই নেতা আরো বলেন, যে দেশে প্রধান বিচারপতি বিচার পান না, অন্যায়ভাবে তিনবারের প্রধানমন্ত্রীকে জামিনে পর্যন্ত মুক্তি দেয়া হয় না সেখানে বিচার পাওয়ার ব্যাপারে আর আস্থা রাখা যায় না। তিনি বলেন, মামলা না করলেও অনিয়মের তথ্য জাতিকে জানানো হবে। নির্বাচনে অনিয়মের দালিলিক তথ্যপ্রমাণসহ একটি বই প্রকাশ করা হবে। 
এ ছাড়া ভিডিও ফুটেজের একটি সিডি প্রস্তুত করে জাতিকে দেখানো হবে। এছাড়া মামলা কেন করা হলো না ভবিষ্যতে দেশী ও আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে কথা উঠতে পারে এ বিবেচনায় কুুমিল্লা-৩, বি-বাড়িয়া-৩, চাঁদপুর-৩, ঢাকা-৪, ঢাকা ১১, সিরাজগঞ্জ-৫সহ অর্ধশতাধিক আসন যেগুলোতে ব্যাপক কারচুপি ও প্রার্থীর ওপর হামলার মতো ঘটনা ঘটেছে সেসব আসনের ব্যাপারে ট্রাইব্যুনালে প্রতীকী কিছু মামলা করা হতে পারে। 
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, এ ব্যাপারে বিচার বিশ্লেষণ চলছে। এর ভবিষ্যৎ কী হতে পারে তাও ভাবা হচ্ছে। অনেক ধরনের মত এসেছে। সব বিষয়ে আলোচনা করে দলীয় ফোরাম মামলা করা না করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। 

প্রসঙ্গত, নির্বাচনী ফলাফলের গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে হাইকোর্টের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করতে হয়। ২ জানুয়ারি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৮ আসনের ফলের গেজেট জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে পাঠানো হয়। আর ৩ জানুয়ারি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠিত হয়। এ হিসাবে এ মাসের বাকি সময়ের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে মামলা করতে হবে। 

বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটি বিলুপ্ত, ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ : দলের বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটির কার্যক্রম বিলুপ্ত করেছে বিএনপি। গত ১৭ জানুয়ারি এ সংক্রান্ত এক চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘বিএনপির বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটি নির্দেশক্রমে বিলুপ্ত করা হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহান্তে নতুন কমিটি গঠনের কার্যক্রম শুরু হবে। নতুন কমিটি গঠনের আগে যদি পুরনো কমিটির কোনো সদস্য কমিটি সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন মনে করেন, তা হলে তাকে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগে যোগ দেয়া বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ইনাম আহমেদ চৌধুরী এ কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন।

দলটির বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটি গত কয়েক বছরে বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে খুব একটা সফলতা দেখাতে পারেনি। 
নির্বাচনেও বিদেশীদের ইতিবাচক সহযোগিতা পায়নি দলটি। তাই এ কমিটি ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। 

জানা গেছে, কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন করার লক্ষ্যে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের সিনিয়র নেতা এবং আগে যারা এ কমিটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের মতামত নিচ্ছেন। দলের এক নেতা জানিয়েছেন, কমিটির সদস্য সংখ্যা অনেক। কিন্তু কাজ করেন গুটিকয়েক। এ জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ আছে, এমন নেতা ও দল সমর্থক বিশিষ্ট ব্যক্তিদের দিয়ে কমিটি গঠন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশ, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ, পার্শ¦বর্তী দেশ ভারত ও চীনকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নতুন বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটি গঠন করা হবে বলে জানা গেছে। এসব দেশের সঙ্গে যেসব নেতার যোগাযোগ রয়েছে, তাদেরকে কমিটিতে রাখা হবে।


আরো সংবাদ