২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯

বিরোধী দলে যেতে চায় না ক্ষুব্ধ শরিকেরা, একলা চলো নীতিতে আ’লীগ

একলা চলো নীতিতে আ’লীগ -

একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাথে জোটের শরিকদের বেশ টানাপড়েন চলছে। ক্ষমতার ভাগাভাগি তথা মন্ত্রিসভায় জায়গা পাওয়া নিয়েই এ টানাপড়েন শুরু। সময়ের সাথে সাথে তা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সর্বশেষ শনিবার বিজয়োৎসবে আমন্ত্রণ না পাওয়া শরিকরা আরো ক্ষুব্ধ। তারা অবিলম্বে সরকারের সাথে আলোচনায় বসার অপেক্ষায় রয়েছে।

এর আগে মহাজোট সরকারের আরেক শরিক জাতীয় পার্টির সাথে আওয়ামী লীগের সাথে মনকষাকষির একপর্যায়ে দলটি মন্ত্রিত্ব বাদ দিয়ে বিরোধী দলে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। 
সূত্রগুলো জানায়, এবারের মন্ত্রিসভায় জাতীয় পদটি ছাড়াও ১৪ দলের অন্য শরিকদের কাউকেই জায়গা দেয়া হয়নি। এতে চরম হতাশ হয়ে পড়েন শরিকদলগুলোর নীতিনির্ধারকরা। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, যেকোনো সময় মন্ত্রিসভা আরো বড় হতে পারে। তবে সম্প্রতি সেই অবস্থান থেকে সরে এসে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, সরকারের শরিকরা বিরোধী দলের আসনে বসলে সরকারের জন্য ভালো এবং তাদের জন্যও ভালো। এছাড়া তাদের সাথে জোট করার সময় এ ধরনের কোনো পদ পদবি দেয়ার শর্ত ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি।

মন্ত্রিসভায় স্থান না দিয়ে সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় যাওয়ার প্রস্তাবে শরিকদের সাথে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। একই প্রতীকে নির্বাচন করার পর এখন শরিক দলগুলোকে বিরোধী দলে পাঠানোর আওয়ামী লীগের ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা। বিষয়টিকে নিজেদের জন্য অপমানজনকও মনে করছেন তারা। আওয়ামী লীগের এমন একলা চলো নীতির সমালোচনা করে শরিক দলের নেতারা বলছেন, তারা ১৪ দলীয় জোটের সাথে ছিলেন, ১৪ দলীয় জোটের সাথেই থাকবেন। সরকারের শরিক হয়ে নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অংশ নেবেন ও গণতন্ত্র রক্ষায় ভূমিকা রাখবেন। সংসদের ভেতর বা বাইরে বিরোধী দলে যেতে চান না তারা। নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করে কেউ সরকারের আবার কেউ বিরোধী দলে যাওয়ার সুযোগ নেই বলেও মত তাদের।

তাদের মতে, নির্বাচনের আগে শরিক দলগুলোকে যে গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সরকার গঠনের পর এখন সেখান থেকে সরে এসেছে আওয়ামী লীগ। এটি সরকারের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। আওয়ামী লীগ ও জোটের একাধিক সূত্র জানায়, ৩০ ডিসেম্বর ভোটের পর গত ৩ জানুয়ারি ১৪ দলের প্রথম বৈঠকে শরিক দলের অবস্থান নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। পরে শরিকদের সাথে এ নিয়ে কোনো কথাও হয়নি আওয়ামী লীগের কোনো নেতার। আর কোনো ধরনের আলাপ-আলোচনা ছাড়াই আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ১৪ দলের শরিকদের বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের কথা বলেছেন। এটিকে তারা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। 
আওয়ামী লীগের এমন বক্তব্যকে একলা চলো নীতি হিসেবে উল্লেখ করছেন কেউ কেউ। সরকার ও জোট শরিকদের এমন অবস্থানের মধ্যেই নিরঙ্কুশ বিজয়কে কেন্দ্র করে শনিবার রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হলো বিজয়োৎসব। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর মধ্যে চলমান দূরত্বের ব্যাপারটি যেন আরো স্পষ্ট হলো। রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ক্ষমতাসীন দলটির বিজয় সমাবেশে দাওয়াত পাননি শরিক দলগুলোর কোনো নেতাই। ২০০৫ সালে ২৩ দফার ভিত্তিতে ১৪ দলীয় জোট গঠনের পর আওয়ামী লীগের বড় কোনো কর্মসূচিতে এই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে দাওয়াতবঞ্চিত হয়েছেন শরিক দলের নেতারা। তবে জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আক্তার দাওয়াত ছাড়াই ওই সমাবেশে গিয়েছেন বলে জানিয়েছেন।

১৪ দলের কয়েকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আওয়ামী লীগ কেন যেন শরিকদের ইচ্ছা করে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। মন্ত্রিসভায় আমরা থাকব কি থাকব না, সেটা বড় করে দেখছি না। তবে আমরা সংসদের কোথায় থাকব, সেটা তো জোটগতভাবে বসে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কিন্তু তার আগেই দূরে সরিয়ে রাখার নানা কৌশল করা হচ্ছে। এর জন্য আওয়ামী লীগকে মূল্য দিতে হবে। 
এ ব্যাপারে ওয়ার্কার্স পাটির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, নির্বাচনের পর কোনো ব্যাপারেই আওয়ামী লীগ আমাদের সাথে আলোচনা করেনি। মন্ত্রিসভা গঠন হলো। আমরা কিছুই জানি না। কেন মন্ত্রিসভায় রাখা হলো না বা ভবিষ্যতে রাখা হবে কি না তাও বলা হয়নি। এখন আওয়ামী লীগ নেতারা বিভিন্ন সময় বলছেন আমরা বিরোধী দলে যাই। কিভাবে ও কোন প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলে যাবো, সেটাও পরিষ্কার করা হচ্ছে না। ফলে আমরা এখনো সমাধানে আসতে পারিনি। তবে আমরা যেহেতু ১৪ দলীয় জোটের সাথে আছি, সেহেতু ১৪ দলেই থাকব। আমরা বিরোধী দলের আসনে বসব না।

ক্ষমতাসীন জোটের সদ্যসাবেক এই মন্ত্রী আরো বলেন, আওয়ামী লীগের বিজয় সমাবেশে আমরা দাওয়াত পাইনি। এটা দৃষ্টিকটু। আমরা থাকলে বিজয় সমাবেশ আরো ভালো হতো। বড় এই বিজয়ের অংশীদার আমরাও। বিজয় সমাবেশে শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য রাখতে দেয়া হলে বিজয় সমাবেশ আরো পরিপূর্ণ হতো। সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া বলেন, আওয়ামী লীগের বিজয় সমাবেশে দাওয়াত পাইনি। তাই যাওয়া হয়নি। 

জাসদ একাংশের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া বলেন, শুনেছি আওয়ামী লীগের বিজয় সমাবেশের কথা। আনুষ্ঠানিক দাওয়াত পাইনি। যে দূরত্ব তৈরি হতে জোটগতভাবে আলোচনা করে যাচ্ছে সমাধান জরুরি।

গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক শাহাদাৎ হোসেন বলেন, একটা সমস্যা তৈরি হচ্ছে জোটে। এটা আলোচনা করে সমাধান করা উচিত।
এদিকে আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সরকারের শরিক অনেকের উপরই সরকার বিরক্ত। আওয়ামী লীগ তথা সরকারের আশীর্বাদে ক্ষমতার অংশীদার হয়ে ছোটখাটো দলের অনেকেই নিজেদের আখের গুছিয়েছেন। বিভিন্ন সময় তাদের দাম্ভিকতাও সরকারের বিরক্তির কারণ হয়েছে। সে জন্য এবারের মন্ত্রিসভায় তাদের কাউকেই স্থান দেয়া হয়নি। এছাড়া সংসদে জাতীয় পার্টি অল্প কয়েকটি আসন নিয়ে একটি দুর্বল বিরোধী দলে পরিণত হয়েছে। বিএনপিজোট সংসদে যোগ দেয়ারই সিদ্ধান্ত নেয়নি। শেষ পর্যন্ত বিএনপি জোট না গেলে সরকারের শরিকদেরই বিরোধী দলের আসনে পাঠিয়ে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী বিরোধী দলে রূপ দেয়া হবে। সে জন্য সরকারের শরিকদের মধ্যে এখন থেকেই সরকারবিরোধী মনোভাব তৈরি করা হচ্ছে। যার অংশ হিসেবে বিজয়োৎসবে দাওয়াত দেয়া হয়নি। 

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, ১৪ দলের শরিকরা কোথায় থাকবেন তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে বিরোধী দলে গেলে মন্দ কি? আর শনিবারের উৎসব ছিল আওয়ামী লীগের দলীয় অনুষ্ঠান। সেখানে দাওয়াত দেয়া হয়েছে কি না, আমার জানা নেই। তবে একটি দলের নিজস্ব অনুষ্ঠানে দাওয়াত না দেয়া হলেও তা দোষের কিছু নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।


আরো সংবাদ