১৮ জুন ২০১৯
আদালতে খালেদা জিয়া

জনগণের পক্ষে যারা তারাই বিরোধী দল

বেগম খালেদা জিয়া - সংগৃহীত

রাজধানীর নাজিমুদ্দিন রোডে পুরনো ঢাকা কেন্দ্রীয় করাগারে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালতে নাইকো মামলার শুনানির সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, বিরোধী দল শুধু পার্লামেন্টের ভেতরেই হয় না, সংসদের বাইরেও বিরোধী দল হয়। জনগণের পক্ষে যারা তারাই বিরোধী দল। যারা জনগণের কথা বলে, মানুষের অধিকারের কথা বলে। গতকাল পুরনো ঢাকা কেন্দ্রীয় করাগারে স্থাপিত বিশেষ আদালত-৯ এর বিচারক শেখ হাফিজুর রহমানের আদালতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা নাইকো মামলার শুনানির একপর্যায়ে খালেদা জিয়া এ মন্তব্য করেন। 

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ রোববার নাইকো মামলার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি চেয়ে তার নিজের পক্ষে শুনানিতে বলেন, নাইকোর সাথে যে চুক্তি হয় সেটি শুরু হয় ১৯৯৮ সাল থেকে। ওই সময় বর্তমান সরকার ক্ষমতায় ছিল। ওই সরকারের সময় নাইকো চুক্তির সিদ্ধান্ত হয়। ফ্রেম ওয়ার্ক অব আন্ডাসটান্ডিং হয়। এরপর তিনি বলেন, বলতে অসুবিধা আমরা বিরোধী দলে। এ সময় তার পাশে থাকা কয়েকজন আইনজীবী বলেন, আপনারা এখন বিরোধী দলেও নেই। তখন মওদুদ আহমদ কোনো জবাব না দিয়ে হাসতে থাকেন। এ পর্যায়ে আদালত কক্ষে হুইল চেয়ারে বসা বেগম খালেদা জিয়া বলেন, সংসদের বাইরেও বিরোধী দল থাকতে পারে। যারা জনগণের কথা বলে, মানুষের অধিকারের কথা বলে তারাই বিরোধী দল। 

গতকাল দুপুর সোয়া ১২টায় বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে হুইল চেয়ারে করে আদালতে আনা হয়। খালেদা জিয়াকে আদালত কক্ষের একপাশ দিয়ে আনার সময় পুলিশ সদস্যরা চারপাশ ঘিরে রাখেন। এ সময় দেখা যায় তার কোমর থেকে পা পর্যন্ত সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা। খালেদা জিয়া আদালতে আসার কিছু পরই বিচারক আদালতে আসেন এবং শুনানি শুরু করেন। বেলা পৌনে ২টা পর্যন্ত নাইকো মামলার অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানি হয়। এরপর আইনজীবীদের সময় আবেদনে আদালত ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত মামলার কার্যক্রম মুলতবি করেন। এর আগে গত ৩ জানুয়ারি নাইকো মামলার অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানি শুরু হয়। 
শুনানির সময় খালেদা জিয়ার পক্ষে আদালতে আইনজীবী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, প্রবীণ আইনজীবী ও জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলী, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জয়নুল আবেদীন, সম্পাদক মাহবুবউদ্দিন খোকন, আইনজীবী মাসুদ আহমেদ তালুকদার, বুরহান উদ্দিন, আমিনুল ইসলাম, জয়নুল আবেদীন মেজবাহ, মো: আখতারুজ্জামান প্রমুখ। 
আর দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর মোশাররফ হোসেন কাজল।

গতকাল আদালতের কার্যক্রম শুরু হলে মওদুদ আহমদ বলেন, এই মামলার এফআইআরে অভিযোগ করা হয়েছে যে আমি নাইকো চুক্তির জন্য মতামত দিয়েছি। বলা হয়েছে আমি লিগ্যাল অ্যাডভাইজার ছিলাম। আইনমন্ত্রী হিসেবেও আমি মতামত দিয়েছি। আমি কি মতামত দিয়েছি, তা আমাকে দেখতে হবে। এ বিষয়ে তথ্য পাওয়ার জন্য আমি আবেদন করেছি। এটা আমার মৌলিক অধিকার আমাকে ডকুমেন্ট দেখতে দিতে হবে। আমি মতামত দিয়েছি, কি মতামত দিয়েছি তা দেখতে হবে। জব্দ তালিকার ডকুমেন্টে তা নেই। 
এরপর আদালত বলেন, আপনি একাধিক তারিখে শুনানি করেছেন, আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ সামান্য। 

এ সময় মওদুদ আহমদ বলেন, আপনি আমার বিরুদ্ধে এসব এভিডেন্স না দেখে কিভাবে চার্জ গঠন করবেন। 
আদালত বলেন, আপনি আইন অনুযাযী যা চাইবেন, তা দিবো। কিন্তু আবেদন দেননি। 
এরপর প্রসিকিউটর মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, যে ডকুমেন্ট আমরা ব্যবহার করব তা দিতে পারব। কিন্তু চাহিদা মতো ডকুমেন্ট দিতে পারব না। আসামিদের চাহিদা মতো লাইন বাই লাইন ডকুমেন্ট সরবরাহ করতে পারব না। 

এরপর আইনজীবী বুরহান উদ্দিন মওদুদ আহমদের পক্ষে বলেন, মওদুদ আহমদের পক্ষে বা তার ফার্মের পক্ষে মতামত দেয়া হয়েছে। এটা আমাদের জন্য দেখা খুবই জরুরি। 
এ সময় আদালত বলেন, আপনারা আবেদন দেন বিধি অনুযায়ী পেয়ে যাবেন। 

এরপর মওদুদ আহমদ মামলার চার্জশিট থেকে পড়েন। তিনি বলেন, ১৯৯৮ সালে ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন। তিনি সম্পর্কে আমার ভায়রা হন। এ সময় আদালতে উপস্থিত আইনজীবীরা হাসতে থাকেন। তখন মওদুদ আহমদ বলেন, আদালতের পরিবেশ যাতে রুক্ষ না হয় এ জন্য এসব কথাও বলা প্রয়োজন। এ সময় প্রসিকিউটর মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, এরকম পরিবেশ সব সময় থাকলেই ভালো। 

এরপর তিনি বলেন, চার্জশিটেই বলা হয়েছে, ১৯৯৯ সালের ২৩ আগস্ট নাইকো চুক্তির ফ্রেম ওয়ার্ক অব আন্ডাসটান্ডিং হয়। সব কিছু করেছে আগের সরকার। তিনি বলেন, অভিযোগ পড়ে মনে হচ্ছে, এই চার্জশিট তাদের বিরুদ্ধে যখন তারা সরকারে ছিল। নাইকো চুক্তির সব কিছু হয়েছে ১৯৯৭, ’৯৮, ’৯৯ ও ২০০১ সালে। তখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল। 
মওদুদ আহমদের শুনানির পর আসামি গিয়াস উদ্দিন মামুন, সেলিম ভূঁইয়া, সি এম ইউছুফের পক্ষে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি চেয়ে আবেদনের শুনানি হয়। গিয়াস উদ্দিন মামুনের আইনজীবী বলেন, এই মামলার এফআইআরে তার নাম ছিল না। দীর্ঘ দিন পর তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তিনি সরকারের কেউ ছিলেন না। কিভাবে তিনি অপরাধ করেছেন তা অভিযোগে বলা হয়নি। 

সি এম ইউছুফ আইনজীবী না থাকায় নিজের পক্ষে নিজেই শুনানি করে বলেন, তার বিরুদ্ধে এ মামলা ভিত্তিহীন। এই মামলার কারণে তিনি পেনশন সুবিধা পাচ্ছেন না। 
এ কে এম মোশাররফ হোসেনের আইনজীবী বলেন, তিনি গুরুতর অসুস্থতার কারণে আদালতে আসতে পারেননি। 
সেলিম ভূঁইয়ার আইনজীবী বলেন, তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। 

শুনানি অসমাপ্ত অবস্থায় আদালত ২১ জানুয়ারি এ মামলার শুনানির পরবর্তী দিন ঠিক করেন।
এর আগে গত ৩ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে বিশেষ আদালত-৯ এর বিচারক শেখ হাফিজুর রহমানের আদালতে এ মামলার অভিযোগ গঠনের শুনানি শুরু হয়। ওই দিন আদালতে বলেছিলেন, এত সঙ্কীর্ণ জায়গায় আদালত চলতে পারে না। আর যদি এই জায়গায় কোর্ট চলে তাহলে আমি আর আসব না। 

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালের ৯ ডিসেম্বর খালেদা জিয়াসহ অন্যদের বিরুদ্ধে তেজগাঁও থানায় এ মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) । ২০০৮ সালের ৫ মে খালেদা জিয়াসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে এ মামলায় অভিযোগপত্র দেয় দুদক। মামলায় অভিযোগ করা হয়, ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনটি গ্যাসক্ষেত্র পরিত্যক্ত দেখিয়ে কানাডীয় কোম্পানি নাইকোর হাতে তুলে দেয়ার মাধ্যমে আসামিরা রাষ্ট্রের প্রায় ১৩ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকার ক্ষতি করেছেন।

নাইকো দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াসহ মোট আসামি ১১ জন। এ মামলার অন্য আসামিরা হলেনÑ সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এ কে এম মোশাররফ হোসেন, সাবেক মুখ্য সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব খন্দকার শহীদুল ইসলাম, সাবেক সিনিয়র সহকারী সচিব সিএম ইউসুফ হোসাইন, বাপেক্সের সাবেক মহাব্যবস্থাপক মীর ময়নুল হক, সাবেক সচিব মো: শফিউর রহমান, ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন আল মামুন, ঢাকা ক্লাবের সাবেক সভাপতি সেলিম ভূঁইয়া ও নাইকোর দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট কাশেম শরীফ।


আরো সংবাদ