১৩ ডিসেম্বর ২০১৮

গ্রেনেড হামলার দায় কি নিচ্ছে বিএনপি, বিবিসির জিজ্ঞাসা 

গ্রেনেড হামলার দায় কি নিচ্ছে বিএনপি, বিবিসির জিজ্ঞাসা  - সংগৃহীত

বাংলাদেশে ১৪ বছরের বেশি সময় পরে বুধবার একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় হয়েছে। রায়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর এবং আব্দুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড, এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও হারিছ চৌধুরীসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছে, ‘রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের’ সহায়তায় ঐ হামলার মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার চেষ্টা করা হয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, সেই সময়কার ক্ষমতাসীন দল হিসেবে ২০০৪ সালে ওই হামলার নৈতিক দায় কি বিএনপি নিচ্ছে?

সে দায় নিতে যে রাজি নয় বিএনপি, তা বুধবারই জানিয়ে দিয়েছে দলটি। বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে এই মামলার রায়কে 'রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত' বলে দাবি করেছেন দলের মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

‘বিএনপি মনে করে এ রায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। ২১ শে অগাস্ট সেই নৃশংস ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তৎকালীন বিএনপি সরকারই সেই সময় প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি দেয়ার জন্য মামলা দায়ের করেছে। স্থানীয় তদন্ত সংস্থার পাশাপাশি এফবিআই এবং ইন্টারপোলকে সম্পৃক্ত করেছে।’

কিন্তু গ্রেনেড হামলার পর যে মামলাগুলো হয়েছিলো, প্রথম সাত বছরে ছয়বার তার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছিল।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে হওয়া প্রথম তদন্তের কোনো প্রতিবেদন দাখিল হয়নি। একই সঙ্গে মামলার তদন্ত প্রভাবিত করারও অভিযোগ উঠেছে বারবার।

কিন্তু এসবের দায় রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির ঘাড়ে বর্তায় না বলে মনে করেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ।

বরং তিনি বলছেন, মামলায় তারেক রহমানকে জড়ানোর কারণে মামলায় রায়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে।

‘কারণ তারেক রহমানের বিরুদ্ধে কোন সাক্ষ্যপ্রমাণ নাই, কিন্তু তারপরেও তাকে সাজা দেয়া হয়েছে। আর ২০০৯ সালের পরে কি হয়েছে সেটা দেখতে হবে। তার আগে এফবিআই এবং ইন্টারপোল তদন্ত করেছে, তাদের কোন প্রতিবেদনে তো তারেক রহমানের নাম আসেনি।’

‘আর যদি বলেন যে কোন বড় ঘটনার জন্য যে কোন দেশে সরকারকে শেষ পর্যন্ত অবশ্যই দায়িত্ব নিতে হয়, সেটা তারা নিয়েছে। নিয়ে যতটুকু করার করেছে, কিন্তু আওয়ামী লীগ তো কো-অপারেট করে নাই।’

এদিকে, রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, কোন বড় ঘটনায় দায়িত্ব নেবার সংস্কৃতি বাংলাদেশে নেই, আর সেটি একটি বড় কারণ একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনার জন্য সেসময় সরকারে থাকা বিএনপির দায়িত্ব নিতে না চাওয়া।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের শিক্ষক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক মির্জা তাসলিমা সুলতানা বলেন, ‘যেহেতু বিএনপি তখন ক্ষমতায় ছিল পুরো ঘটনার জন্য দায়িত্ব তাদের কাঁধেই বর্তায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে বাংলাদেশে দায়িত্ব নেবার সংস্কৃতি নাই এবং সেটা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

‘যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, কোন রাজনৈতিক ঘটনায় সমস্যা তৈরি হতে পারে দেখলে তারা পিছিয়ে থাকে। পিছিয়ে থাকলেও কোন ঘটনায় সহযোগিতা করা যায়, কিন্তু সেটি জনগণকে বিশ্বাস করানোর দায়িত্ব যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তার।’

তবে তিনি মনে করেন, দীর্ঘ মেয়াদে বিএনপির রাজনীতিতে এই রায় বাড়তি কোন প্রভাব ফেলবে না।

২০০৪ সালে ওই গ্রেনেড হামলায় আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন। আহত হন শেখ হাসিনা-সহ আওয়ামী লীগের কয়েক শ নেতা-কর্মী।

আরো পড়ুন : খালেদা ও তারেকের সাজার প্রতিবাদে সাবেক বিচারপতির বিক্ষোভ
নিজস্ব প্রতিবেদক ১১ অক্টোবর ২০১৮, ১৩:৪১

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বেআইনীভাবে সাজা দেয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছেন হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি ফয়সাল মাহমুদ ফয়জী। এসময় পুলিশ তাকে বাধা দেয়।

আজ বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান গেটের সামনে এ ঘটনা ঘটে। তিনি বিক্ষোভ দেখিয়ে রাস্তায় নেমে এলে পুলিশ তাকে গেটের ভিতর ঢুকিয়ে দেয়।


আজ বেলা সোয়া একটার দিকে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও খালেদা জিয়া মুক্তি আন্দোলনের’ ব্যানারে কালো পতাকাসহ মানববন্ধন করেছেন আইনজীবীরা। এতে অংশ নেয়া ফয়জী এক সময় রাস্তায় বেরিয়ে এসে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন। এ সময় পুলিশ তাকে গেটের ভিতর ফিরিয়ে দিলে তিনি আবার মানববন্ধনে অংশ নিয়ে বক্তব্য রাখেন।

মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন অ্যাডভোকেট মনির হোসেন।

সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে আইনজীবীদের মানববন্ধন
গত ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক ড. মো: আখতারুজ্জামান জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড দেন। রায় ঘোষণার পর থেকে তিনি পুরাতন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী ছিলেন। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী চিকিৎসার জন্য গত শনিবার বিকেল পৌনে চারটার দিকে বিএসএমএমইউয়ে নেয়া হয় খালেদা জিয়াকে।

এদিকে, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় গতকাল মঙ্গলবার তারেক রহমানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন ঢাকার বিশেষ জজ-১ এর আদালত। এ মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়।

তবে এ রায় প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি। এ রায়ের প্রতিবাদে সাত দিনের কর্মসূচিও ঘোষণা করে দলটি। আজ ছিল বিক্ষোভ কর্মসূচি।

আরো পড়ুন : রায় ঘোষণার পর বিএনপির প্রতিক্রিয়া
নয়া দিগন্ত অনলাইন 
একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের বিরুদ্ধে দুইভাবে এগোবে বিএনপি। বুধবার রায় ঘোষণার পর এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

মীর্জা ফখরুল বলেন, ‘এই রায় আমরা প্রত্যাখ্যান করছি এবং এর নিন্দা জানাচ্ছি। এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা। এর বিরুদ্ধে আমরা দুইভাবেই রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং আইনি পদক্ষেপ নেবো।’

তিনি আরো বলেন, ‘তাকে (তারেক রহমানকে) যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়ার মাধ্যমে পুনরায় প্রমাণিত হলো যে, এদেশে কোনো নাগরিকের আর সুবিচার পাওয়ার সুযোগ নেই।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধণের জন্য কোনো তথ্য-উপাত্ত আদালতে উপস্থাপন না করা হলেও তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া অন্যকিছু বলার নেই।’

বহুল আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে আজ।

রাজধানীর নাজিমুদ্দিন রোডে পুরনো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে স্থাপিত ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন আজ বুধবার এ রায় ঘোষণা করেন।

রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের ফাঁসি ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, বিএনপি নেতা কাজী শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন কায়কোবাদসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিকেলে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২২ জন নিহত হন। প্রাণে বেঁচে গেলেও গুরুতর আহত হন শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের কয়েক শ’ নেতাকর্মী।

বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেই এ সংক্রান্ত হত্যা ও বিস্ফোরক মামলার বিচার শুরু হয়। ৬১ জনের সাক্ষ্য নেয়ার পর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার এর অধিকতর তদন্ত করে। এরপর বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, হারিছ চৌধুরী, জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদসহ ৩০ জনকে নতুন করে আসামি করে ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। এরপর দুই অভিযোগপত্রের মোট ৫২ আসামির মধ্যে তারেক রহমানসহ ১৮ জনকে পলাতক দেখিয়ে বিচার শুরু হয়। অন্য মামলায় তিন আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় বর্তমানে আসামির সংখ্যা ৪৯।  


আরো সংবাদ