২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮
নির্বাচনী সঙ্কট নিরসন

ফের দূত পাঠাতে পারে জাতিসঙ্ঘ

জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব - ছবি : সংগৃহীত

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়েও রাজনৈতিক অস্থিরতা ক্রমান্বয়ে ধূমায়িত হচ্ছে। বিরোধী দলগুলোর সংলাপ-সমঝোতার আহবানে কর্ণপাত না করে মধ্য অক্টোবরে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের কথা ভাবছে ক্ষমতাসীন দল। নির্বাচন কমিশনও নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের পর তফসিল ঘোষণার তারিখ নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে। তবে খাতা-কলমে নির্বাচনী এই প্রক্রিয়ায় বৈতরণী পার হওয়া যে সহজ নয়, সেই শঙ্কা সরকারের ভেতরেও রয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বেশ কিছু দাবিতে বিএনপিসহ সরকারবিরোধী কয়েকটি জোট মাঠে তৎপর রয়েছে। প্রবল হচ্ছে বৃহত্তর একটি আন্দোলন গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশের নির্বাচন-পূর্ব রাজনীতিতে ফের সঙ্কট তৈরি হতে পারে এমন আশঙ্কা রয়েছে জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাবশালী বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার। আঞ্চলিক স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির কথা চিন্তা করে ক্ষমতার পালাবদলের সাথে উচ্চারিত ওই সব দেশগুলোর ভূমিকা প্রকাশ্যে দেখা না গেলেও অন্তরালে সবাই সক্রিয়। তবে জাতিসঙ্ঘ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা তৈরিতে যেভাবে উদ্যোগ নিয়েছিল, এবারো একই উদ্যোগ নিতে পারে বলে জানা গেছে। 

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের এক মাস আগে জাতিসঙ্ঘের তৎকালীন মহাসচিব বান কি মুনের প্রতিনিধি হিসেবে ঢাকা এসেছিলেন সংস্থাটির রাজনীতিবিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো। তিনি এমন একটি সময় ঢাকা এসেছিলেন, যখন বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক জোটের আহবানে দেশে হরতাল-অবরোধ চলছিল। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ওই আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল বিরোধী দলগুলো। 

তারানকো সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য ও সহিংসতামুক্ত নির্বাচনের সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে সব পকে নিয়ে সংলাপে বসেন। নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে একটি সমঝোতা প্রতিষ্ঠাই ছিল তার বাংলাদেশ সফরের উদ্দেশ্য। ঢাকা অবস্থানকালে পাঁচ দিনে তিনি বিভিন্ন পরে সাথে কমপে ২৫টি বৈঠক করেন। বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া, দুই দলের কয়েকজন শীর্ষনেতা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্রসচিব, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, ঢাকায় নিযুক্ত বিদেশী কূটনীতিক ও বিশিষ্ট নাগরিকদের সাথে। ওই তৎপরতা চালিয়ে দেশে ফেরার আগে সংবাদ সম্মেলনে তারানকো বাংলাদেশের চলমান সঙ্কট সমাধানে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন বটে কিন্তু সঙ্কটের কোনো কার্যকর সমাধান হয়নি। ৫ জানুয়ারি একতরফা ও সহিংস একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। 

পাঁচ বছর পার হতে চলেছে, কিন্তু নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে যে সঙ্কট রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে, তার কোনো সমাধান এখনো হয়নি। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি বিপরীত মেরুতেই অবস্থান করছে। আওয়ামী লীগ এবার আরো কট্টর ভূমিকায় রয়েছে বলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে। সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোনো ধরনের আলোচনায় না বসার কথা জানিয়ে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই অবস্থান আরো স্পষ্ট হয়েছে এই কথার মাধ্যমে, ‘বিএনপির সাথে আলোচনা নয়। ক্ষমতায় থাকি আর না থাকি।’ 

সরকারের এমন অনড় অবস্থানে বিএনপি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছে। বিরোধী দলগুলোকে নিয়ে বিএনপি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গঠনের চেষ্টা করছে। যেটি শিগগিরই একটি সফল সমাপ্তির দিকে এগোবে বলে দলটির শীর্ষ নেতারা আশা করছেন। এই জোটগুলোকে নিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে অভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে আছে। 

রাজনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি কূটনৈতিক অঙ্গনেও কাজ করছে বিএনপি। জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের আমন্ত্রণে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই মুহূর্তে নিউ ইয়র্কে রয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার তিনি বাংলাদেশের আগামী সংসদ নির্বাচন ঘিরে সরকারের নানা নেতিবাচক তৎপরতার বিষয়ে জাতিসঙ্ঘকে অবহিত করেছেন। জাতিসঙ্ঘ সদর দফতরে সংস্থাটির রাজনীতিবিষয়ক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মিরোস্লাভ জেনকার সাথে বৈঠকে তিনি বলেছেন, সঙ্কটময় রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যাপারে জাতিসঙ্ঘের করণীয় আছে। এ ক্ষেত্রে ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে তার (জেনকা) পদে থাকা তারানকোর বাংলাদেশ সফরের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়। বৈঠকে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারামুক্তিসহ দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ সার্বিক বিষয়ে জাতিসঙ্ঘকে জানান বিএনপি মহাসচিব। 

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে দলের সহ-আন্তর্জাতিক সম্পাদক হুমায়ুন কবির ও নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। জাতিসঙ্ঘের চার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও ছিলেন বৈঠকে।
জানা গেছে, জাতিসঙ্ঘের আগামী সাধারণ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যোগ দেবেন। সেখানে বাংলাদেশের নির্বাচনসহ বিভিন্ন পরিস্থিতি নিয়ে তাদের আলোচনা হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী যাওয়ার আগেই জাতিসঙ্ঘকে বাংলাদেশ সম্পর্কে ব্রিফ করা ছিল এই বৈঠকের অন্যতম উদ্দেশ্য, যাতে সংস্থাটি সব বিষয়ে অবগত থাকে।

ওই বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশের আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা এবং এ ঘটনার সূত্রপাত বর্ণনা করে এতে জাতিসঙ্ঘের করণীয় আছে বলে মনে করে বিএনপি। এ ব্যাপারে জাতিসঙ্ঘ বিভিন্ন পরে সাথে শিগগিরই কথা বলবে বলে বিএনপিকে জানিয়েছে। বৈঠকে নির্বাচন ঘিরে সরকারের তৎপরতা, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গায়েবি মামলা, গুম, খুনসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়। এ ক্ষেত্রে জাতিসঙ্ঘের অনেক নির্দেশ অমান্য হচ্ছে, তাও জানানো হয়।

জবাবে জাতিসঙ্ঘের কর্মকর্তারা বলেছেন, মানবাধিকার নিয়ে তাদের যে কমিটি কাজ করে, তাদের রিপোর্টেও বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি উঠে এসেছে। এ ছাড়া পত্রিকায় যেসব খবর প্রকাশ হচ্ছে, সেসব বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছেন তারা।

বিএনপি মহাসচিবের এ সফরে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথেও একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠক শেষে তিনি লন্ডনের উদ্দেশে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করবেন।
বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, প্রতিবেশী দেশ ভারত ২০১৪ সালে নির্বাচনের আগে যেভাবে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েছিল, এবার সেটি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তাদের মতে, ভারতও বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দেখতে চায়। এ ছাড়া ২০১৯ সালে ভারতেও জাতীয় নির্বাচন হবে। ওই নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের নির্বাচনে খুব বেশি নাক গলাবে না তারা। 

বিএনপির শীর্ষপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল কয়েক মাস আগে ভারত সফরও করে এসেছে। ওই সফরে বিএনপি কংগ্রেসের সভাপতি রাহুল গান্ধী, ক্ষমতাসীন বিজেপির বেশ কয়েকজন নেতা এবং সরকারের ঘনিষ্ঠ সুশীলসমাজের কয়েকজন নেতার সাথে বৈঠক করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে। বিএনপির নেতারা আশা করছেন, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথ তৈরিতে ভারতও তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে পারে। 
বিএনপি আন্দোলনে নামার আগে ক্ষমতাসীনদের সাথে সংলাপ-সমঝোতায় বসতেও আগহী। এ ধরনের উদ্যোগ কোনো পক্ষ নিলে তাতে পূর্বশর্ত ছাড়াই দলটি অংশ নেবে বলে দলটির সিনিয়র নেতারা জানিয়েছেন।


আরো সংবাদ