২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

কর্মসূচিতে সরকারের নৌকা পানিতে ভেসে যাবে : মওদুদ

কর্মসূচিতে সরকারের নৌকা পানিতে ভেসে যাবে - সংগৃহীত

খালেদা জিয়াকে ‘মুক্ত করে’ নির্বাচনে যেতে চাইলে হাতে আর ‘মাসখানেক’ সময় আছে মন্তব্য করে সেই লক্ষ্যে বিএনপির নেতাকর্মীদের রাজপথের আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন দলটির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা।

রাজধাণীতে অনশন কর্মসূচিতে বিএনপি নেতারা আবারও বলেছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া বিএনপি দেশে কোনো নির্বাচন হতে দেবে না।

দুর্নীতি মামলার রায়ে পাঁচ বছরের সাজায় কারাবন্দি খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বুধবার ঢাকাসহ সারা দেশে দুই ঘণ্টার এই প্রতীকী অনশন কর্মসূচি পালন করে তার দল বিএনপি।

কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন মিলনায়তনে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ অভিযোগ করেন, উচ্চ আদালত খালেদা জিয়াকে জামিন দেওয়ার পরও ‘সরকারের ইন্ধনে, সরকারের প্রভাবে নিম্ন আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটরা’ জামিন বিলম্বিত করেছে।

‘বিষয়টি স্পষ্ট, সরকার চায় না বেগম খালেদা জিয়া জামিনে মুক্তি পাক। আইনি প্রক্রিয়ায় তার মুক্তি আর সম্ভবপর নয় বলে আমি মনে করি।’ এখন রাজপথের আন্দোলনেই কেবল খালেদার মুক্তি সম্ভব- এমন মত প্রকাশ তার অন্যতম আইনজীবী মওদুদ বলেন, ‘আমাদের যে আন্দোলন চলছে এই আন্দোলন বেগবান হবে, এই আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে যাবে যেদিন, সেদিন এই সরকারের পতন আসবে।’

ক্ষমতাসীনদের হুঁশিয়ার করে মওদুদ বলেন, ‘এমন কর্মসূচি দেওয়া হবে যে এই সরকারের নৌকা পানিতে ভেসে যাবে।’

ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ৩০ অক্টোবর থেকে ভোটের দিন গণনা শুরুর বিষয়ে ইংগিত করে অনশনে বসা নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আর আছে মাত্র মাসখানেক সময়। এ সময়ের মধ্যে প্রস্তুতি নিতে হবে। এবার রাস্তায় নামলে আন্দোলন সফল না করা পর্যন্ত কেউ যেন বাড়ি ফিরে না যায়- এই আহ্বান আমি জানাচ্ছি।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির অরেক সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, সারা দেশে জনগণ ও বিভিন্ন দলের মধ্যে ‘ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে’ যে, আগামী নির্বাচন হতে হবে নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক। বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ওপর জোর দিচ্ছে। 

‘আমরা বলতে চাই, দেশনেত্রীকে ছাড়া, বিএনপিকে ছাড়া অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন এদেশে হতে পারে না, হতে দেওয়া হবে না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মত নির্বাচন আর এদেশে হবে না। বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করেই আমরা আগামী নির্বাচন করব।’

সকাল ১০টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন মিলনায়তনের সামনে মাদুর বিছিয়ে বসে এই অনশন চলে। ঢাকা মহানগরসহ অঙ্গসংগঠনের কয়েক হাজার নেতা-কর্মী এ কর্মসূচিতে অংশ নেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমেদ বেলা ১২টায় অনশনস্থলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের পানি পান করিয়ে অনশন ভাঙান। ঢাকা ছাড়াও সারাদেশে মহানগর ও জেলা সদরে একযোগে এই প্রতীক অনশন কর্মসূচি চলে।

জিয়া এতিমখানা দুর্নীতি মামলার রায়ে পাঁচ বছরের সাজায় খালেদা জিয়া গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে পুরনো ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রয়েছেন। তার মুক্তির দাবিতে ধারাবাহিকভাবে ঢাকাসহ সারাদেশে বিক্ষোভ সমাবেশ, মানববন্ধন, অবস্থান, প্রতীক অনশন, গণস্বাক্ষর সংগ্রহ ও স্মারকলিপি পেশের মত কর্মসূচি পালন করে আসছে বিএনপি।

খন্দকার মোশাররফ অনশন কর্মসূচিতে বলেন, ‘আজকে গণতন্ত্র আওয়ামী লীগের বাক্সে বন্দি। দেশের জনগণ, বিএনপি, ২০ দল, তার বাইরেও অনেক রাজনৈতিক দল- সকলের ঐকমত্য হয়েছে যে, এখন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে হবে, ভোটের অধিকার ফিরিয়ে আনতে হবে।’

‘তার জন্য প্রথম প্রয়োজন গণতন্ত্রের মুক্তি। বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া গণতন্ত্র মুক্ত হবে না। সরকার একটি অবৈধ ও মিথ্যা মামলায় তাকে কারাগারে নিয়েছে। আমরা অবিলম্বে তার মুক্তি দাবি করছি।’

কারাগারে খালেদা জিয়া ‘অত্যন্ত অসুস্থ’ হয়ে পড়েছেন দাবি করে তার পছন্দমত একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে দ্রুত তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করারও দাবি জানান এই বিএনপি নেতা। একাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বিএনপির দাবিগুলো এই কর্মসূচিতে আবারও তুলে ধরেন খন্দকার মোশাররফ।

তিনি বলেন, তফসিল ঘোষণার আগে সংসদ ভেঙে দিতে হবে, শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করতে হবে, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন করতে হবে, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে, নির্বাচনের সময়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে।

‘এই অনশন কর্মসূচি থেকে আমরা আহ্বান জানাতে চাই, দেশের জনগণ ও সকল দল, যারা এই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাদের সকলে জাতীয় ঐক্যে একত্রিত হয়ে আগামী দিনে আন্দোলনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিন।’


বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ‘মামলা দিয়ে নির্যাতন’ করা হচ্ছে অভিযোগ করে দলের স্থায়ী কমিটির এই নেতা বলেন, ‘আমরা সরকারকে বলতে চাই যে, আপনাদের সময় শেষ। পুলিশ বাহিনীকে বলছি, এভাবে গণগ্রেপ্তার করে নির্যাতন চালাবেন না। আপনারা প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী, আপনারা আওয়ামী লীগের কর্মকর্তা-কর্মচারী নন।’

‘আমি আহ্বান জানাব, দেশের আইন বিভাগ থেকে শুরু করে, বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে জনপ্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন- আপনারা আওয়ামী লীগের নির্দেশিত পথে আর নির্যাতন করবেন না। এসব বন্ধ করুন। প্রজতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী হিসেবে কাজ করুন, দলীয় হিসেবে কাজ করবেন না।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, ‘প্রত্যেকটি থানায় হাজার হাজার কর্মীর বিরুদ্ধে গায়েবী মামলা দেওয়া হয়েছে। ভয়ে কম্পমান এই সরকার। এত অত্যাচারের পরেও বিএনপির নেতা-কর্মীরা ঘরে বসে থাকেনি এবং ঘরে বসে থাকবে না।’

গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘আমাদের মধ্যে যদি কেউ মনে করে যে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে, আমাদের মাঝে যদি কেউ আড়ালে-আবডালে নির্বাচনে যাওয়ার চেষ্টা করে, তাদেরকে ঘরের মধ্যে জবাব দেওয়ার জন্য আপনারা সজাগ থাকবেন।  বিগত দিনে ১/১১ তে যারা যারা বেঈমানি করেছিল, তারা হয়ত অনেকেই ভালো। কিন্তু নতুন করে যদি আবার বেঈমানি করতে চায়, তাদের সমুচিত জবাব দেব রাজপথে নেমে।’

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আগের রাতেই যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাওয়ায় তিনি এই কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন না।

খন্দকার মোশাররফের সভাপতিত্বে, বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী ও সহ সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম আজাদের পরিচালনায় এ প্রতীক অনশনে বিএনপি নেতাদের মধ্যে আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, সেলিমা রহমান, মোহাম্মদ শাহজাহান, এজেডএম জাহিদ হোসেন, আহমেদ আজম খান, আমানউল্লাহ আমান, জয়নুল আবদিন ফারুক, আবুল খায়ের ভুঁইয়া, মিজানুর রহমান মিনু, আবদুস সালাম, হাবিবুর রহমান হাবিব, আতাউর রহমান ঢালী, ফজলুল হক মিলন, সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, শিরিন সুলতানা, নাজিমউদ্দিন আলম, মহানগর দক্ষিণের কাজী আবুল বাশার, যুব দলের মোরতাজুল করীম বাদরু, স্বেচ্ছাসেবক দলের মোস্তাফিজুর রহমান, শ্রমিক দলের আনোয়ার হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা দলের সাদেক আহমেদ খান,  মহিলা দলের আফরোজা আব্বাস, সুলতানা আহমেদ, ছাত্রদলের রাজীব আহসান, আকরামুল হাসান বক্তব্য দেন।

সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর মিয়া গোলাম পারোয়ার, লেবার পার্টির মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার খন্দকার লুৎফর রহমান, ন্যাপের আজহারুল ইসলাম, কল্যাণ পার্টির সাহিদুর রহমান তামান্না।

বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল রিজভী, সহ দপ্তর সম্পাদক বেলাল আহমেদসহ অফিস কর্মীরা নয়া পল্টনের দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের তৃতীয় তলায় বসে এই প্রতীক অনশনে অংশ নেন বলে দলটির নেতারা জানান। রিজভী গত ফেব্রুয়ারি থেকে একটানা কেন্দ্রীয় কার্যালয়েই অবস্থান করছেন।


আরো সংবাদ