২১ নভেম্বর ২০১৮

নির্বাচনী ট্রেনে একা আওয়ামী লীগ

নির্বাচনী ট্রেনে একা আওয়ামী লীগ - ছবি : সংগৃহীত

নির্বাচনী ঢাকঢোল বেজে চলছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগে। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ডিসেম্বরের শেষ দিকে একাদশ জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। সেই হিসাবে, মাত্র সাড়ে তিন মাস আছে নির্বাচন অনুষ্ঠানের। জাতীয় নির্বাচন একেবারে দরজায় কড়া নাড়া শুরু করেছে। নির্বাচনের মাধ্যমেই আগামী দিনে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পড়বে কোনো একটি দল কিংবা জোটের ওপর। নির্বাচনে জনগণ চাইলে টানা তৃতীয় মেয়াদে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য পুনরায় দায়িত্ব পাবে আওয়ামী লীগ। আর আওয়ামী লীগ থেকে জনগণ মুখ ফিরিয়ে নিলে বিএনপি জোট কিংবা অন্য কেউ ক্ষমতাসীন হবে। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলের নির্বাচন সন্নিকটে হলেও বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট কিংবা বর্তমান সরকারের বাইরে থাকা দলগুলোর তৃণমূল কেন্দ্রিক নির্বাচনী তৎপরতা দৃশ্যমান হয়ে উঠেনি এখনো। শুধু পোস্টার, ব্যানার আর গণমাধ্যমে সরকারবিরোধী জোটের সরব উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। এই সুযোগে নির্বাচনের মাঠ কাঁপাচ্ছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ একা। তবে আগামী নির্বাচনে কোন কোন দল অংশ নিচ্ছে- তা নিয়েও ক্ষমতাসীন জোটের মধ্যে মত-দ্বিমত থাকায় জোটের অংশ দলগুলোও পুরোপুরি নির্বাচনী মাঠে নামতে পারেনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সেই নির্বাচন ১৫৩ জন এমপি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় রেকর্ড গড়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে অনড় থাকা বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ওই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। দেশে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত দেড় শতাধিক দলের মধ্যে সরকারের ছত্রছায়ায় থাকা মাত্র ১৭টি দল সে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। এখনো নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের দাবিতে আন্দোলন করে আসছে মাঠের প্রধানবিরোধী দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট। এখনো নির্বাচনকালীন সরকারের দাবিতে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে দলটি। এরই মধ্যে, গত শনিবার রাজধানী থেকে উত্তরবঙ্গের নীলফামারী পর্যন্ত ট্রেন যাত্রার মাধ্যমে নির্বাচনী সফর শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। পথে বেশ কয়েকটি পথসভাও করেছে দলটি। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে রয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। নির্বাচনী সফরের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় রয়েছেন আওয়ামী লীগের রাজশাহী বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। ট্রেন যাত্রার শুরুতে কমলাপুর রেলস্টেশনে ওবায়দুল কাদের বলেন, সরকারের উন্নয়ন কাজ তৃণমূলে পৌঁছে দিতে এবং তৃণমূলে দলকে শক্তিশালী করতেই উত্তরাঞ্চলে আওয়ামী লীগের এই ট্রেন সফর। তিনি বলেন, আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর লঞ্চে আমরা নির্বাচনী সফর করব। এরপর বাই-রোডে আমাদের চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জ যাওয়ার কথা রয়েছে।

সরকারবিরোধী জোটের মতে, সংলাপের মাধ্যমে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে একটা রাজনৈতিক সমাধান না হলে নির্বাচনী মাঠে তাদের দৃশ্যমান উপস্থিতি সম্ভব হবে না। আর আওয়ামী লীগ এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নির্বাচনী ট্রেনে একা উঠতে চায়, কাউকে সাথে নিতে চায় না। তবে আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করেন, নির্বাচনী মাঠে সব দলেরই উপস্থিতি আছে। এক এক দলের হয়তো কৌশল ভিন্ন হতে পারে। কেউ পোস্টার দিয়ে ছেয়ে দিচ্ছে। কেউ মাঠপর্যায়ে দল গুছিয়ে নির্বাচনী প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের মতে, বিএনপিসহ অন্য দলগুলো যারা গত নির্বাচনে অংশ নেয়নি তারা কেউই বসে নেই। সময় হলে সবার অবস্থান প্রকাশ পাবে। 

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমানে দেশে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র চলছে। সরকারি ও বিরোধী দলের সহাবস্থান নেই। বিরোধী দলগুলো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ঠিকমতো চালাতে পারছে না। কারণ তারা হামলা-মামলার শিকার হচ্ছে। যার ফলে বিরোধী দলগুলোর মাঠপর্যায়ে নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করার সুযোগ সীমিত। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে একাই নির্বাচনী মাঠ দখল করে রেখেছে। 

এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলেন, দেশে নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এ রকম হচ্ছে। বিএনপি এবং অন্য যে বিরোধী দলগুলো আছে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে গেলেই হামলা মামলার শিকার হচ্ছে। এটা সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্তরায়। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে একটা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা জরুরি। সরকারি দল ও বিরোধী দলকে সমান সুযোগ দেয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। 

রাজনীতি বিশ্লেষক গোলাম মাওলা রনি নয়া দিগন্তকে বলেন, বিরোধী দল যারা আছে এটা তাদের কৌশল। তারা আপাতত নির্বাচনী মাঠ থেকে সরে আছে। এর মাধ্যমে সরকারি দলের মধ্যে তারা যে একটা দোদুল্যমানতা সৃষ্টি করতে পেরেছেÑ এটা তাদের জন্য সফলতা। বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে কি নেবে নাÑ এ নিয়ে সরকারের মধ্যেও একটা সংশয় তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচনের মাত্র দেড় মাস আগে যদি বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট মাঠে নামে তাহলে সরকারের জন্য মোকাবেলা করা কঠিন হয়ে যাবে। ক্ষমতায় থাকলে কি সমস্যা আর না থাকলে কি সমস্যা, এটা সব দলই জানে। এখন প্রত্যেক মিনিটে মিনিটে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হচ্ছে। 

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য লে. কর্নেল (অব:) মুহাম্মদ ফারুক খান নয়া দিগন্তকে বলেন, ঢাকা শহরে তারা বিরোধী দল নির্বাচন ঠিকই করছে। তাদের পোস্টার কোথায় নেই! সব জায়গাতে পোস্টারে ছেয়ে গেছে। আমার নিজ জেলা গোপালগঞ্জেও আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপির নির্বাচনী পোস্টার বেশি। তিনি বলেন, বেগম জিয়ার মুক্তির নাম করে বিএনপি আন্দোলন করছে ঠিকই, কিন্তু এটা তাদের নির্বাচনের একটা কৌশল। তারা নির্বাচনের জন্য ঠিকই প্রস্তুতি নিচ্ছে। 

এ দিকে আগামী নির্বাচনে কারা অংশ নিচ্ছে- এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন ক্ষমতাসীন জোটের অন্যতম শরিক জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার। নয়া দিগন্তকে তিনি বলেছেন, আসন নিয়ে এখনো ওইভাবে আলোচনা করছি না। নির্বাচনটা কিভাবে হবে, কারা নির্বাচনে অংশ নেবেÑ এ বিষয়টা পরিষ্কার হওয়ার পরই আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে একটা সমাধানে আসা যাবে।


আরো সংবাদ