২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

শরিকদের আসনে তৎপর আওয়ামী লীগ

শরিকদের আসনে তৎপর আওয়ামী লীগ - ছবি : সংগৃহীত

লক্ষ্মীপুর-১ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য তরিকত ফেডারেশনের সাবেক মহাসচিব লায়ন এম এ আউয়াল। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে সরকারের এ শরিক দলকে দেয়া দু’টি আসনের মধ্যে এটি একটি। এলাকায় দলমত নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করায় আওয়ামী লীগের বড় একটি অংশকে পাশে নিয়ে তিনি এবারো জোটের প্রার্থী হতে চান। তবে তার এ চাওয়ায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন রামগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও শিল্পপতি আনোয়ার খান। তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী। এম এ আউয়াল যাতে এবার আর জোটের মনোনয়ন না পান সে জন্য তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব পদ থেকে কৌশলে তাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে পথের কাঁটা দূর করতে তরিকতের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভান্ডারীর সাথে আনোয়ার খানের মোটা অঙ্কের লেনদেন হয়েছে বলে এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে। এ ছাড়া এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে কাজ করে যাচ্ছেন দলের উপজেলা সভাপতি সফিক মাহমুদ পিন্টু, সাবেক কেন্দ্রীয় সহসম্পাদক ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এম এ মমিন পাটোয়ারী, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সফিকুল ইসলাম ও উপজেলা সহসভাপতি শামসুল হক মিজানসহ অনেকে। 

লক্ষ্মীপুর-২ আসনে গত নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জাতীয় পার্টি থেকে মোহাম্মদ নোমান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি এবারো মহাজোটের প্রার্থী হতে চান। তবে এবার তাকে ছাড় দিতে নারাজ আওয়ামী লীগ। সেখানে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক এমপি আলহাজ হারুনুর রশিদ। এ ছাড়া মনোনয়ন পেতে কাজ করে যাচ্ছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নূর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন, কুয়েত প্রবাসী ব্যবসায়ী সহিদ ইসলাম পাপুল, বিএমএ নেতা ও এসেনশিয়াল ড্রাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা: এহসানুল হক জগলুল, যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মো: আলী খোকন, যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শামসুল ইসলাম পাটোয়ারীসহ অনেকে। 

নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে গত নির্বাচনে জাতীয় পার্টির লিয়াকত হোসেন খোকা মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হন। তবে তাকে এবার ছাড় দিচ্ছে না আওয়ামী লীগ। তার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সদস্য ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এ এইচ এম মাসুদ দুলাল। এ ছাড়া সাবেক এমপি কায়সার হাসনাতসহ আরো কয়েক নেতা সেখানে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চান। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যেসব আসনে জোটের শরিকদের ছাড় দেয়ার সম্ভাবনা রয়েছে প্রায় সবখানেই মাঠে রয়েছেন আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতারা। জোরেশোরে নিবার্চনী প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। এসব ক্ষমতাসীন দলের নেতা কোনোভাবেই শরিকদের ছাড় দিতে রাজি নন। এমনকি ২০১৪ সালের নির্বাচনে যেসব আসন শরিকদের দেয়া হয়েছিল সেসব আসনও এবার নিজেদের দখলে নিতে মরিয়া স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। দল থেকে মনোনয়ন দেয়া না হলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন বলে জানান দিয়েছেন অনেকে। বিষয়টি নিয়ে বেশ বিপাকে পড়েছে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। 

আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানায়, এবার আওয়ামী লীগের কাছে জোটের শরিকরা কমপক্ষে ১০০ আসন চায়। এর মধ্যে জাতীয় পার্টি ৭০টি, জাসদ ২০টি, ওয়ার্কার্স পার্টি ১০টি আসন দাবি করছে। তবে জোটের শরিকদের সব মিলিয়ে ৭০ থেকে সর্বোচ্চ ৭৫টি আসন দেয়ার কথা অনানুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে আওয়ামী লীগ। দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের একাধিকবার এমন আভাস দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের নির্বাচনে যেসব আসন শরিকদের ছাড় দেয়া হয়েছিল সেসব আসনে এবার গড়ে আওয়ামী লীগেরই ৩-৪ জন করে নেতা প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। এ নিয়ে অনেক আসনেই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন সময় অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেছে মহাজোটের এমপি এবং আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সমর্থকদের মধ্যে। জোটের বর্তমান এমপিদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রে নানা অভিযোগও জমা পড়েছে তৃণমূল আওয়ামী লীগের। এ পরিস্থিতিতে সেখানে জোটের শরিকদের ছাড় দেয়া হলে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরাও বেশ অস্বস্তিতে রয়েছেন। 

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ঢাকার মোট ২০টি আসনের মধ্যে তিনটিতে জাতীয় পার্টির প্রার্থী জয়ী হন। আর সারা দেশের মতো রাজধানীতেও তাদের সাথে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের বিরোধ চলছে। এর মধ্যে ঢাকা-৪ (শ্যামপুর-কদমতলী) আসনে সৈয়দ আবু হোসেন বাবলার বিপক্ষে মনোনয়ন চান সংরক্ষিত মহিলা এমপি অ্যাডভোকেট সানজিদা খানম এবং প্রধানমন্ত্রীর সাবেক একান্ত সহকারী সচিব ড. আওলাদ হোসেনসহ কয়েকজন। 
ঢাকা-১ (দোহার-নবাবগঞ্জ) আসনে জাতীয় পার্টির সালমা ইসলামের বিপক্ষে তৎপর রয়েছেন আওয়ামী লীগেরই একাধিক প্রভাবশালী নেতা। তাদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুল মান্নান খান, ঢাকা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের বেয়াই আবদুল বাতেনসহ অনেকে।

ঢাকা-৮ (রমনা-মতিঝিল-পল্টন) আসনে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননকে চ্যালেঞ্জে ফেলে দিয়েছেন যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণ সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি মোল্লা মো: আবু কাউছারসহ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা।
নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) আসনে বতর্মান সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির শওকত চৌধুরীর সাথে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে মাঠে রয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা নাফিউল করিম নাফা। তার নেতৃত্বে স্থানীয় আওয়ামী লীগ হাতছাড়া হওয়া আসনটি পুনরুদ্ধার করতে চায় বলে তিনি দাবি করেছেন। এ ছাড়া এখানে আরো মনোনয়ন চান সৈয়দপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোকছেদুল মোমিন, কিশোরগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেনসহ কয়েকজন।

সাতক্ষীরা-১ আসনে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সরকারের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির মুস্তফা লুৎফুল্লাহ। কিন্তু এবার শরিকদের ছাড় দিতে নারাজ আওয়ামী লীগ। সেখানে দলের মনোনয়ন পেতে কাজ করে যাচ্ছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও সাবেক এমপি শেখ মুজিবুর রহমান, কলারেয়া উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ফিরোজ আহমেদ, জেলা আওয়ামী লীগের কৃষি সম্পাদক সরদার মুজিবসহ প্রায় অর্ধ ডজন নেতা।
অন্যান্য বিভাগীয় শহর ও মহানগরীগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রাম-৫ আসনে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, সিলেট ২ ও ৫ আসনে ইয়াহ্ইয়া চৌধুরী ও সেলিম উদ্দিন, রংপুর-১ আসনে মসিউর রহমান রাঙ্গা, কুমিল্লা ২ ও ৮ আসনে মোহাম্মদ আমির হোসেন ও নুরুল ইসলাম মিলন ও বরিশাল-৬ আসনে নাসরিন জাহান রতœা, কিশোরগঞ্জ-৩ আসনে মজিবুল হক চুন্নুর আসনে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রভাবশালী নেতা দলের মনোনয়ন চান।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, এবারের নির্বাচনী সমীকরণ খুব জটিল। ৫ জানুয়ারির মতো বিএনপি জোটকে বাইরে রেখে একতরফা নির্বাচন হলে তার হিসাব একরকম হবে। তবে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে সমীকরণ বেশ জটিল হবে। সে ক্ষেত্রে জোট এবং জোটের প্রার্থী মনোনয়নও অনেক হিসাব-নিকাশ করে করা হবে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের অনেক নেতার কপাল খুলতে পারে আবার অনেকেরই কপাল পুড়তে পারে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তা স্পষ্ট হবে। 

এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, এবার জোটকে ৭০-৭৫টি আসন দেয়া হতে পারে। এ মাসের মধ্যেই বিষয়টি চূড়ান্ত হতে পারে। আর বৃহত্তর স্বার্থে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতাদের বিষয়টি মেনে নিতে হবে।
দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, আওয়ামী লীগে ত্যাগী ও যোগ্য নেতার অভাব নেই। প্রায় প্রত্যেকটি আসনেই দলের জনপ্রিয় একাধিক নেতা রয়েছেন। তবুও সমমনা বিভিন্ন দলের সাথে আওয়ামী লীগ যেহেতু নির্বাচনী জোট করেছে সেহেতু জোটের স্বার্থকে সবার প্রাধান্য দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বঞ্চিত নেতারা অবশ্যই দলের বিভিন্ন পর্যায়ে মূল্যায়িত হবেন।


আরো সংবাদ