১৫ নভেম্বর ২০১৮
নোয়াখালী-৬ আসন

আ’লীগের প্রতিপক্ষ আ’লীগ বিএনপিতে নেই কোন্দল

নির্বাচন
নোয়াখালী-৬ আসন : আ’লীগের প্রতিপক্ষ আ’লীগ বিএনপিতে নেই কোন্দল - ছবি : নয়া দিগন্ত

নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হাতিয়া। একটি পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত নোয়াখালী-৬ হাতিয়া আসন। এ আসনে আ’লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যাপক ওয়ালী উল্যা, আ’লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী, তার স্ত্রী বর্তমান এমপি আয়েশা ফেরদৌস ও উপজেলা আ’লীগের সিনিয়র সহসভাপতি মাহামুদ আলী রাতুল। বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী সাবেক এমপি প্রকৌশলী ফজলে আজিম।

এ আসনে ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির টিকিট নিয়ে মোহাম্মদ আলী জাতীয় সংসদের নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ১৯৯১ সালে আ’লীগের উপজেলা সভাপতি অধ্যাপক ওয়ালী উল্যা নৌকার টিকিট নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং মোহাম্মদ আলী জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে পরাজিত হন। ১৯৯৬ সালেও মোহাম্মদ আলী জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচন করে পরাজিত হন।

১৯৯৬ সালে আ’লীগ সরকার গঠন করার পর জেলা আ’লীগের তৎকালীন জেলা সভাপতি মাহামুদুর রহমান বেলায়েতের হাত ধরে মোহাম্মদ আলী আ’লীগে যোগদান করেন। তার পর ২০০১ সালের নির্বাচনে মোহাম্মদ আলী নৌকার টিকিট না পেয়ে স্বতন্ত্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়। ২০০৮ সালে তিনি ফের নৌকার টিকিট পান; কিন্তু ঋণখেলাপির কারণে তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যায়। স্ত্রী আয়েশা আলী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং তিনি পরাজিত হন।

২০১৪ সালে ভোটারবিহীন নির্বাচনে দলের টিকিট নিয়ে মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী আয়েশা ফেরদৌস সংসদ সদস্য হন। তার পর থেকে সারা দেশে রাজনীতিতে সরকার আর বিরোধী দল একে অন্যের প্রতিপক্ষ; কিন্তু হাতিয়ার চিত্র ভিন্ন। এ আসনে আ’লীগের প্রতিপক্ষ আ’লীগ। এ আসনে আ’লীগ কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত। এক গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যাপক ওয়ালী উল্যা। আর অপর গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলী। এই দুই গ্রুপের মধ্যে দলীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় বন্দুকযুদ্ধ ও সংঘর্ষে গত এক বছরে ডজনখানেক নেতাকর্মী নিহত ও পাঁচ শতাধিক আহত হন।

গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আ’লীগের ওয়ালী উল্যা সমর্থিতরা নৌকা প্রতীক নিয়ে ভোটে অংশ নেন। মোহাম্মদ আলী সমর্থিত নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। দু-একটি ইউনিয়ন ছাড়া অন্য ইউনিয়নগুলোতে জয়ী হতে পারেননি স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিজয়ী হয়েছেন নৌকা প্রতীক নিয়ে আ’লীগের মনোনীত প্রার্থীরা। তার পর থেকে মোহাম্মদ আলী ও অধ্যাপক ওয়ালী উল্যা সমর্থিত বিজয়ী ও পরাজিত প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। উপজেলা সদর থেকে শুরু করে গ্রামগঞ্জের তৃণমূল পর্যন্ত আ’লীগের নেতাকর্মীরা কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত।

এ দিকে দলের ছত্রছায়ায় জলদস্যু ও বনদস্যুরা একের পর এক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। এসব দস্যুকে আশ্রয়প্রশ্রয় দিচ্ছেন মর্মে অভিযোগ উঠেছে আ’লীগের সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে। কিন্তু অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন তিনি। সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের ঝনঝনানিতে পুরো হাতিয়া আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। অনেকে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাদের এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের টুঁ শব্দ করার কারো সাহস নেই। অনেক দস্যুর বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি মামলার ওয়ারেন্ট থাকলেও তারা প্রকাশ্যে চলাফেরা করছে। কিন্তু তাদের পুলিশ গ্রেফতার করছে না বলে স্থানীয় এলাকাবাসীর অভিযোগ।

গত এক বছরে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা ছাড়াও চাঁদাবাজি ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে প্রতিনিয়ত। জানা গেছে, মোহাম্মদ আলী সমর্থিত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি ও পুলিশের ওপর হামলাসহ প্রায় অর্ধশত মামলা রয়েছে। গত ২৯ আগস্ট হাতিয়ায় আলোচিত তিন হত্যা মামলায় আ’লীগের সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলী সমর্থিত আ’লীগ ও যুবলীগের ১৫৭ নেতাকর্মীকে জেলহাজতে পাঠিয়েছেন আদালত। আসামিরা আদালতে আত্মসমর্পণ করলে বিচারক তাদের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। আসামিদের মধ্যে রয়েছেন- তমরদ্দি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আ’লীগের ফররুখ আহম্মেদ ফারুক, জাহাজমারা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাছুম বিল্লাহ, সোনাদিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইয়াছিন আরাফাত, হাতিয়া পৌরসভার কমিশনার মো: শাহিন ও আলী আফরোজ খান নহেলসহ ১৫৭ জন।

বাদিপক্ষের আইনজীবী ছাইফ উদ্দিন আহম্মেদ জানান, ২০১৭ সালের মার্চ মাসে হাতিয়ায় যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অধ্যাপক আশরাফ উদ্দিন আহম্মেদকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই বছর এপ্রিল মাসে যুবলীগ কর্মী নুর আলমকে ও সেপ্টেম্বরে রিয়াজ উদ্দিনকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এসব ঘটনায় দায়ে করা মামলার পলাতক আসামিরা জুডিশিয়িাল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণ করলে বিচারক মাসফিকুল হক তাদেরকে কারাগারে প্রেরণের আদেশ দেন।

এ দিকে উপজেলা আ’লীগের সভাপতি মনোনয়নপ্রত্যাশী অধ্যাপক ওয়ালী উল্যা, অন্য দিকে উপজেলা আ’লীগের সিনিয়র সহসভাপতি মাহামুদ আলী রাতুল সম্প্রতি ব্যাপক গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। উপজেলাপর্যায়ের অনেক নেতা তাদেরর পক্ষে কাজ করছেন বলে জানা গেছে।

নানা প্রতিবন্ধকতার পরও বিএনপির নেতাকর্মীরা নির্বাচনের প্রস্তুতি ও প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রকৌশলী ফজলে আজিমের নেতৃত্বে। গত ঈদে তিনি ব্যাপক গণসংযোগ করেছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে দফায় দফায় বৈঠকসহ যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। এলাকায় তার ব্যাপক জনপ্রিয়তাও রয়েছে। একক প্রার্থী হিসেবে তিনি মনোনয়ন পাবেন এটা অনেকটা নিশ্চিত এবং বিজয়ের ব্যাপারেও তিনি আশাবাদী।

১৯৯৬ সাল থেকে তিনি পরপর দুইবার বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এ সময় এলাকার রাস্তাঘাট, সাইক্লোন শেল্টার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণসহ ব্যাপক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করায় তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আসনটি পুনরুদ্ধার হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জামায়াতও থেমে নেই, তারা ঘরোয়াভাবে নির্বাচনকে সামনে রেখে দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। জাতীয় পার্টির মনোনয়নপ্রত্যাশী অ্যাডভোকেট বায়জিদ ও আসিফ নবী উল্লাহ। তারা মনোনয়নের চেষ্টার পাশাপাশি এলাকায় গণসংযোগসহ ভোটারদের সাথে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।


আরো সংবাদ