২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

জোট গঠন তৎপরতায় সরকারে অস্বস্তি

জোট গঠন তৎপরতায় সরকারে অস্বস্তি - ছবি : সংগৃহীত

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের জোটগঠন তৎপরতায় বেশ অশ্বস্তিতে রয়েছে সরকার। রাজনীতির নয়া এ মেরুকরণ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকেরা। একই সাথে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে নানা কৌশলে এসব জোটকে মোকাবেলা করার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন তারা। আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

আওয়ামী লীগ ও সরকারের সূত্রগুলো জানায়, জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে রাজনীতিতে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের বিকল্প একটি কার্যকর জোট আশা করেছিল সরকার। সে লক্ষ্য পূরণে বিএনপি জোটের বাইরে থাকা সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে টার্গেট করে তাদের নানা তৎপরতাও চলছিল বেশ কিছু দিন ধরে। 

কিন্তু গত মঙ্গলবার রাতে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের বাসভবনে বৈঠক করেন বিকল্পধারা বাংলাদেশ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি, কৃষক শ্রমিক জনতা পার্টি ও নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে গঠিত যুক্তফ্রন্ট নেতারা। বৈঠকে নানা ইস্যুতে ঐকমত্যে পৌঁছান তারা। বিশেষ করে আগামী নির্বাচন অবাধ নিরপেক্ষ করার দাবি এবং সরকারবিরোধী আন্দোলন জোরদারে একমত হন উপস্থিত নেতারা। ওই বৈঠক এবং সেখানে গৃহীত সিদ্ধান্তের পর খানিকটা নড়েচড়ে বসেছেন সরকারের কর্তাব্যক্তিরা। বিষয়টি নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন সরকার। গতকাল গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের সাথে আলাদা বৈঠক করেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ সভাপতি কাদের সিদ্দিকী।

আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানায়, রাজনীতির নয়া এ মরুকরণকে মুখে মুখে সাধুবাদ জানালেও মোটেও খুশি নন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সরকারের কর্তাব্যক্তিরা। সে জন্য যুক্তফ্রন্টসহ নতুন এ জোটকে বিরাজনীতিকরণের অংশ বলে আখ্যায়িত করছেন তারা। একইসাথে জোটের উদ্যোক্তাদের নানাভাবে কড়া ভাষায় সতর্ক করা হচ্ছে। 

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, রাজপথে সরকারবিরোধী আন্দোলনের নামে যদি নতুন করে কোনো অস্থিরতার চেষ্টা করা হয় তবে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। 
জোট গঠনকে যদিও সাধুবাদ জানিয়েছেন দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, তবে সেই সাথে তিনি এও বলেছেন, সরকারবিরোধী আন্দোলনের নামে যদি বিএনপির মতো জ্বালাও-পোড়াও বা পেট্রলবোমার মতো কোনো নাশকতার চেষ্টা করা হয় তাহলে জনগণ তাদেরকেও প্রতিরোধ করবে। 

দলের অন্যতম সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী জোট গঠনের তীব্র সমালোচনা করে এটিকে বিরাজনীতিকরণের নতুন ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বলেছেন, রাজনৈতিকভাবে পরিত্যক্ত এসব মানুষ জীবনভর ষড়যন্ত্র করে গেছে। এদের রুখে দিতে হবে। 
আওয়ামী লীগ নেতাদের মতে, ছোট দলগুলোর জোট গঠনের তৎপরতা নতুন কিছু নয়। ২০১২ সাল থেকেই তাদের এমন তৎপরতা চলছিল।

তবে কখনো তাতে গতি আসে; কখনো থমকে যায়। নির্বাচনের এই বছর অবশ্য জোট গঠন প্রক্রিয়াটি ভীষণ গতি পেয়েছে। রমজান মাসকে ঘিরে ইফতার অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই তৎপরতা সবার নজরে আসে। এ ছাড়া ছোট দলের নেতারা তাদের বাসায়ও প্রায়ই বসছেন এবং বিভিন্ন জোট গঠন হচ্ছে। তবে সর্বশেষ ড. কামাল হোসেনের বাসায় যে বৈঠক এবং জোট নিয়ে আলোচনা হয়েছে সে জোটের সবাই সরকারবিরোধী রাজনীতিক হিসেবেই পরিচিত। বিভিন্ন সময় বক্তৃতা বিবৃতির মাধ্যমে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন এসব রাজনীতিক। বিশেষ করে সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, জেএসডি সভাপতি আ স ম আব্দুর রব, নাগরিক ঐক্যের আহবায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না এবং গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা: জাফরুল্লাহ সরকারের কঠোর সমালোচক। জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশী-বিদেশী নানা চাপের মুখে থাকায় সরকার নতুন এ মেরুকরণকে কোনোভাবেই সহজভাবে নিতে চায় না। সে জন্য এ জোটের নেতাদের কঠোরভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে। সরকার তাদের গতিবিধি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। 

আওয়ামী লীগ ও সরকারের নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, জাতীয় নির্বাচনের আর মাত্র তিন মাস বাকি। এ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ এবং অংশগ্রহণমূলক করতে সরকার এমনিতেই দেশ-বিদেশী নানামুখী চাপে রয়েছে। সরকারবিরোধী জোট নেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এখনো কারাবন্দী। বিষয়টি নিয়ে বিএনপি কঠোর আন্দোলনের দিকে যাচ্ছে বলে সরকারের কাছে তথ্য রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে আরেকটি জোট সমান্তরালভাবে সরকারবিরাধী আন্দোলন শুরু করলে তা সরকারের জন্য মোটেও সুখকর হবে না। নতুন এ জোট আগামী নির্বাচন ইস্যুতে বিএনপির সাথেও দরকষাকষিতে ব্যস্ত রয়েছে। তাদের মধ্যে ঐকমত্য হয়ে গেলে সেটা সরকারের জন্য আরো জটিল হয়ে দাঁড়াতে পারে। সে জন্য এসব জোটকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে মোকাবেলা করতে চায় শাসকপক্ষ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের তিনজন নেতা আলাপকালে বলেন, সরকারবিরোধীরা বসে নেই। তারা যেমন নানা ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে, তেমনি সরকারও বিষয়টি নিয়ে বেশ সতর্ক। তাদের মোকাবেলায় নানা কৌশল নিয়ে এগোবে সরকার। শুরুতেই অবশ্য তাদের বাগে আনার চেষ্টা করা হবে এবং নানা ধরনের অফার দেয়া হবে তাদের। তাতে সাড়া না পেলে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। আর সেই সাথে এসব নেতার অতীত ইতিহাস ও চরিত্র জাতির কাছে উন্মোচন করা হবে। 

আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর দুইজন নেতা বলেন, নতুন এ জোটের বাইরেও সম্প্রতি সিপিবি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী), গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লিগ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি ও বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনÑ এই আটটি দল মিলে নতুন একটি বাম রাজনৈতিক জোট গঠন করা হয়।

এ জোটেরও বেশির ভাগ দল ও নেতাই সরকারের কঠোর সমালোচক। আর একের পর এক সরকারবিরোধী জোটের আত্মপ্রকাশ মোটেও স্বাভাবিক বিষয় নয়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট, গণফোরাম ও যুক্তফ্রন্টজোট, বাম দলগুলোর আলাদা জোটের সম্ভাব্য সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং পাশাপাশি সুশীলসমাজ ও বিদেশী নানা চাপ নিয়ে সরকার এ মুহূর্তে স্বস্তিতে নেই। সে জন্য এসব জোটের বাইরের দলগুলোকে নিয়ে আওয়ামী লীগও তার নেতৃত্বাধীন জোটের কলেবর বাড়াতে চায়। তার অংশ হিসেবে বাম দলগুলো নিয়ে জোট গঠনের দিনই ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোটের বাইরে থাকা গণতান্ত্রিক আন্দোলন, ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স, সম্মিলিত ইসলামিক জোট, কৃষক শ্রমিক পার্টি, একামত আন্দোলন, জাগো দল, ইসলামিক ফ্রন্ট ও গণতান্ত্রিক জোটসহ ৯টি দলের নেতাদের সাথে বৈঠক করেন আওয়ামী লীগ নেতারা। এ তৎপরতা অব্যাহত থাকবে বলে সূত্র জানিয়েছে। 

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ নয়া দিগন্তকে বলেন, সব সময়ই নির্বাচনকে ঘিরে নানা ধরনের রাজনৈতিক মেরুকরণ ও বলয় তৈরি হয়। এবারো কোনো কোনো জোট গঠন সেই বলয়েরই অংশ হয়ে থাকতে পারে। আমরা চাই প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল ও জোটের আদর্শ এবং কর্মকাণ্ড হোক দেশ ও জনগণের স্বার্থকে ঘিরেই। তবে জনবিচ্ছিন্ন ও জনধিকৃত কিছু নেতা মিলে যুক্তফ্রন্টসহ নতুন যে জোট করেছেন তা দেশের স্বার্থে হয়েছে বলে মনে হয় না। তারা সব সময় দেশবিরোধী চক্রান্তে লিপ্ত। আমরা তাদের গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। এসব রাজনৈতিক দল ও জোটের আড়ালে দেশবিরোধী কোনো ষড়যন্ত্র হলে জনগণ বরদাশত করবে না, অতীতে তা বারবার প্রমাণিত হয়েছে।

 


আরো সংবাদ