২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

সংলাপে রাজি নয় আওয়ামী লীগ

-

বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটসহ দেশী-বিদেশী নানা পক্ষের চাপ সত্ত্বেও সংলাপে রাজি নয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের সংলাপ বা সমঝোতার চিন্তা বাদ রেখে আপাতত আপন গতিতেই চলতে চায় সরকার। তবে মাঝপথে বিএনপি জোটের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলে পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে সরকার বিরোধীদের সাথে সংলাপে বসার চিন্তা করতে পারে। তবে চেষ্টা করা হবে সংলাপ-সমঝোতা যথাসম্ভব এড়ানোর। সরকারি দলের এই মনোভাব রাজনৈতিক অস্থিরতাকে চাঙা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 
নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে সরকারি দলের নীতিনির্ধারকদের মনোভাব থেকে জানা গেছে, বিএনপিকে চাপে রেখেই আওয়ামী লীগ তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে চায়। দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বর্তমানে কারাবন্দী। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও একাধিক মামলায় সাজা নিয়ে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। দলটির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরাও নানান মামলায় কারাগারে। শিগগিরই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় রায় হতে পারে বলে সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়েছে। এ মামলায় বিএনপির শীর্ষপর্যায়ের অনেক নেতাই শাস্তি পেতে পারেন বলে সরকারের সর্বোচ্চপর্যায় থেকে মন্তব্য করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে তাদের মতে, বড় ধরনের সঙ্কটে রয়েছে বিএনপি। এ অবস্থায় তারা সরকারবিরোধী বড় ধরনের কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে অক্ষম। এ ছাড়া দেশে বড় ধরনের কোনো সঙ্কটও নেই যেটাকে ইস্যু করা যেতে পারে। সে জন্য বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সংলাপ-সমঝোতার আহবানে আপাতত সাড়া দিচ্ছে না ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ জোট।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বিএনপির সাথে সংলাপ আহবান প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনে আসতে বাধ্য হবে। আর না এলে দলটি ধ্বংস হয়ে যাবে। তাদের আর অস্তিত্বই থাকবে না। সে জন্য আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বিএনপির সাথে কোনো ধরনের সংলাপ হবে না সরকারের। 
সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আগামী নির্বাচন নিয়ে বিএনপির সাথে সংলাপ হবে না। আর দেশে এমন কোনো পরিস্থিতিও তৈরি হয়নি যে তাদের সাথে সংলাপ করতে হবে। এবার নির্বাচন বর্জন করে ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন ঠেকানোর নামে কোনো নাশকতা করা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ ব্যাপারে সতর্ক রয়েছে। সজাগ রয়েছে আওয়ামী লীগও। 
আওয়ামী লীগ ও সরকারের কেন্দ্রীয় সূত্র জানায়, সরকার নানামুখী চাপে ফেলে আরো ভঙ্গুর অবস্থায় নিতে চায় বিএনপিকে। এ জন্য বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং তার ছেলে তারেক রহমানসহ বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোকে কাজে লাগানো হচ্ছে। দুই কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা মামলায় বেগম খালেদা জিয়া পাঁচ বছরের সাজা ভোগ করছেন। মানিলন্ডারিং মামলায় তারেক রহমানেরও সাজা হয়েছে। আগামী মাসের যেকোনো সময় ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় হতে পারে। ওই মামলায় তারেক রহমানসহ বিএনপির শীর্ষনেতারা আটকে যাবেন বলে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকেরা আগাম বলে দিচ্ছেন। ফলে এই মামলার রায়ের রেশ আগামী নির্বাচন পর্যন্ত থাকবে। আর এতে অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচনের আন্দোলন তাদের পারিবারিক আন্দোলনে পরিণত হবে। সরকারও জনগণকে বলতে পারবে ‘বিএনপি জনসম্পৃক্ত’ বিষয়ে আন্দোলন করছে না। এতে বিএনপির প্রগতিশীল অংশ ও তাদের শরিকেরাও আন্দোলন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। ফলে আগামী নির্বাচন বা সংলাপ নিয়ে তারা তেমন দরকষাকষিরও সুযোগ পাবে না। আর বিএনপিকে এমন চাপের মধ্যে রেখেই আগামী নির্বাচন সেরে ফেলতে চান সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। এ অবস্থায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে বিএনপি চাইলে নির্বাচনে আসতে পারে। এতে সরকার বাধা দেবে না। আর না এলে আবারো একতরফা নির্বাচনের দিকে যাবে সরকার। তাই সংলাপ নিয়ে আপাতত সরকারের কোনো মাথাব্যথা নেই। 
এ দিকে সরকারের একাধিক সূত্র জানায়, সংলাপ বা সমঝোতা নিয়ে সরকার অনড় অবস্থানে থাকলেও ভিন্ন কোনো পরিস্থিতি দেখা দিলে তা যেকোনো সময় পাল্টে যেতে পারে। সেটি নির্ভর করছে বিএনপি জোটের সিদ্ধান্ত, কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক চাপ এবং সর্বোপরি দেশের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি যদি বড় ধরনের কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে তবেই তাদের সাথে সংলাপের বিষয় ভাববেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, বিএনপির সাথে সংলাপের ব্যাপারে নেতিবাচক অবস্থানে থাকলেও নানামুখী চাপের কারণে মাঝে মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ কেন্দ্রীয় অনেক নেতা। ওবায়দুল কাদের একাধিকবার শর্তহীন খোলামেলা সংলাপের কথা বলেছেন। এ ছাড়া আনুষ্ঠানিক কোনো সংলাপ না হলেও বিএনপি মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাথে টেলিফোনে অনানুষ্ঠানিক সংলাপের কথাও বলেছেন তিনি। নির্বাচনের আগে বড় ধরনের কোনো চাপ এলে শেষ পর্যন্ত বিএনপির সাথে আনুষ্ঠানিক সংলাপে বসতে আপত্তি নেই আওয়ামী লীগের। 
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দশম সংসদ নির্বাচনের আগে দেশী-বিদেশী নানামুখী চাপে পড়ে আওয়ামী লীগ সংলাপের নামে পরিস্থিতি সামলে নেয়ার চেষ্টা করে। এটি ছিল মূলত তাদের রাজনৈতিক কৌশল। এখন বিএনপি সংলাপের তাগিদ দিলেও তা প্রত্যাখ্যান অথবা নতুন নতুন শর্ত জুড়ে দিচ্ছে আওয়ামী লীগ। 
সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সাথে আলোচনা করেছে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতিনিধিদল। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সাথে একাধিকবার বৈঠক করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন ও রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ নিয়ে বিশদ আলাপ হয়। 
জানা গেছে, কূটনৈতিকভাবে বিভিন্ন দেশ ও জোট মতাসীন দলকে চাপ দিচ্ছে। অনুরোধ করা হচ্ছে, যেন নির্বাচনের আগে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সাথে রাজনৈতিক সংলাপের সূচনা করা হয়। নির্বাচন যেন অংশগ্রহণমূলক হয় সেই কথা বলছে ইইউ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
তার জবাবে কূটনীতিকদের কাছে বিএনপির সাথে আলোচনায় যেতে পাঁচটি শর্ত দেন আওয়ামী লীগ ও সরকারের প্রতিনিধিরা। এর মধ্যে রয়েছে, বিএনপির গঠনতন্ত্র থেকে বাদ দেয়া ৭ ধারা পুনর্বহাল, যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গত্যাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি এবং ১৫ আগস্ট জন্মদিন বাদ দিয়ে শোক দিবস পালন, বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোর অধীনেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং যেকোনো অবস্থায় নির্বাচনে যাওয়ার অঙ্গীকার।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এই প্রতিবেদককে বলেন, আওয়ামী লীগ সব সময় সংলাপে বিশ্বাসী। দশম সংসদ নির্বাচনের আগে অনেকবার তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপিকে সংলাপের আহ্বান জানানো হয়েছিল। আমাদের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী নিজে ফোনও করেছিলেন। তখন তারা সংলাপের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছিল। নির্বাচন হয়ে গেছে। সারা দেশে ধ্বংসলীলা চালিয়েও তারা তা ঠেকাতে পারেনি। এখন পরিস্থিতি স্থিতিশীল। সব স্বাভাবিক গতিতেই চলছে। দেশে আইনের শাসন বিদ্যমান। নির্বাচন যথাসময়ে সাংবিধানিকভাবেই হবে। তাই কোনো দলের সাথে সংলাপের কোনো দরকার আছে বলে আওয়ামী লীগ মনে করে না। কেউ নির্বাচনে না এলে আমাদের কিছুই করার নেই। 
দুই দলের মধ্যে সংলাপ আয়োজনে কূটনীতিকদের দৌড়ঝাঁপের বিষয়ে তিনি বলেন, বিদেশী রাষ্ট্রদূতেরা আমাদের অতিথি। যেকোনো সময় তারা আমাদের সাথে কথা বলতে পারেন। তবে আমাদের সিদ্ধান্তগুলো আমরা নিজেরাই নিতে চাই। সেটাই জনগণ পছন্দ করবে। এ দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তাদের মাথা ঘামানো কেউ পছন্দ করে না।


আরো সংবাদ

সকল