১৫ নভেম্বর ২০১৮

ঢাবিতে রবীন্দ্রনাথের নামে চেয়ার, ভারতে কেন বিতর্ক?

ঢাবিতে রবীন্দ্রনাথে নামে চেয়ার, ভারতে কেন বিতর্ক? - সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উর্দু ভাষার জন্য রবীন্দ্রনাথের নামাঙ্কিত একটি চেয়ার বা বিশেষ অধ্যাপকের পদ চালুর ঘোষণা করেও তীব্র সমালোচনার মুখে ভারত সরকার সেটির নাম পাল্টানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

উর্দু ভাষার চেয়ার কেন রবীন্দ্রনাথের নাম হবে এবং তাও আবার বাংলাদেশের মতো দেশে, ভারতে অনেকেই ইতিমধ্যে সে প্রশ্ন তুলেছেন।

ভারত সরকারের যে সংস্থাটি এই চেয়ার স্পনসর করছে, সেই আইসিসিআরের প্রধান অবশ্য বিবিসিকে জানিয়েছেন, শুরুতে ‘অন্য কোনও নাম পাওয়া যায়নি বলেই' রবীন্দ্রনাথের কথা বলা হয়েছিল - কিন্তু এখন তারা ওই চেয়ারের জন্য বিকল্প নামের কথা ভাবছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও জানাচ্ছেন তারা ওই পদটি তৈরির অনুরোধ করে থাকলেও নামকরণ নিয়ে তাদের কোনও প্রস্তাব ছিল না।

মাসচারেক আগে ভারতের বর্তমান পররাষ্ট্র সচিব বিজয় কেশব গোখলে যখন তার প্রথম ঢাকা সফরে যান, সে সময়ই ভারত সরকারের সংস্থা আইসিসিআর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল একটি মউ বা সমঝোতাপত্র।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তখনই বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছিল, ওই সমঝোতা অনুসারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উর্দু ভাষার জন্য চালু হবে একটি ‘আইসিসিআর রবীন্দ্র চেয়ার’।

কিন্তু যে রবীন্দ্রনাথের সাথে উর্দুর দূরতম সম্পর্কও নেই, ভারত সরকার কেন তার নামে উর্দু চেয়ার চালু করবে, কিছুদিন বাদেই এই প্রশ্ন তোলেন হিন্দু সংহতি নামে ভারতে একটি হিন্দু গোষ্ঠীর নেতা তপন ঘোষ।

দিল্লির একটি সর্বভারতীয় দৈনিকেও কলাম লিখে এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানান প্রাবন্ধিক ও গবেষক প্রিয়দর্শী দত্ত।

মি দত্ত বিবিসিকে বলছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ তো উর্দু নিয়ে কোনওদিন কিছু লেখেননি। তা ছাড়া সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে তো রবীন্দ্রনাথের ওপর উর্দু শাসকদের একরকম নিষেধাজ্ঞাই ছিল, বিশেষ করে আইয়ুব খানের আমলে। তা সত্ত্বেও সে দেশের মানুষ কিন্তু রাওয়ালপিন্ডির রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই ১৯৬১-তে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ পালন করেছিলেন।’


‘এই পটভূমিতে আমার খুব আশ্চর্য লাগছে দেখে যে ভারত কেন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে একটি উর্দু চেয়ার স্পনসর করছে? একজন ভারতীয় ও বাঙালি হিসেবে আমার প্রশ্ন এটাই যে আমরা খামোখা কেন সে দেশে পাকিস্তানের কাজ করতে যাব?’ বলছিলেন তিনি।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনস বা আইসিসিআর নানা দেশেই ভারতের সাংস্কৃতিক কূটনীতির প্রসারের কাজটি করে থাকে - ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্র চেয়ারও স্পনসর করছে তারাই।

আইসিসিআরের প্রেসিডেন্ট ও ভারতে ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সহ-সভাপতি বিনয় সহস্রবুদ্ধে অবশ্য বিবিসির কাছে এখন দাবি করছেন, উর্দু চেয়ার রবীন্দ্রনাথের নামে রাখাটা তাদের স্থায়ী পরিকল্পনা নয়।

ড: সহস্রবুদ্ধে বলছেন, ‘হিন্দি ভাষার জন্য আমাদের একটি রবীন্দ্র চেয়ার ঢাকাতে আগে থেকেই চালু আছে। এখন উর্দু ভাষার জন্য আর একটি চেয়ার আমরা চালু করতে যাচ্ছি। কিন্তু মুশকিল হল, সেই চেয়ারের জন্য কোনও উপযুক্ত নাম চট করে তখন পাওয়া যায়নি - সে কারণে ওটাকেও তখন আমরা রবীন্দ্র চেয়ার বলেই উল্লেখ করেছিলাম।’


‘পরে আমরা দেখব ওটা কার নামে রাখা যেতে পারে। কিন্তু এটা নিশ্চিত যে ঢাকায় আমাদের দুটো চেয়ারের মধ্যে রবীন্দ্র চেয়ার শুধু হিন্দির জন্যই থাকবে।’

তবে বিবিসি এটা নিশ্চিতভাবেই জানতে পেরেছে যে রবীন্দ্রনাথের নামের সাথে উর্দুকে জড়ালে বাংলাদেশেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে, সেটা ভেবেই ভারত সরকার এখন তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করছে ও নাম পাল্টাতে চলেছে।

মি সহস্রবুদ্ধে বিবিসিকে এ কথাও জানিয়েছেন, এই চেয়ার চালু করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তাদের কাছে প্রস্তাব এসেছিল - তারা তাতে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন মাত্র।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মহম্মদ আখতারুজ্জামান আবার বিবিসিকে বলছিলেন তারা এই চেয়ার চালু করার আবেদন জানালেও তা রবীন্দ্রনাথের নামে করার কথা আদৌ বলেননি।

তিনি জানাচ্ছেন, ‘যেহেতু পাকিস্তানের সাথে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের এখন কোনও অ্যাকাডেমিক কর্মকান্ড নেই, তাই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অত্যন্ত প্রাচীন বিভাগ, উর্দু বিভাগের অনুরোধ ছিল যে ভারত থেকে উর্দুভাষী কোনও অধ্যাপক তথা বিশেষজ্ঞকে আমরা নিয়ে আসতে পারি কি না। সেই অনুরোধের সূত্রেই আমরা আইসিসিআরের সহায়তা চেয়েছিলাম।’

‘আমাদের সেই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতেই তারা এই উর্দু চেয়ারটি চালু করতে রাজি হয়েছেন। কিন্তু এই চেয়ারের নামকরণ কী হবে, তা নিয়ে আমরা কিছুই বলিনি - আমাদের কাছে এটি শুধুই উর্দু চেয়ার অধ্যাপক। আর যতদূর জানি এর নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে গেছে, যিনি নির্বাচিত হবেন সামনের সেসন থেকেই তিনি আমাদের এখানে যোগ দেবেন’, বলছিলেন মি আখতারুজ্জামান।

জোর করে উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে যে বাংলাদেশের একটি গৌরবময় ভাষা আন্দোলনের ঐতিহ্য আছে, সেখানে রবীন্দ্রনাথের নামে উর্দু চেয়ার চালু করার আগে ভারতের যে আর একটু সতর্ক হলেই ভাল হত, একান্ত আলোচনায় দিল্লিতে সরকারি কর্মকর্তারাও সে কথা মানছেন।

আর ওই উর্দু চেয়ারের নামকরণের জন্য যাদের কথা এখন ভাবা হচ্ছে তার মধ্যে শুরুতেই আছে স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মৌলানা আবুল কালাম আজাদের নাম - যিনি আবার আইসিসিআরের প্রতিষ্ঠাতাও।


আরো সংবাদ