২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮

শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের খেলায় মেতেছে সরকার : রিজভী

ফাইল ছবি -

নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, শিশু-কিশোরদের জেগে ওঠাতে ভয় পেয়েছে সরকার। কিন্তু এই আন্দোলন তো বন্ধ করা যাবে না। জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মিডিয়া, উন্নয়ন সহযোগী দেশ শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রলীগের এই সশস্ত্র হামলাকে সহিংস হামলা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ছাত্রলীগ আন্তর্জাতিকভাবে টেরোরিস্ট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এখন প্রধানমন্ত্রী ও ওবায়দুল কাদেররা সেই ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের বাঁচাতেই হাসপাতালে ভর্তি দেখিয়ে তামাশা করছেন। তাদের বাঁচানোর পাঁয়তারা করছেন। কিন্তু এরা রেহাই পাবে না। তাদের এই সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের ভিডিও ও ছবি পরিচয়সহ যেমন দেশী-বিদেশী গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তেমনি তাদের কাছে সংরক্ষিত আছে।

নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আজ বৃহস্পতিবার সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব বলেন। তিনি অবিলম্বে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা-মামলা ও নিপীড়ন বন্ধের দাবি জানান।

রিজভী বলেন, ছাত্রলীগের সহিংস অপকর্ম ঢাকতে এবং সরকারের প্রতারণা আড়াল করতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর দমন-পীড়ন অত্যুগ্র মাত্রায় উপনীত হয়েছে। দলীয় পান্ডাদের দিয়ে শিশু-কিশোরদের রক্ত নিঙড়ে নেয়ার পরেও ক্ষ্যান্ত হয়নি সরকার। এখন চলছে র‌্যাব-পুলিশ দিয়ে বর্বর ক্র্যাক-ডাউন। রাজধানীর ১৮ থানায় ৩৫টি মামলা দেয়া হয়েছে, যে মামলায় অজ্ঞাতনামা হাজার হাজার শিক্ষার্থীদের জড়িত করা হবে এবং ইতিমধ্যে ৪৫ জনকে আটকের কথা পুলিশ স্বীকার করেছে এবং ২২ জন রিমান্ডে আছে।

তিনি বলেন, গতকাল শিক্ষামন্ত্রীর সাথে এক বৈঠকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনকারী আটক সকল শিক্ষার্থীদের মুক্তি দাবি করেছে। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী তা নাকচ করে দিয়েছেন। ক্ষমতাপিপাসা কত তীব্র হলে শিক্ষামন্ত্রী মাসুম শিশু-কিশোরদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেন। এতই প্রমাণিত হয় মন্ত্রীদের একমাত্র আরাধ্য হচ্ছে ক্ষমতা। আর এই অবৈধ ক্ষমতার জন্য এরা ন্যায়-নীতি, মানবিক মূল্যবোধ, মনুষ্যত্ব এবং শিশু-কিশোরদের দাবিকেও পদদলিত করছে। ক্ষমতামায়ায় শিক্ষামন্ত্রী শিশু-কিশোরদের প্রতি মমত্বকেও অগ্রাহ্য করলেন।

‘দেশে নাকি নানা অশুভ খেলা চলছে’ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের এমন বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির এই নেতা বলেন, আমি তাকে মনে করিয়ে দিতে চাই, দেশে অশুভ সরকার থাকলে জনগণ অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে যে খেলায় অবতীর্ণ হয় তা প্রকাশ্য ও ন্যায় সঙ্গত। অশুভ সরকার ক্ষমতায় থাকলে তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান সমালোচনা, প্রতিবাদ, প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশ হচ্ছে জনগণের পক্ষের শক্তির শুভ খেলা। এখানে কোনো অদৃশ্য খেলা নেই। কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের আন্দোলন ন্যায্য ও বিবেক জাগনিয়া, তারা গোপন কিছু করেনি, তাদের আন্দোলন প্রকাশ্য ও জনসমর্থিত। কিন্তু তাদের আন্দোলন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও কাদের সাহেবরা প্রথম কয়েকদিন করুণামাখা কথা বলছেন।

তিনি বলেন, সরকারে সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রায় সবাই বলেছেন কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের দাবি ন্যায়সঙ্গত। তাহলে এখন তাদের ওপর এই সহিংসতা কেনো? আসলে আন্দোলনের প্রথম দিকে পড়ুয়াদের আন্দোলন নিয়ে সরকারের সহানুভূতি ছিল ছলনামাত্র। মূলতঃ অন্তরালে ছাত্রলীগ-যুবলীগ দিয়ে আন্দোলন দমানোর জনা প্রস্তুতি চলছিল। এর প্রমাণ দুইদিন পরেই দেখা গেল। অশুভ সরকারের স্বমূর্তিতে আত্মপ্রকাশ হওয়া দেখা গেল যখন হেলমেট পরিহিত আওয়ামী সশস্ত্র ক্যাডাররা ঝাঁপিয়ে পড়ে কচি শিশু-কিশোরদের ওপর। শিশু-কিশোর শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের রক্ত দেখে আনন্দিত হলো সরকার। সোনার ছেলেদের কীর্তি স্বর্ণাক্ষরে লেখার হয়তো এখন প্রস্তুতি নিবে ক্ষমতাসীনরা। সেজন্যই আমরা দেখলাম ছাত্রলীগের আক্রমণকারীদের দেখতে গেলেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু আক্রান্ত শিশু-কিশোর ও সাংবাদিকদেরকেও দেখতে যাননি তিনি।

রিজভী বলেন, নির্যাতিত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রি ড. শহিদুল আলমকে উচ্চ আদালত চিকিৎসার নির্দেশ দিয়েছেন, কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠান বিএসএমএমইউ সরকারের হুকুমে তাকে ভর্তি নেয়নি। এরা কতটা নিষ্ঠুর যে, একজন নির্যাতনে অসুস্থ ব্যক্তির চিকিৎসার জন্য উচ্চ আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করেছেন, যেন শহিদুল আলম হাসপাতালে সুচিকিৎসা না পান। এই ঘটনায় আবারো কি প্রমাণ করার দরকার আছে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার এই পিজি হাসপাতালে সুচিকিৎসা পাবেন? ওই হাসপাতালে সরকারি নির্দেশের বাইরে কোনো চিকিৎসা হয় না। ভিন্ন মতালম্বীরা সেখানে কোনো সুচিকিৎসার সুযোগ নেই।

তিনি আরো বলেন, নিরপরাধ শিক্ষার্থীদের আটক করার পর কোমরে দড়ি বেঁধে রিমান্ডে নিয়ে পৈশাচিক নির্যাতন করা হচ্ছে। গতকাল দেশ জুড়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হানাদারি অভিযানে নিন্দার ঝড় উঠেছে। এই অভিযান সরাসরি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর এক নির্মম আগ্রাসন। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী স্কুল-কলেজের পড়ূয়াদের অভিভাবকরা অজানা আতঙ্কে উৎকন্ঠিত হয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। সরকারের ক্রোধের আগুনে পড়া পড়ূয়া সন্তানদের ওপর কি বিভীষিকা নেমে আসবে তা নিয়ে শিহরিত হয়ে উঠেছে অভিভাবকরা। গতকাল বসুন্ধরাসহ ঢাকা মহানগরীতে হাজার হাজার সরকারি বাহিনীর সদস্যরা চিরুনি অভিযান চালিয়েছে। অরাজনৈতিক কিশোর-কিশোরী ছাত্র-ছাত্রীদের এই ন্যায্য আন্দোলনকে দমানোর জন্যই পুলিশ রাতভর সমগ্র বসুন্ধরা এলাকা আতঙ্কের জনপদে পরিণত করেছে।

রিজভী বলেন, রাষ্ট্র, গণতন্ত্র, সামাজিক অগ্রগতি ও সভ্যতার শত্রু বর্তমান একদলীয় আওয়ামী সরকার। এরা মানসিক বৈকল্যগ্রস্থ, ক্ষমতায় থাকার জন্য শিশু-কিশোরদের রক্ত ঝরাতেও দ্বিধা করেনি। শিশু-কিশোরদের জেগে ওঠাতে ভয় পেয়েছে সরকার। শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন প্রচলিত আন্দোলন নয়, এটি ভিন্ন ধারার প্রতিবাদের এক অনন্য স্বতন্ত্র রূপ। সরকার এখন প্রতিশোধের খেলায় মেতে উঠেছে। কিন্তু এই জাগরণ তো বন্ধ করা যাবে না। শিশুদের জাগরণের ঢেউ লেগেছে শহর থেকে গ্রামে আনাচে কানাচে। এই জাগরণ দুঃশাসনের বিরুদ্ধে। যতোই যড়যন্ত্র ও তৎপরতার কথা বলুক না কেনো আওয়ামী নেতারা, দুঃশাসনের বিদায়ের বাঁশি বাজতে শুরু করেছে। অবিলম্বে শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের হয়রানি বন্ধ করুন।

এছাড়া তিনি জানান, গতকাল ফেনী সদর উপজেলার শর্শদী ইউনিয়ন যুবদল নেতা মো: রিপনকে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা আক্রমণ করে হাত-পায়ের রগ কেটে দেয় এবং পেটে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। আমি এই বর্বরোচিত ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং তার রূহের মাগফিরাত কামনা করে শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি জানাচ্ছি গভীর সমবেদনা। আমি অবিলম্বে তার হত্যাকারীদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানাচ্ছি।


আরো সংবাদ