২১ নভেম্বর ২০১৮

খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য বিবেকবর্জিত : রিজভী

-

দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের ওপর আদালত প্রাঙ্গণে হামলার ঘটনাকে সরকারপ্রধানের ক্রুদ্ধ প্রতিশোধের বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করেছে বিএনপি। এছাড়া সিটি নির্বাচনে বিভিন্ন অনিয়মের কথা তুলে ধরে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, সরকারি ভোট সন্ত্রাসের বৈধতা দেয়ার সীলমোহর হয়ে নির্বাচন কমিশন একের পর এক যে পর্বতপ্রমাণ অন্যায়গুলোকে জায়েজ করছে, নিত্যনতুন মডেল তৈরী করার জন্য একদিন তাদের চড়া মাশুল দিতে হবে।

আজ বুধবার সকালে নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলন হয়।

খালেদা জিয়ার চিকিত্সা প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় দলের সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন- ‘খালেদা জিয়ার অসুস্থতা বাহানা। মামলার তারিখ পড়লেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন’। আসলে শেখ হাসিনার এই বক্তব্য অমানবিক ও চরম প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ।

তিনি বলেন, গতকালও কারা কর্তৃপক্ষ আদালতে রিপোর্ট করেছে বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ, তাই তাকে আদালতে হাজির করা যায়নি। সরকারি-বেসরকারি এবং বেগম জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসকরা বলছেন তিনি অসুস্থ। তাহলে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতাকে নিয়ে শেখ হাসিনা সেটাকে নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে পারেন?

রিজভী বলেন, শেখ হাসিনা যখন কারাগারে ছিলেন তখন তিনি বেসরকারি হাসপাতাল স্কয়ারে নিজের পছন্দের চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নিয়েছেন। সুতরাং বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতাকে নিয়ে শেখ হাসিনার বক্তব্য বিবেকবর্জিত ও বিনা চিকিৎসায় তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের জীবনকে সংকটাপন্ন করে দিতে চান। যেহেতু বর্তমানে বেগম খালেদা জিয়ার মামলাগুলো চলমান। সুতরাং এই মামলাগুলোকে প্রভাবিত করতেই বেগম জিয়াকে নিয়ে শেখ হাসিনা বিভিন্ন ফোরামে বক্তব্য দিচ্ছেন। আমি দলের পক্ষ থেকে আবারো দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা ও নিঃশর্ত মুক্তির জোর দাবি জানাচ্ছি।

রিজভী বলেন, আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বহুদিন ধরেই সরকারের টার্গেট। মিথ্যা মামলা, দীর্ঘদিন কারাগারে আটক, রিমান্ডে নির্যাতন তিনি সহ্য করেছেন। কিন্তু গত রোববার তাকে শারীরিকভাবে আক্রমণ সামগ্রিক সরকারি সন্ত্রাসের প্যারাডাইম শিফট। এই রক্তাক্ত ঘটনায় প্রতিবাদী কলাম লেখক, বুদ্ধিজীবীদের শুধু মামলা ও কারাভোগই নয়, তাদের জীবনকেও সংকটাপন্ন করার বার্তা দেয়া হলো। কুষ্টিয়ায় আদালত প্রাঙ্গনে তাকে আক্রমণ করে রক্তাক্ত করার পৈশাচিক ঘটনা পূর্ব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। যেন শিকারকে বহুদিন ধরে অনুসরণ করা হচ্ছিল চূড়ান্ত আঘাত হানার, ক্ষমতাসীনরা যেটির মোক্ষম সুযোগ পেলো কুষ্টিয়ার আদালত প্রাঙ্গণে। মাহমুদুর রহমানের ওপর এই রক্তাক্ত আঘাত সরকারপ্রধানের ক্রুদ্ধ প্রতিশোধের বহিঃপ্রকাশ। কুষ্টিয়া পুলিশের প্রযোজনায় ছাত্রলীগ-যুবলীগ মাহমুদুর রহমানের ওপর রক্তাক্ত হিংস্র আক্রমণের মহড়া দিলো।

তিনি বলেন, একজন মাহমুদুর রহমানকে কেনো এভাবে প্রতিশোধের বিষাক্ত তীর নিক্ষেপ করছে ক্ষমতাসীনরা? কারণ তার লেখনিতে নির্দয় জালিমরা কেঁপে ওঠে। অবিচার-জুলুমের শৃঙ্খল ভাঙতে তার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা অবৈধ শাসকগোষ্ঠী উদ্বিগ্ন করে তোলে। অবৈধ ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে সমালোচনার অভিযোগে মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে স্থানীয় ছাত্রলীগ সভাপতি। দেশব্যাপী শিশুদের ঘুম পাড়ানিয়া আতঙ্কের নাম ছাত্রলীগ। এরা এখন ভয়ঙ্কর আগ্রাসী নব্য বর্গীবাহিনী। তারা নেকড়ের মতো ধেয়ে এসে কোর্ট প্রাঙ্গণে সশস্ত্র অবস্থায় অবস্থান নেয়। তারা অবরুদ্ধ করে মাহমুদুর রহমান ও তার সফর সঙ্গীদের। এর কয়েক ঘন্টা পর সরকারি লোকরা তাকে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে বের করে গাড়িতে তোলার সময় সেই নব্য বর্গীরা ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে রক্তাক্ত করে।

রিজভী বলেন, এই সন্ত্রাসী আক্রমণের নির্দেশ সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দেয়া হয়েছে সেটির প্রমাণ- মাহমুদুর রহমান অবরুদ্ধ থাকার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে যোগাযোগ করা হলেও তিনি দেখছি বলে এড়িয়ে যান। কুষ্টিয়া জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সকল বিচারক বৈঠক করে তার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেন। তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেন- মাহমুদুর রহমানকে ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে। কিন্তু বিচারকদের নির্দেশ পালিত হয়নি। বিকেল সাড়ে ৪টার পর আদালতে নিয়োজিত পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাহমুদুর রহমান সাহেবকে নব্য বর্গীদের হাতে তুলে দেয়। বেলা ১২টার মধ্যে জামিন হওয়ার পর থেকে তিনি অবরুদ্ধ, তখন থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সারা দুনিয়ায় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় শুরু হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ এগিয়ে আসেনি।

মাহমুদুর রহমানকে নিরাপত্তা দিতে ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশ স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রকাশ্যে অমান্য করে। সুতরাং এটি সম্পূর্ণভাবে পরিষ্কার- মাহমুদুর রহমানের ওপর নৃশংস আঘাত সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত।

লোভ, লালসা, ডাকাতি, রাহাজানী, দখল যাদের চেতনা তাদের মধ্যে কখনোই মনুষ্যত্ব জেগে উঠবে না। এজন্য মুক্ত চিন্তার মানুষরা সরকারি সশস্ত্র আক্রমণের লক্ষ্য। আমি বিএনপির পক্ষ থেকে আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের ওপর সন্ত্রাসী হামলা ও তাকে রক্তাক্ত করার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে দুস্কৃতিকারীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।

সিটি নির্বাচনে সরকারী দলের অনিয়মের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন দলের এমপি ও মন্ত্রী পদমর্যাদার নেতারা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন তিন সিটি নির্বাচনে। সড়ক-মহাসড়ক দখল করে নির্বাচনী সভা-সমাবেশ করছেন তারা। বড় পিকআপ ভ্যানে বিশাল কালার মনিটর লাগিয়ে নৌকা প্রতীকের প্রচারণা চালাচ্ছেন। নির্বাচন কমিশনে এসব অভিযোগ দেয়ার পরও তারা সরকারের মুখ চেয়েই কাজ করছে। বর্তমানে ইলেকশন-গেট কেলেঙ্কারীর মূল হোতা আজ্ঞাবাহী নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনগুলোকে অন্যায়ভাবে সরকারের অনুকূলে নিয়ে যাওয়ার জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি বারবার উপেক্ষা করছে কমিশন। এই নির্বাচন কমিশনের কাছে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আশা করা অরন্য রোদন, গল্পকথা মাত্র। গণতন্ত্র মানে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সম্মতির ভিত্তিতে শাসন। আর এই গণসম্মতির প্রতিফলন ঘটে সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। যে নির্বাচন স্বাধীন ক্ষমতাবলে নিরপেক্ষ দক্ষতার সাথে পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু বর্তমান কমিশন সাহসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারছে না। সরকারি ভোট সন্ত্রাসের বৈধতা দেয়ার সীলমোহর হয়ে নির্বাচন কমিশন একের পর এক যে পর্বতপ্রমাণ অন্যায়গুলোকে জায়েজ করছে। নিত্যনতুন মডেল তৈরী করার জন্য একদিন তাদের চড়া মাশুল দিতে হবে।

রিজভী বলেন, সারাদেশে বন্দুকযুদ্ধের নামে চলছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড, এরই অংশ হিসেবে সোনারগাঁওয়ে ছাত্রদল নেতা আলমগীর হোসেন বাদশা র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। আমি এই নৃশংস ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। নিহতের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং নিহতের স্বজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।

বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর আইনজীবী সমর্থকগণ কর্পোরেশনের আওতাধীন বিভিন্ন এলাকায় মিছিল ও শোভাযাত্রা করছে। এই মিছিলে পাবলিক প্রসিকিউটর, অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর এবং স্পেশাল পিপিগণ অংশগ্রহণ করেছেন, যা নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘন। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করার পরও তারা কোন উদ্যোগ গ্রহণ না করায় আমি দলের পক্ষ থেকে নিন্দা জানাচ্ছি, অবিলম্বে নির্বাচনী সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জোর আহবান জানাচ্ছি।

অনুরূপভাবে রাজশাহী ও সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও চলছে ব্যাপক অনিয়ম ও নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের হিড়িক। উক্ত দু’টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সরকারী কর্মকর্তারাও নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে নৌকা মার্কার পক্ষে প্রকাশ্যে প্রচারণা চালাচ্ছে।

গত পরশু দিন সিলেটে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের অসংখ্য নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দু’টি মিথ্যা মামলা দায়ের করে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। নৌকা মার্কার প্রার্থীর পক্ষে সহজে ভোট কারচুপি করার জন্যই এই মামলা দায়ের।

আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত ধানের শীষ প্রতীক সমর্থকরা হেনস্তার শিকার হচ্ছে। আটককৃত মনোনীত পোলিং এজেন্টসহ বিএনপি নেতাকর্মীদের রাজশাহী ও রাজশাহী মহানগরীর বাহিরের বিভিন্ন থানার মামলায় চালান করে রাজশাহী, নাটোর ও চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে।

এছাড়া নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ছয়ানী ইউনিয়ন পরিষদ উপ-নির্বাচন উপলক্ষে সেখানে আওয়ামী সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের তাণ্ডব চলছে। বিএনপি নেতাকর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে হামলা, বোমাবাজী, এজেন্টদেরকে হুমকি এবং পোস্টর, ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে। আমি এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে ছয়ানী ইউনিয়ন পরিষদ উপ-নির্বাচন ভয়ভীতিমুক্ত পরিবেশে অনুষ্ঠিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি করছি।

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ঢাকা মহানগর পূর্ব এর সভাপতি খন্দকার এনামুল হককে বারবার রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হচ্ছে। আমি তাকে বারবার রিমান্ডে নেয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি এবং অবিলম্বে রিমান্ড বাতিলসহ তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত বানোয়াট ও অসত্য মামলা প্রত্যাহার করে নিঃশর্ত মুক্তির জোর দাবি জানাচ্ছি।


আরো সংবাদ