১৫ নভেম্বর ২০১৮

'খালেদা জিয়ার আপিল শুনানি এইট-জি গতিতে'

'খালেদা জিয়ার আপিল শুনানি এইট-জি গতিতে' - ছবি : সংগৃহীত

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালাস চেয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আপিল ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে নিষ্পত্তির সুপ্রিম কোর্টের আদেশ পুনঃবিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে করা আবেদনের ওপর শুনানি শেষ হয়েছে। আগামী ১২ জুলাই বৃহস্পতিবার আদেশের দিন ধার্য করেছেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে চার বিচারপতির আপিল বিভাগের বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

অন্য দিকে হাইকোর্টে খালেদা জিয়ার খালাস চেয়ে আপিলের শুনানি পিছিয়েছেন। বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ আগামী ১২ জুলাই সকাল সাড়ে ১০টায় শুনানি শুরু করার আদেশ দিয়েছেন। আদালত বলেছেন, কোনো পক্ষ থাকুক আর নাই থাকুক ওই দিন শুনানি শুরু করা হবে।
এছাড়া খালেদা জিয়ার জামিনের মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে হাইকোর্টে ১২ জুলাই বৃহষ্পতিবার আদেশের জন্য রেখেছেন।
আপিল বিভাগে খালেদা জিয়ার পক্ষে রিভিউ আবেদনের শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, এ জে মোহাম্মদ আলী ও জয়নুল আবেদীন। শুনানির সময় খালেদা জিয়ার পক্ষে আইনজীবী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- আবদুর রেজাক খান, মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, মাহবুব উদ্দিন খোকন, কায়সার কামাল, মো: ফারুক হোসেন, আনিছুর রহমান খান, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, আইয়ুব আলী আশ্রাফী প্রমুখ।
রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষে ছিলেন আইনজীবী খুরশীদ আলম খান।

শুনানিতে ব্যরিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, এটা একটা চ্যারিটির মামলা। রাষ্ট্রের হাজার কোটি টাকা আত্মসাত করার মতো কোনো মামলা নয়। এখানে বেগম খালেদা জিয়ার মামলা বলে ৫ বছরের সাজা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা, বিডিআর মামলা, নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডার মামলাও আপনারা এ ধরণের আদেশ দেননি। তা হলে কেন এই বৈষম্য? তিনি বলেন, ২৫ জুন আমরা এ মামলার পেপার বুক পেয়েছি। পেপার বুকের কথা না থাকলে আপনারা এ মামলার শুনানির তারিখ ঠিক করে দিতেন না।

সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি জয়নুল আবেদীন শুনানিতে বলেন, এটা দেশের সর্বোচ্চ আদালত। মানুষ এখানে বিচারের জন্য আসে। আপিল বিভাগ গত ১৬ মে আদেশ দেন ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে খালেদা জিয়ার আপিল নিষ্পত্তি করতে। ওই আদেশে আপনারা ১২ জুন স্বাক্ষর করেন। আদেশের কপি পাওয়ার পর আমরা রিভিউ আবেদন দায়ের করেছি। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার ওপর একটি খড়গ আছে, এর কারণে ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে তার আপিল নিষ্পত্তি করার আদেশ। এমনভাবে হাত-পা বেঁধে দিয়েছেন, এরপর আর কোথাও যাওয়া যাবে না। এই অবস্থায় এখান থেকে প্রপার নির্দেশনা প্রয়োজন। হাইকোর্ট বলছে আমাদের হাত বাঁধা। কিন্তু আপনাদের হাত বাঁধা নয়। তিনি বলেন, ২০১৮ সালের কোনো আপিল শুনানির জন্য এসেছে কি? কয়েক লাখ মামলা শুনানির অপেক্ষায় আছে। আপনাদের কাছে আসলেও বলেন, পরে আসেন। বহু ডেথরেফারেন্স শুনানির অপেক্ষায় আছে। মৃত্যুদ- প্রাপ্ত আসামিরা কন্ডেমসেলে কাতরাচ্ছে। হাইকোর্ট খালেদা জিয়াকে চার মাসের জামিন দেন। আপিল বিভাগে শুনানি করতে দুই মাস চলে গেছে। এখনো তিমি জামিন পাননি। তিনি আরো বলেন, নানা রকম কথা আসছে, বিচার বিভাগকে রক্ষা করা আমাদের সভার দায়িত্ব।

শুনানিতে এ জে মোহাম্মাদ আলী সংবিধান, সংশ্লিষ্ট আইন ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা দেখিয়ে ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে খালেদা জিয়ার আপিল নিষ্পত্তির আদেশ পুনঃবিবেচনা করা নিবেদন করেন। তিনি বলেন, সংবিধান ও আইন অনুযায়ী হাইকোর্টকে সময় বেঁধে দেয়া ন্যায়বিচার পরিপন্থী।
এরপর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, তারা কতবার রিভিশনে এসেছে। ক্রিমিনাল মামলা কেউ ফেলে রাখতে পারে না। যে আমি শুনানি করব না, ফেলে রাখব। আপিল ফেলে রাখব শুনানি করব না। এটা আদালত প্রক্রিয়া অ্যাবিউজ করা। তিনি রিভিউ আবেদন খারিজ করার জন্য আবেদন করেন।
খুরশীদ আলম খান বলেন, এই মামলায় রিভিউ গ্রহণ করা হলে অন্য সব মামলায়ও রিভিউ হবে। তাই রিভিউ গ্রহণ না করার আবেদন জানাচ্ছি।
শুনানি শেষে আদালত আগামী বৃহস্পতিবার আদেশের দিন ধার্য করেন।

গত ১৬ মে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের বেঞ্চ খালেদা জিয়ার জামিন বাতিল চেয়ে দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন খারিজ করে দেন। একই সঙ্গে ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে হাইকোর্টে খালেদা জিয়ার আপিল নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন।

আপিল বিভাগের আদেশের কপি পাওয়ার পর গত ২৫ জুন আপিল বিভাগ খালেদা জিয়ার খালাস চেয়ে করা আপিল ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করার যে আদেশ দিয়েছিল, তা পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করা হয়। ওই আবেদনের ওপর সোমবার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

এইট-জি গতিতে শুনতে হবে : শুনানির একপর্যায়ে আদালত বলেন, গত সপ্তাহে যদি শুনানি শুরু করতে পারতাম তাহলে আমরা ফাইভ-জি গতিতে শুনানি করতে পারতাম। কিন্তু তা না হওয়ায় এখন হয়েতো এইট-জি গতিতে শুনতে হবে।
শরফুদ্দিন আহমেদের আইনজীবীর বক্তব্যের বিরোধিতা করে এজে মোহাম্মদ আলী বলেন, পুরো মামলা একসঙ্গে শুনানি করাই যথাযথ হবে।
অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা বলেন, একজন শুনানি করতে চাইলে অন্যজনতো বাধা দিতে পারে না। এটা করার অধিকারতো কারো নেই। তাই শুনানি শুরু করা হোক।

এরপর খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন বাড়ানোর জন্য আবেদন জানান এজে মোহাম্মদ আলী। তিনি বলেন, হাইকোর্ট জামিন দেওয়ার পর তা স্থগিত করে দিলেন আপিল বিভাগ। এরপর জামিন বহাল রাখলেন। কিন্তু আদেশে স্বাক্ষর করতে সময় নিলেন এক মাস। ফলে জামিন নিয়েও লাভ হলো না। জামিনের বিষয়টি ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। জামিন আদেশ হাতে রয়েছে। সেটা দেখছিও। কিন্তু সেটা আবার নেই। আপিল বিভাগের কারণেই এটা শেষ হয়ে গেল। এটা মরিচিকির মতো। এই দেখছি, আবার নেই। তাই জামিনের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন জানাচ্ছি। জবাবে আদালত বলেন, এবিষয়ে আগামী ১২ জুলাই আদেশ দেয়া হবে।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় গত ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ খালেদা জিয়াকে ৫ বছর কারাদণ্ড প্রদান করে। এ রায়ের বিরুদ্ধে গত ২০ ফেব্রুয়ারি আপিল আবেদন (১৬৭৬/২০১৮) দাখিল করেন খালেদা জিয়া। এ আপিল গত ২২ ফেব্রুয়ারি গ্রহণ করেন হাইকোর্ট। নিম্ন আদালতের দেয়া জরিমানার রায় স্থগিত করেন। পরে গত ১২ মার্চ খালেদা জিয়াকে চার মাসের জামিন দেন হাইকোর্ট।


খালেদা জিয়ার আপিলের শুনানি বৃহস্পতিবার : জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালাস চেয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ তিনজনের আপিল ও দুদকের রিভিশন আবেদনের শুনানি পিছিয়ে ১২ জুলাই বৃহস্পতিবার ধার্য করেছেন হাইকোর্ট। সোমবার বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো: মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ আগামী ১২ জুলাই সকাল সাড়ে ১০টায় শুনানি শুরু করার আদেশ দিয়েছেন। আদালত বলেছেন, কোনো পক্ষ থাকুক আর নাই থাকুক ওইদিন শুনানি শুরু করা হবে।
এছাড়া জামিন বাড়ানোর বিষয়ে হাইকোর্টে ১২ জুলাই বৃহষ্পতিবার আদেশ দেয়া হবে।

নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়া, কাজী সালিমুল হক কামাল ও শরফুদ্দিন আহমেদের করা আপিল এবং খালেদা জিয়ার সাজা বাড়তে দুদকের করা আবেদনের ওপর গতকাল শুনানির জন্য দিন ধার্য ছিল। একারণে গতকাল বেলা আড়াইটায় খালেদা জিয়ার আইনজীবী এজে মোহাম্মদ আলী আদালতে সময়ের আবেদন করেন। তিনি বলেন, আপিল বিভাগে রিভিউ আবেদনের ওপর আদেশ হবে ১২ জুলাই। এ পর্যন্ত শুনানি করা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, আমরা আপিল শুনানির বিপক্ষে নই। আপিলের পূর্ণাঙ্গ শুনানি শেষে যা হবার তাই হবে। তিনি বলেণ, ৩১ জুলাই পর্যন্ত বেধে দেওয়া সময় যদি ঠিক থাকে তাহলে এক গতিতে শুনানি করতে হবে। আর যদি এই বাধা না থাকে তাহলে আরেক গতিতে শুনানি করতে হবে। তাই আপিল বিভাগের আদেশ পর্যন্ত সময় দেয়া হোক।

এই আবেদনের বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপক্ষে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা এবং দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, আপিল বিভাগে রিভিউ আবেদন করা হলেও কোনো স্থগিতাদেশ নেই। আপিলের শুনানি শুরু করতে তাদেরও আপত্তি নেই। তারা বলেন, এই মামলায় পেপারবুক অনেক বড়। শুনানি করতে অনেক সময় লাগবে। তাই এখনই শুনানি শুরু করা হোক।

এসময় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত শরফুদ্দিন আহমেদের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আহসান উল্লাহ বলেন, খালেদা জিয়ার আপিল ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ রয়েছে। এই আদেশ কি অন্য আপিলকারীর ক্ষেতে প্রযোজ্য কীনা তা স্পষ্ট হওয়া দরকার। কারণ, ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তি করতে হলে আমাদের হাতে সময় থাকছে না। একারণে দ্রুত প্রস্তুতি নিয়ে শুনানি করতে হবে। আর তা যদি না হয় তবে আমাদের হাতে সময় থাকছে। জবাবে আদালত বলেন, যেহেতু সব আপিলগুলোই একসঙ্গে শুনানি করতে বলা হয়েছে তাই সবার ক্ষেত্রেই একই আদেশ বলে মনে করি। এই কথা শোনার পর এ আইনজীবী বলেন, তাহলোতো আমাদের হাতে সময় কম। আমরা সময় পাচ্ছি না। তাই আমরা শুনানি শুরু করতে চাই।


আরো সংবাদ