১৫ নভেম্বর ২০১৮

খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা ও মুক্তির দাবিতে বিএনপির অনশন কর্মসূচি চলছে

বিএনপি
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা ও মুক্তির দাবিতে বিএনপির অনশন কর্মসূচি চলছে - ছবি: নয়া দিগন্ত

কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা ও মুক্তির দাবিতে রাজধানীর মহানগর নাট্যমঞ্চে বিএনপির প্রতীক অনশন কর্মসূচি চলছে।

আজ সোমবার সকাল ৯ টায় থেকে এই প্রতীকী অনশন কর্মসূচি শুরু হয়েছে। কর্মসূচী চলবে বিকাল ৪টা পর্যন্ত।

কর্মসূচি উপলক্ষে সোমবার সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা মহানগর নাট্যমঞ্চে আসতে থাকেন। কয়েক হাজার নেতাকর্মী মহানগর নাট্যমঞ্চে উপস্থিত হয়েছেন।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফারেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছর কারাদণ্ডের রায় দেন বিশেষ আদালত। একই সঙ্গে খালেদা জিয়ার ছেলে ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ অপর পাঁচ আসামিকে ১০ বছর করে দণ্ড দেওয়া হয়।

রায়ের পর পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের পুরোনো কারাগারকে বিশেষ কারাগার ঘোষণা দিয়ে খালেদা জিয়াকে সেখানে রাখা হয়েছে।

খালেদা জিয়া কারাগারে অসুস্থ পড়েন। একবার মাইল্ডস্ট্রোকেও আক্রান্ত হয়েছিলেন। বিএনপির নেতা-কর্মীরা তাদের নেত্রীর স্বাস্থ্য নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন।

 

আরো পড়ুন: খালেদা জিয়ার চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে চায় বিএনপি

১৩  জুন, ২০১৮

নিজস্ব প্রতিবেদক

দলের চেয়ারপারসন কারাবন্দী বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার সব ব্যয়ভার বহন করতে চায় বিএনপি। এ লক্ষ্যে অবিলম্বে তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করার দাবি জানিয়েছে দলটি। বিএনপি জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে দলের পক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আমরা দেশনেত্রীর উপযুক্ত চিকিৎসা চাই। প্রয়োজনে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার সমুদয় ব্যয় আমাদের দল বহন করবে। কাজেই কালবিলম্ব না করে তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হোক।

তিনি বলেন, দেশনেত্রীর চিকিৎসার বিষয়টি মানবিক। কিন্তু বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিনা ভোটের সরকার এটিকে রাজনৈতিক বিষয়ে পরিণত করেছে। ক্ষমতাসীন সরকার তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রীকে অকালে বিনা চিকিৎসায় জীবনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই সংবাদ সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান ডা: এ জেড এম জাহিদ হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, কেন্দ্রীয় নেতা আবদুস সালাম আজাদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

লিখিত বক্তব্যে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অন্যায়ভাবে এবং তার দেয়া জবানবন্দী বিকৃত করে একটি আদালত পাঁচ বছরের জেল দিয়ে সরকারের ইচ্ছা পূরণ করেছে। বর্তমানে তাকে একটি পরিত্যক্ত নির্জন কারাগারের একমাত্র বন্দী হিসেবে রাখা হয়েছে। ৭৩ বছর বয়সী এই সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে যে পরিবেশে রাখা হয়েছে তা যেকোনো সুস্থ মানুষকে অসুস্থ করে ফেলার মতো।

দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ দিন ধরে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। তার দুই হাঁটু এবং দুই চোখেই অপারেশন করতে হয়েছে। ফলে তাকে সব সময়ই যোগ্য চিকিৎসকের নিয়মিত পর্যবেক্ষণে থাকতে হয়। অথচ নির্জন এই কারাগারে তাকে দেখার জন্য জুনিয়র ডাক্তার ও ডিপ্লোমা নার্স নিয়োগ করে সরকার দাবি করছে যে, বেগম খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনবারের নির্বাচিত সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যের যে অবস্থা তাতে সর্বক্ষণ তাকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেয়ার ব্যবস্থা রাখা একান্তই জরুরি বলে মতামত দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও সার্জনেরা।

তিনি বলেন, আমাদের দলের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে দুইবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে এসব বিষয় উল্লেখ করে তাকে অবিলম্বে ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা এবং এমআরআইসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর দাবি করা হলেও এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে কিছুই করা হয়নি।

ইতিমধ্যে দেশনেত্রীর অসুস্থতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আর্থ্রাইটিসের ব্যথা বৃদ্ধির ফলে তিনি চলৎশক্তিহীন হয়ে পড়ছেন এবং পাশাপাশি তার অপারেশন করা চোখ লাল হয়ে আছে। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত তার উপযুক্ত চিকিৎসা না হলে তার শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি হতে পারে। আমরা এটিও সরকারকে জানিয়েছি; কিন্তু তার সুচিকিৎসার কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি। এমতাবস্থায় গত ৫ জুন তিনি হঠাৎ করে অচেতন হয়ে পড়েন। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি জেল কর্তৃপক্ষ তার পরিবারের কোনো সদস্যকেও জানায়নি এবং কেন তিনি অচেতন হয়ে পড়লেন তা পরীক্ষার জন্য কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

ড. মোশাররফ হোসেন বলেন, গত ৮ জুন তার পরিবারের সদস্যরা নিয়মিত সাক্ষাতে গিয়ে এই বিষয়টি জানতে পারেন। পাঁচ দফা আবেদনের পর গত ৯ জুন কারা কর্তৃপক্ষের অনুমতিক্রমে চারজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও ঢাকা সিভিল সার্জনের উপস্থিতিতে তাকে দেখতে গিয়ে এ ঘটনা জানাজানি হয়। ৫ জুন বেলা ১টার দিকে দেশনেত্রীর ৫-৭ মিনিট আনকনশাস থাকা এবং সে সময়ের কোনো কিছু মনে করতে না পারার বিষয়টিকে চিকিৎসকেরা মারাত্মক বলে মনে করেন। তাদের মতে এটি ছিল ট্রানজিয়েন্ট ইসকেমিক অ্যাটাক-টিআইএ।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী সাংবাদিকদের জানিয়েছেন যে, ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক হচ্ছে টিআইএ যদি কারো হয় তাহলে সামনে তার একটা বড় ধরনের স্ট্রোক হওয়ার আশঙ্কা খুব বেশি’। এই চারজন চিকিৎসক তাদের পর্যবেক্ষণ ও মতামত লিখিতভাবে কারা কর্তৃপক্ষকে দিয়েছেন। তারা বিশেষ কিছু পরীক্ষা এবং যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেয়ার জন্য দেশনেত্রীকে অবিলম্বে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তির সুপারিশ করেছেন।

বিএনপির এই নীতিনির্ধারক সরকারের আইনমন্ত্রী, সেতুমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করে বলেন, দেশনেত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বিএসএমএমইউতে নেয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু তাকে এর আগে সেখানে নেয়া হলে সেখানকার ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ এবং চিকিৎসাসেবার বিষয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। আইজি প্রিজন গণমাধ্যমে বলেছেন যে, কারাবিধি অনুযায়ী প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। এমন কোনো সিদ্ধান্ত না থাকায় দেশনেত্রীকে ওই হাসপাতালেই নিতে হবে। তার এই বক্তব্য থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতামত এবং আমাদের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও ইউনাইটেড হাসপাতালে দেশনেত্রীকে ভর্তির ব্যাপারে কারা কর্তৃপক্ষের অনীহার কারণ বোঝা গেল।

ড. মোশাররফ হোসেন বলেন, তথাকথিত ১/১১-এর সরকারের সময়েও একবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেয়া হয়েছিল। আর তিনবারের নির্বাচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি এবং সাবেক সেনাবাহিনী প্রধানের স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যাপারে সরকারি অনুমোদন ও অর্থসংস্থানের বিষয়ে এত দিনেও সিদ্ধান্ত না হওয়া রহস্যজনক ও নিন্দনীয়।

তিনি সরকারের সমালোচনা করে বলেন, গত ৫ জুন সংঘটিত এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সম্পর্কে সরকারের মন্ত্রিবর্গ, অ্যাটর্নি জেনারেল ও আইজি প্রিজন প্রায় এক সপ্তাহ পরে ১১ জুন মুখ খুললেন কেন? কেন এত দিন ঘটনাটি চেপে যাওয়ার চেষ্টা করা হলো? কেন এরই মধ্যে তার হঠাৎ এত বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণ অনুসন্ধানের জন্য ব্যবস্থা নেয়া হয়নি?

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন যে, ৯ জুন ডাক্তাররা বেগম খালেদা জিয়ার অজ্ঞান হওয়ার কথা বলে নাকি আদালতের সহানুভূতি লাভের চেষ্টা করেছেন। অথচ তিনি অবশ্যই জানেন যে, ডাক্তারদের সাক্ষাতের দিনক্ষণ স্থির করে সরকার। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে মরিয়া এই দলবাজ অ্যাটর্নি জেনারেল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর অসুস্থতা নিয়েও অশোভন ও অযৌক্তিক মন্তব্য করার আমরা তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।

ড. মোশাররফ হোসেন আরো বলেন, বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরেই নানা অসুস্থতায় ভুগছেন। তাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে না। আমরা স্পষ্ট ভাষায় জানাতে চাই যে, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার বিষয়ে রাজনৈতিক কারণে অবহেলা কিংবা বিলম্ব করা হলে তার পরিণাম সরকারের জন্য শুভ হবে না। দেশবাসী বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা সরকারের অমানবিক আচরণে ক্ষুব্ধ।

সাবেক এই স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা দাবি করছি যে, মূল মামলায় দেশের সর্বোচ্চ আদালতে জামিন পাওয়ার পরও সরকার নানা অপকৌশলে দেশনেত্রীর মুক্তির পথে যেসব বাধার সৃষ্টি করছে তা বন্ধ করা হোক, যাতে জামিনে মুক্ত হয়ে দেশনেত্রী তার পছন্দের হাসপাতালে নির্ভরযোগ্য ডাক্তারদের চিকিৎসাসেবা নিতে পারেন।

এ ছাড়া মানবিক কারণে ঈদের আগেই দেশনেত্রীর মুক্তির দাবিতে দেশের বিশিষ্টজনদের সংগঠন শত নাগরিক কমিটি শহীদ মিনারে মৌন অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে গেলে পুলিশ বাধা দেয়ার নিন্দা জানান ড. মোশাররফ হোসেন।


আরো সংবাদ