২২ জুলাই ২০১৮

তৃণমূলের দ্বন্দ্বে উদ্বিগ্ন আ’লীগ

তৃণমূলের দ্বন্দ্বে উদ্বিগ্ন আ’লীগ - ছবি : সংগৃহীত

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রায় প্রতিটি আসনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের একাধিক গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের অনেকে নিজ দলের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে ঘায়েল করতে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়ে রাজনীতির মাঠ দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছেন। তাই তৃণমূলে এখন আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগই। এই অবস্থায় দলীয় মনোনয়নপ্রাপ্তরা আগামী নির্বাচনে বেকায়দায় পড়তে পারেনÑ এমন আশঙ্কাও রয়েছে। 

জানা গেছে, তৃণমূলের কোন্দল নিয়ে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডও চিন্তিত। ইতোমধ্যে খোদ আওয়ামী লীগ প্রধান এ ব্যাপারে তৃণমূল নেতাদের সতর্ক করেছেন। আগামী নির্বাচনের আগে যেকোনোভাবে হোক তৃণমূলকে ঐক্যবদ্ধ করে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করাই ক্ষমতাসীনদের লক্ষ্য। তারই ধারাবাহিকতায় গত ২৩ জুন দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এবং ৩০ জুন তৃণমূল নেতাদের নিয়ে বিশেষ বর্ধিত সভা করে আওয়ামী লীগ। আগামী ৭ জুলাই ঢাকা, খুলনা, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের ইউনিয়ন নেতাদের নিয়ে আরেকটি বর্ধিত সভা হবে। ওই সভায় শেখ হাসিনা সরকারের সাড়ে ৯ বছরের উন্নয়ন, আগামী নির্বাচন এবং দলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে নেতাদের বেশ কিছু দিকনির্দেশনা দেবেন। বিশেষ করে আগামী নির্বাচনে দলের প্রার্থী মনোনয়ন এবং ভোটের মাঠে বিরোধী জোটের মোকাবেলায় কিছু কৌশলী পরামর্শ দেবেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। গত ২৩ জুনের বর্ধিত সভায় তৃণমূলকে সতর্ক করে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা বলেন, সামনে জাতীয় নির্বাচন। আমাদের মাথায় রাখতে হবে নির্বাচন চ্যালেঞ্জিং হবে। আমি ইতোমধ্যে একটা জিনিস লক্ষ করেছি, কেউ কেউ স্বপ্রণোদিত হয়ে প্রার্থী হয়ে গেছেন। আর প্রার্থী হয়ে তারা বক্তব্যে বিএনপি কি লুটপাট করল, সন্ত্রাস করল সে কথা বলে না। বিএনপি সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করেছে তা বলে না। তাদের বক্তব্য এসে যায় আওয়ামী লীগ এমপির বিরুদ্ধে, সংগঠনের বিরুদ্ধে। আমি একটি ঘোষণা দিতে চাই, আমরা এত উন্নয়ন করেছি, সেগুলো না বলে, কার কি দোষ আছে তা বলবেন, আর যাই হোক তারা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাবেন না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও) আসনে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন বর্তমান এমপি ফাহমী গোলন্দাজ বাবেল ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ওবায়দুল্লাহ আনোয়ার বুলবুল। দু’জনই আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেতে লবিং করছেন। এখানে সাবেক এমপি ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিনের একটি গ্রুপও সক্রিয় রয়েছে। তিনটি গ্রুপই পরস্পরবিরোধী রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত। বর্তমান এমপির বেশ কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে তৃণমূলে নানা আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। এই সুযোগে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে জায়গা করে নিচ্ছেন ওবায়দুল্লাহ আনোয়ার বুলবুল। তিনি ও তার অনুসারীরা দলীয় কর্মকাণ্ড করার চেষ্টা করলে এমপির লোকজন বাধা দিচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। 

শরীয়তপুরের প্রতিটি আসনে আওয়ামী লীগে অভ্যন্তরীণ বিরোধ রয়েছে। এ জেলায় ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি নয়, আওয়ামী লীগই। শরীয়তপুর-১ আসনের এমপি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হক ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ইকবাল হোসেন অপুর বিরোধ স্পষ্ট। তাদের দু’জনের অনুসারীরা মাঝে মধ্যেই বিবাদে জড়িয়ে পড়ে। দলীয় কর্মসূচিও পালন করে আলাদা আলাদা। শরীয়তপুর-৩ আসনেও একই অবস্থা। এ আসনের বর্তমান এমপি নাহিম রাজ্জাক ও ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বাহাদুর বেপারী অনেকটা মুখোমুখি অবস্থানে। দু’জনই নিজস্ব বলয় নিয়ে শোডাউন করেছেন নির্বাচনী এলাকাজুড়ে। মাদারীপুর-৩ আসনের সম্ভাব্য এমপি প্রার্থীর তালিকায় রয়েছেন বর্তমান এমপি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সম্পাদক ড. আব্দুস সোবহান গোলাপ ও সাবেক মন্ত্রী আবুল হোসেন। কালকিনি ও ডাসারজুড়ে এ তিন হেভিওয়েট প্রার্থী নিজস্ব বলয় গড়ে তুলে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। 
ব্রাহ্মণবাড়ীয়া-৫ (নবীনগর) আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপকমিটির সাবেক সহসম্পাদক ব্যারিস্টার জাকির আহম্মদ ও বর্তমান এমপি ফয়জুর রহমান বাদলের সমর্থকেরা মুখোমুখি। জাকির আহম্মদ অনুসারীদের ডাকা হয় না দলীয় কার্যক্রমে। অথচ তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বরং তার বিভিন্ন কর্মসূচিতে এমপির অনুসারীদের বাধা দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। 
ফরিদপুর-৪ আসনে আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরুল্লাহ ও মুজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন এমপির বিরোধ কারো অজানা নয়। দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্রভাবে এমপি নির্বাচিত হওয়ার পরই বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয়। তাদের পরস্পরবিরোধী শোডাউন ও বক্তব্যে পুরো জেলার রাজনীতি উত্তপ্ত। চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের এমপি আলী আজগর টগর ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে দলীয় স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আছে স্থানীয় নেতাকর্মীদের। অতীতে স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বাইরে গিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থীকে বিজয়ী করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ভালোভাবে নেয়নি স্থানীয় আওয়ামী লীগ। এমপি ও তার ছোট ভাই আলী মুনছুর বাবুর কর্মকাণ্ডে ুব্ধ স্থানীয় আওয়ামী লীগ কয়েকটি ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। নেতাকর্মীরা এখন আগামী জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশী কেন্দ্রীয় যুবলীগের সহসম্পাদক হাশেম রেজা, জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান মঞ্জু এবং জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য নজরুল মল্লিক গ্রুপে ভিড়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। 

নড়াইল-১ আসনেও অভ্যন্তরীণ কোন্দল মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ওই আসনের এমপি কবিরুল হক মুক্তির বিরুদ্ধে রয়েছে তৃণমূল নেতাকর্মীদের বিস্তর অভিযোগ। ওই আসনে এমপি বনাম স্থানীয় আওয়ামী লীগ মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। গত বছরের শেষের দিকে নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মোল্যা এমদাদ হোসেন, সদস্য অহিদুজ্জামান অহিদ, শামীম চেয়ারম্যান, কালিয়া পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান টুকু বিশ্বাসসহ শতাধিক নেতাকর্মী রাজধানীর গুলিস্তানের একটি রেস্টুরেন্টে এমপির বিরুদ্ধে সমাবেশ করেন। এ ছাড়াও গত জানুয়ারিতে কালিয়া উপজেলায় এমপির বিরুদ্ধে বড় সমাবেশ করেন তারা। দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য ও নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়াসহ নানা অভিযোগ দলীয় প্রধানের কাছেও লিখিতভাবে জানানো হয়। স্থানীয় নেতাকর্মীরা এমপির বিপক্ষে সংবাদ সম্মেলনও করেছেন একাধিকবার। ওই উপজেলায় প্রত্যেকটি দলীয় কর্মসূচি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পালন করেন নেতাকর্মীরা। এ প্রসঙ্গে নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য মো: অহিদুজ্জামান অহিদ বলেন, এমপি বরাবরই নেত্রীর কথা অমান্য করেছেন। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নেত্রীকে উপেক্ষা করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করেছিলেন মুক্তি বিশ্বাস। গত পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনগুলোতে ১৪টি ইউনিয়নের প্রত্যেকটিতে নৌকার বিপক্ষে প্রার্থী দাঁড় করিয়েছিলেন এমপি। তিনি বলেন, এমপি হয়ে মুক্তি বিশ্বাস আওয়ামী লীগের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করেননি। স্কুলের পিয়ন নিয়োগ দিয়ে লাখ লাখ টাকা কামাই করেছেন। টিআর কাবিখাসহ উন্নয়ন কাজের নামে দুর্নীতি করেছেন। এসব কারণে আওয়ামী লীগের প্রকৃত নেতাকর্মীরা এখন এমপির ওপরে ুব্ধ। তৃণমূলের কেউই আগামী নির্বাচনে তার মনোনয়ন চান না। 

এ ছাড়াও আওয়ামী লীগের বেশ কিছু এমপির বিরুদ্ধে এ রকম হাজারো অভিযোগ রয়েছে তৃণমূল নেতাকর্মীদের। দলের মধ্যকার বিরোধ তুলে ধরে বিশেষ বর্ধিত সভায় ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বেনজির আহমেদ বলেন, তৃণমূলে দলের নেতারা একমঞ্চে ওঠেন না, কেউ কারও চেহারাও দেখতে চান না। পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দেয়া হয়। আওয়ামী লীগকে হারানোর জন্য আওয়ামী লীগই যথেষ্ট।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে বলেন, নিজেদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করে। তৃণমূলে যার জনপ্রিয়তা আছে, জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা আছে। তাকেই মনোনয়ন দেয়া হবে। যারা বড় নেতা হয়েও জনবিচ্ছিন্ন তারা মনোনয়ন পাবে না। সম্ভাব্য প্রার্থীদের সতর্ক করে তিনি আরো বলেন, সংসদীয় আসন ঘিরে দলীয় সভাপতির হাতে ছয় মাস অন্তর এসিআর আসছে। শিগগিরই আরো একটি জরিপ রিপোর্ট আসবে। প্রার্থী বাছাইয়ে এগুলো গুরুত্ব পাবে।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য ড. নূহ উল আলম লেনিন নয়া দিগন্তকে বলেন, বড় দলগুলোর মধ্যে প্রার্থী চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত এ রকম প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়ে থাকে। এতে মনে হয় এই বুঝি দল ভেঙে গেল। কিন্তু আসলে তা নয়। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের ক্ষেত্রে বলতে পারি, প্রার্থী চূড়ান্ত হয়ে গেলে অভ্যন্তরীণ সমস্যা আর থাকে না। তখন সব নেতাকর্মী ঐক্যবদ্ধ হয়ে নৌকা মার্কার প্রার্থীকে জেতানোর জন্য কাজ করে। তবে দুয়েক জায়গা ব্যতিক্রম হয় না, তা বলব না। সে রকম কিছু হলে কেন্দ্র থেকে হস্তক্ষেপ করে সমাধান করা হয়।


আরো সংবাদ