২২ জুলাই ২০১৮

নতুন কর্মসূচি নিয়ে ভাবনা বিএনপির

নতুন কর্মসূচি নিয়ে ভাবনা বিএনপির - সংগৃহীত

সুষ্ঠু জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে নতুন কর্মসূচি প্রণয়নের কথা ভাবছে বিএনপি। খুব শিগগিরই দলের কেন্দ্রীয় নেতারা আবারো সারা দেশের সাংগঠনিক জেলাগুলো সফর করবেন। তারা তৃণমূলের মধ্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দেবেন। হামলা-মামলাকে উপেক্ষা করে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন ও বেগম খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে যে কর্মসূচি আসবে তা যেকোনো মূল্যে সফল করতে তৃণমূলে বার্তা দেয়া হবে। এ লক্ষ্যে গতকাল বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যবৃন্দ এক বৈঠকে বসেন। সম্প্রতি লন্ডনে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে দেখা করে এসে এই প্রথম স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সাথে বৈঠক করলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী ওই বৈঠকে বিএনপির আগামী দিনের নতুন কর্মসূচি এবং গাজীপুর, সিলেট, রাজশাহী ও বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, জমির উদ্দিন সরকার, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, মাহবুবুর রহমান, ড. আবদুুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টু উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে রাজশাহী ও সিলেট বিএনপির সিনিয়র নেতাদের সাথেও আলোচনা হয়।

উল্লেখ্য, গত ৩ জুন চিকিৎসার জন্য স্ত্রী রাহাত আরাকে সাথে নিয়ে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক যান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পরে ব্যাংকক থেকে তিনি একাই লন্ডন যান। তার সহধর্মিণী দেশে ফিরে আসেন। লন্ডনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে ব্যক্তিগতভাবে একাধিকবার বৈঠক ছাড়াও লন্ডন বিএনপি আয়োজিত এক ইফতার ও দোয়া মাহফিলে যোগ দেন দুই নেতা। লন্ডনে অবস্থানকালে মির্জা ফখরুল একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে সাাৎকারও দেন। গত ১২ জুন লন্ডন থেকে দেশে ফিরেন বিএনপি মহাসচিব।

বিএনপি সূত্র জানায়, লন্ডনে তারেক রহমানের সাথে বৈঠকে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা ও বিএনপির দলীয় কর্মকাণ্ড নিয়ে বিস্তারিত কথাবার্তা হয় মির্জা ফখরুলের। কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে ঈদের পর কর্মকৌশল ও আগামী জাতীয় নির্বাচনে দলের করণীয় নিয়ে কথা হয় শীর্ষ দুই নেতার মধ্যে।
জানা গেছে, এই মুহূর্তে কঠোর আন্দোলনে না গিয়ে ধাপে ধাপে সরকার পতনের চূড়ান্ত আন্দোলনে যেতে চাইছে বিএনপি। দলটির কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা এমনটাই চাইছেন। কেননা, বিএনপির কাছে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা এবং দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে একটি নিরপে সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা। তাদের ভাষ্য- এখন কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করলে খুব একটা ভালো ফল হবে না। কেবল নেতাকর্মীদের নতুন করে ‘মিথ্যা’ মামলা, নির্যাতন আর হয়রানির শিকার হতে হবে। বাড়বে গ্রেফতারের সংখ্যা। সে জন্য পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণে এবার কৌশলী বিএনপি।

দলীয় সূত্র জানায়, আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও সব দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হওয়া এবং দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আগামী জুলাইয়ের শেষদিকে ঢাকায় একটি মহাসমাবেশ করতে চায় বিএনপি। এর আগে এ বিষয়ে সারা দেশের তৃণমূলে আবারো সফরে যাবেন বিএনপির সিনিয়র নেতারা। তারা তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মনোবল উজ্জীবিত করার জন্য দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনামূলক বার্তা পৌঁছে দেবেন। যাতে করে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে সাফল্য অর্জন করা যায়।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি বলেছেন, আমাদের দেশনেত্রীকে সরকার মিথ্যা মামলায় অন্যায়ভাবে কারাগারে বন্দী করে রেখেছে। আমরা আজকে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ঈদ উদযাপন করছি। আমরা আন্দোলনের মধ্যে আছি। আমাদের নেত্রী যে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের কথা বলে গেছেন সেই নিয়মতান্ত্রিক শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে আমরা প্রত্যেকটি স্তরে জোরদার করছি। আমরা মনে করি আন্দোলনের মাধ্যমে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে আমরা মুক্ত করতে পারব ইনশাআল্লাহ। তিনি বলেন, বিএনপির কাছে এখন মূল চ্যালেঞ্জ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। আমরা দেশনেত্রীকে মুক্ত করে একটি নিরপে সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারব।
কর্মসূচির ব্যাপারে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছেন, এই সরকারকে আমরা অনেক সুযোগ দিয়েছি। এবার কোনো ছাড় নয়। রাজপথে তাদেরকে কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে পরাজিত করে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা হবে।

ঢাকা মহানগর বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ও বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য শেখ রবিউল আলম রবি নয়া দিগন্তকে বলেন, বিএনপি আন্দোলন-সংগ্রামের জন্য সবসময় প্রস্তুত। বিএনপির মতো বৃহৎ রাজনৈতিক দলের আলাদাভাবে আন্দোলনের প্রস্তুতি লাগে না। তবে এই মুহূর্তে আমরা কঠোর আন্দোলনে শক্তি ক্ষয় করব না। মোক্ষম সময়েই কঠোর আন্দোলন আসবে।
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইয়াজ্জেম হোসেন রোমান বলেন, বর্তমান ফ্যাসিস্ট সরকার অবৈধভাবে ক্ষমতায় এসে দেশের সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে। তারা এখন মিথ্যা মামলায় বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে বন্দী রেখেছে। কিন্তু তার মুক্তি ছাড়া আমরা কোনো ধরনের নির্বাচনে যেতে চাই না। সবার আগে দেশনেত্রীকে মুক্তি দিতে হবে। নইলে আমরা যেকোনো কঠোর কর্মসূচি পালনের জন্য প্রস্তুত।

গাসিক নির্বাচনের পর অন্য ৩ সিটি নিয়ে চিন্তা : দলীয় সূত্র জানায়, গতকাল গুলশানে দলীয় চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের বৈঠকে চার সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে। বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এ বৈঠকে বিশেষ করে আসন্ন গাজীপুর সিটি (গাসিক) নির্বাচন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। কোন কৌশলে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো হবে ও ‘ভোট ডাকাতি’ মোকাবেলা করা হবে তা নিয়ে সভায় আলোচনা হয়। বৈঠকের পর রাজশাহী ও সিলেট সিটি করপোরেশনের সদ্য সাবেক মেয়রদ্বয় এবং বিএনপির সিনিয়র নেতারা দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সাথে দেখা করেন। তবে প্রার্থী মনোনয়নের ব্যাপারে বিএনপিতে বিভিন্ন চিন্তাভাবনা আছে। সে ক্ষেত্রে শুধু বরিশাল সিটিতে প্রার্থী পরিবর্তন হতে পারে। রাজশাহী এবং সিলেটে প্রার্থী অপরিবর্তনীয় থাকার সম্ভাবনা বেশি বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, আসন্ন গাজীপুর সিটি নির্বাচনের পর সিলেট, রাজশাহী ও বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে করণীয় ঠিক করবে বিএনপি। গাজীপুর সিটি নির্বাচনের পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। গাজীপুর সিটিতে নির্বাচনী প্রচারণা এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে ইতোমধ্যে কয়েক দফা বৈঠকও করেছেন বিএনপির মহাসচিব ও সংশ্লিষ্ট নেতারা।
গতকালের বৈঠক প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা সব স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে আসছি।

গতকালও আমরা দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যবৃন্দ সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়েই বৈঠকে বসেছিলাম। সেখানে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। গাজীপুর সিটি নির্বাচনের পর অন্য সিটিগুলোর ব্যাপারে করণীয় ঠিক করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অন্য তিন সিটিতে প্রার্থী মনোনয়নের ব্যাপারে আরো বৈঠক হবে। স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মী ও সংশ্লিষ্টদের মতামত নেয়া হবে। তারপর নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় প্রার্থী মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হবে। কে কোন সিটিতে প্রার্থী হচ্ছেন তা এখনই বলা যাচ্ছেনা। কেননা এই মুহূর্তে অন্য সিটি নির্বাচনের চেয়ে গাজীপুর সিটি নির্বাচন আমাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


আরো সংবাদ