২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮

গ্রামটিতে বিড়াল পালন নিষিদ্ধ হচ্ছে

-

নিউজিল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলের ছোট্ট একটি শহর ওমাউই। সেখানে বন্য প্রাণী রক্ষার চেষ্টা হিসেবে চরম এক পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে- আর তা হল সব ধরনের পোষা বিড়ালের ওপর নিষেধাজ্ঞা।

এনভায়রনমেন্ট সাউথ-ল্যান্ড-এর প্রস্তাবিত এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে, ওমাউইতে যত বিড়াল-প্রেমী আছেন তাদের বিড়ালকে বন্ধ্যা করতে হবে, সেগুলোর শরীরে মাইক্রোচিপ বসাতে হবে এবং বিড়ালকে নিবন্ধিত করতে হবে।

তাদের পোষা বিড়ালের মৃত্যু হলে ওই সম্প্রদায়ের বিড়াল-প্রেমী লোকজন নতুন করে বিড়াল পালনের অনুমতি পাবেন না।

এটা বাড়াবাড়ি বলে মনে হতে পারে বটে, কিন্তু উদ্যোক্তাদের যুক্তি- প্রতিবছর কোটি কোটি পাখি এবং স্তন্যপায়ী প্রাণীর মৃত্যুর জন্য দায়ী এসব বিড়াল।

সেখানকার একটি পাখি সংরক্ষণাগার দ্য স্মিথসোনিয়ান মাইগ্রেটরি বার্ড সেন্টারের প্রধান ডক্টর পিটার মারা এই বিষয়ে অনেক গবেষণাপত্র এবং বই লিখেছেন। যদিও তার সম্পর্কে বিতর্কিত ধারণা প্রচলিত আছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, তিনি বিড়াল বিদ্বেষী নন কিংবা বিড়াল পালনের বিপক্ষেও নন।

বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘বিড়াল চমৎকার পোষা প্রাণী-তারা দেখতেও দারুণ! কিন্তু তাই বলে তাদের যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াতে দেয়া যাবে না-এটাই অবধারিত সমাধান।’

কর্মকর্তারা বলছেন, ওমাউইতে এই পদক্ষেপ যথাযথ। কারণ ক্যামেরায় দেখা গেছে যে, ঘুরে বেড়ানো বিড়ালেরা ওই এলাকার পাখী, পোকা-মাকর এবং সরীসৃপ প্রজাতির প্রাণী শিকার করছে।

নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়াতে বিড়ালের দ্বারা অনেক প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যেতে বসেছে।

‘তাই ওমাউইতে আপনার বিড়াল যেভাবে আরাম-আয়েশে দিন কাটাচ্ছে সেভাবেই কাটাতে পারবে। কিন্তু যে মুহূর্তে সেটি মারা যাবে আপনি এর পরিবর্তে আর কোন বিড়াল পালতে আনতে পারবেন না’- বলছিলেন বায়ো-সিকিউরিটি অপারেশন্স ম্যানেজার আলি মিয়াদে।

ওমাউই ল্যান্ড কেয়ার চ্যারিটেবল ট্রাস্টের চেয়ারম্যান জন কলিনস অতি মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় বিড়াল পালনের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন।

‘আমরা বিড়াল বিদ্বেষী নই কিন্তু আমরা চাই আমাদের বন্যপ্রাণী-সমৃদ্ধ পরিবেশ থাকুক।’

বিড়াল আসলে কতবড় হুমকি?

বিড়াল এবং স্থানীয় ইকো-সিস্টেম নিয়ে বিতর্ক যে শুধু ওমাউইতে- তা নয়।

বিশ্বব্যাপী ইকো-সিস্টেমের ওপর বন্য এবং পোষা- দুই প্রজাতিই বিড়ালের প্রভাব নিয়ে বহু আগে থেকেই সতর্ক করে আসছেন বন সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞরা। এবং বিড়াল বিশ্বের ১০০টি ভয়ংকর আক্রমণাত্মক নন-নেটিভ প্রজাতির মধ্যে জায়গা পেয়েছে।

ডক্টর মারা বলেন, ৬৩ রকমের প্রজাতি বিলুপ্তির মুখে যারা বিড়ালের আক্রমণের আতঙ্কে আছে।

নিউজিল্যান্ডের মত অত্যন্ত সংবেদনশীল ইকো-সিস্টেম যেখানে, সেখানে এই সমস্যাটি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

‘এটা চরম বলে মনে হতে পারে কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।’

তিনি মনে করেন, বিশ্বজুড়ে বিড়াল প্রেমীদের এই প্রাণীটির প্রতি আলাদা চিন্তা-ভাবনা গড়ে তুলতে হবে। তার মতে, বিড়ালকে বন্ধ্যা করে দেয়া, এবং বাড়িতে খেলনা দিয়ে খেলানো কিংবা বাড়ির ভেতরে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করতে হবে -যেমন শিকলে বেধে রাখা যেতে পারে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘এই বিপজ্জনক অবস্থার দোষ বিড়ালের নয় এটা মানুষের দোষ।’

সোশ্যাল মিডিয়ায় এবং মেমে-তে জনপ্রিয়তার কারণে বিশ্বব্যাপী পোষা প্রাণীদের সংখ্যায় কোন ঘাটতি নেই।

‘তারা দেখতে 'কিউট'- ফলে তাদের সম্পর্কে মানুষের অনুভূতি বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে।’

সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন তবে আমেরিকাতে ৮৬ মিলিয়ন পোষা বিড়াল আছে। অর্থাৎ প্রতি তিনটি পরিবারে একটি বিড়াল।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর প্রায় চার বিলিয়ন পাখি এবং ২২ বিলিয়ন স্তন্যপায়ী প্রাণী বিড়ালের দ্বারা হত্যার শিকার হয়।

ব্রিটেনেও এই সংখ্যা কমে যাচ্ছে এবং সেজন্য বিশেষজ্ঞরা দায়ী করছেন বিড়ালকেই।

স্তন্যপায়ী প্রাণী বিষয়ক গবেষণা ও সংরক্ষন সংগঠন ম্যামাল সোসাইটি বলছে, প্রায় ৫৫ মিলিয়ন পাখি প্রতিবছর আক্রান্ত হয়।

প্রকৃতিগতভাবেই ঘাতক!

নিউজিল্যান্ডে এই প্রথম বিড়ালের এমন ভীতিকর চেহারা উঠে এসেছে তেমনটি নয় - দেশের মোট পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেক পরিবারেই পোষা বিড়াল রয়েছে।

অস্ট্রেলিয়াতেও বিষয়টি বড় চিন্তার কারণ। যেখানে প্রতি রাতে বিড়াল বহু বিরল প্রজাতির প্রাণীর মৃত্যুর কারণ হচ্ছে।

২০১৫ সাল থেকে সেখানে বিড়ালের কবল থেকে প্রাণীকুলকে বচাতে বিশ্বের বৃহৎ ক্যাট-প্রুফ বেড়া দেয়া হয় এবং গৃহপালিত বিড়ালের কারণে সেখানে জাতীয়ভাবে কারফিউ পর্যন্ত জারি করা হয়।

রাতে বিড়াল যেন বাড়ির বাইরে না যায় সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে মাঠে নামেন কাউন্সিল ও স্থানীয় সরকারি প্রতিনিধিরা।

তবে এসমস্ত কর্মকাণ্ড ঘিরে বিতর্কও রয়েছে। গত বছর কুইন্সল্যান্ডের স্থানীয় কাউন্সিল অফিস বন্য বিড়ালের খুলির জন্য পুরস্কার ঘোষণা করলে তীব্র ধিক্কার জানায় প্রাণী অধিকার সংগঠনগুলো।

ওমাউইতে স্থানীয় লোকজন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন তারা বিড়াল পালনের প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞার খবরে ‘হতবাক’। এটি প্রত্যাখ্যানও করেছেন অনেকে।

নিকো জারভিস বলেন, তার তিনটি বিড়াল রয়েছে এবং সেগুলো তার বাড়িতে ইঁদুর মারে। বিড়াল নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবকে তিনি তুলনা করেন ‘পুলিশ রাষ্ট্র’ হিসেবে।

ফেসবুক পেজে বিড়াল প্রেমীদের যে পাতা রয়েছে সেখানেও এ সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া এসেছে। সেখানে কেউ কেউ যুক্তি তুলে ধরেন যে ‘বিষ, গাড়ি এবং মানুষও বন্য প্রজাতি ধ্বংস করতে পারে’।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত তাদের মতামত জমা দিতে হবে এই প্রস্তাবের বিষয়ে।

সূত্র : বিবিসি


আরো সংবাদ