২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

এই গ্রামগুলোতে ছাগল পালন একেবারেই নিষিদ্ধ

সারা বছর বাংলাদেশে ছাগলের মাংসের প্রচুর চাহিদা থাকে - সংগৃহীত

বেশ কয়েক বছর ধরে ঝিনাইদহের কমপক্ষে ৩৫টি গ্রামে ছাগল পালন বন্ধ রয়েছে। জেলার প্রাণিসম্পদ অফিস জানিয়েছে, স্থানীয় সমাজপতিদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গ্রামগুলোতে ছাগল পালন বন্ধ রাখা হয়েছে।

জেলার শৈলকূপা উপজেলার ৩৫টি গ্রাম ছাড়াও আশপাশের আরো কিছু উপজেলায় এ প্রবণতা বিস্তৃত হচ্ছে বলে জানাচ্ছেন কর্মকর্তারা।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোঃ হাফিজুর রহমান বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, গ্রামে ছাগলের দ্বারা ফসলের ক্ষেত নষ্ট হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্রে করে বিভিন্ন সময় মারামারি, এমনকি খুন-খারাবির ঘটনাও ঘটেছে অতীতে।

সে কারণেই গ্রামের 'মাতব্বররা' ছাগল পালন নিষিদ্ধ করেছেন বলে জানান তিনি।

ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে প্রায়ই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটতো। এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছাগল নিয়ে বিরোধ একটি বড় কারণ ছিল বলে মনে করেন স্থানীয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা।

শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আরিফ রেজার কথায় এর সত্যতাও পাওয়া যায়। তিনি জানান, মনোহরপুর ইউনিয়নের কিছু গ্রামেও ছাগল পালন নিষিদ্ধ আছে।

রেজা বলেন, ছাগলের দ্বারা ফসলের ক্ষেত নষ্ট হওয়াকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময় এলাকায় রক্তপাত হয়েছে।

এই ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বলেন, গ্রামের 'মুরুব্বিরা' মিলে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। 'মুরুব্বিরা' যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তখন চেয়ারম্যান হিসেবে কিছু করার থাকে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ঝিনাইদহ সদর উপজেলার চেয়ারম্যান কবির হোসেন জোয়ারদার বলেন, তিনি যে এলাকায় বসবাস করেন সেখানেও গত বেশ কয়েক বছর ধরে কেউ ছাগল পালন করে না।

এক সময় তারও ১০-১২টি ছাগল ছিল বলে জানান। তিনি বলেন, "ছাগলগুলো জবাই দিয়ে গরীব মানুষকে খাইয়ে দিয়েছি।"

তিনি আরো বলেন, এলাকার সবাই মিলে ছাগল পালন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের কয়েকজন চেয়ারম্যান দাবি করেন, যেসব এলাকায় ছাগল পালন নিষিদ্ধ রয়েছে, সেসব জায়গায় মানুষের মধ্যে হিংসাত্মক কর্মকাণ্ড কমেছে।

তবে ছাগল পালন নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে প্রান্তিক ও ভূমিহীন লোকজন বেকায়দায় রয়েছে বলে জানান প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান।

ছাগল পালনে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য জেলা প্রাণিসম্পদ দফতর নানাভাবে চেষ্টা করলেও তাতে খুব একটা ফল হয়নি।

"এক সময় ৪৫টি গ্রামে ছাগল পালন নিষিদ্ধ ছিল। গত কয়েক বছরে আমরা সেটি কমিয়ে ৩৫টি পর্যন্ত আনতে পেরেছি। এই ৩৫টি গ্রামে গত বেশ কয়েক বছর ধরে ছাগল পালন হয় না।"

হাফিজুর রহমান জানান, এসব গ্রামের উদাহরণ কাজে লাগিয়ে আশপাশের কিছু এলাকায় একই পন্থা কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

ঝিনাইদহের যে গ্রামগুলোতে ছাগল পালন নিষিদ্ধ রয়েছে, সেগুলো অন্যতম সেরা জাত ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল পালনের জন্য প্রসিদ্ধ।

প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা বলছেন, একটি ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল বাচ্চা প্রসবের চার মাসের মাথায় সেটি বিক্রয়যোগ্য হয়ে উঠে এবং বাজারে যার দাম থাকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত।

ফলে ছাগল পালনের মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচনে ভূমিকা রাখা সম্ভব বলে উল্লেখ করেন কর্মকর্তারা।

প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের গড় ওজন ১৫ থেকে ২০ কেজি। তবে এসব ছাগল ৩০ থেকে ৩২ কেজি পর্যন্তও হতে পারে বলে তারা জানালেন।

 

আরো পড়ুন : পাবনা-সিরাজগঞ্জের খামারিরা সরবরাহ করছে দুই লাখ কোরবানির পশু

শফিউল আযম, বেড়া (পাবনা) সংবাদদাতা 

গবাদিপশু সমৃদ্ধ পাবনা-সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের খামারি ও চাষিরা প্রায় দুই লাখ কোরবানির পশু দেশের বিভিন্ন হাটে সরবরাহ করছেন। প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে এসব গরু-মহিষ মোটাতাজা করা হয়েছে। এদিকে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর রাজশাহী ও চাপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত পথে ভারত থেকে গরু মহিষ আসছে। প্রতিদিনই বাড়ছে ভারতীয় গরু, মহিষের আমদানি। এতে দেশি গরু-মহিষের দাম কমে যেতে পারে বলে খামারি ও চাষিরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলা প্রাণী সম্পদ অফিস সূত্রে জানা যায়, দু’টি জেলায় প্রায় ২২ হাজার গোখামার গড়ে উঠেছে। গ্রামগুলোর প্রায় প্রতিটি বাড়ীতে গবাদিপশু পালন কার হয়। এ অঞ্চলে গোখামারের পাশাপাশি ১০ সহ¯্রাধিক ব্যবসায়ী ও কৃষকের গোয়ালে প্রায় দুই লাখ গরু-মহিষ প্রাকৃতিক উপায়ে মোটাতাজা করা হয়েছে।

গত মঙ্গলবার বেড়া সিঅ্যান্ডবি চতুরহাট ঘুরে দেখা যায়, প্রায় ৫০-৬০ হাজার গবাদিপশু আমদানি হয়েছে। মুল হাট ছেড়ে প্রাণ ডেইরির বিশাল চত্বর ইছামতি নদী বণ্যানিয়ন্ত্রন বাঁধের উভয় পাশের প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাব্যাপী ছোট, মাঝারি, বড় আকারের গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া আমদানি হয়েছে। হাটের সাথে সড়ক ও নৌপথে সহজ যোগাযোগের ব্যবস্থার কারণে টাংগাইল, ঢাকা, কুমিল্লা, চট্রগ্রাম, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যাপারিরা গরু কেনার জন্য এ হাটে এসেছেন। তারা গবাদিপশু কিনে ঈদের বাজার ধরার জন্য সড়ক ও নৌপথে নিজ নিজ গন্তব্যে নিয়ে যাচ্ছেন। এ সুযোগে ট্রাক ও নৌকার মালিকরা ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে বলে ব্যাপারিরা জানিয়েছেন।

ওমরপুর চরের গরুর ব্যাপারী আমজাদ হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর রাজশাহী ও চাপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত পথে ভারতীয় গরু মহিষ আসছে। যারা বৈধ ব্যবসায়ী তারা সরকারকে রাজস্ব দিয়ে করিডোরের মাধ্যমে পশু আমদানি করছেন। চোরা পথেও প্রচুর ভারতীয় গরু, মহিষ দেশে ঢুকছে। এতে দেশি গরুর দাম কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পাবনার সদর, বেড়া, সাঁথিয়া, ফরিদপুর, সুজানগর, ঈশ্বরদী, চাটমোহর, আটঘড়িয়া, ভাঙ্গুড়া সিরাজগঞ্জের সদর, শাহাজাদপুর, উল্লাপাড়া, তারাশ, বেলকুচি, চৌহালীসহ এ অঞ্চলের খামারি ও চাষিরা জানান, প্রাকৃতিক নিয়মে মোটাতাজা গরুর মধ্যে রয়েছে পাবনা ব্রিড, অষ্ট্রেলিয়ান-ফ্রিজিয়ান ব্রিড, ইন্ডিয়ান হরিয়ান ব্রিড, পাকিস্তানি সাহিয়াল ব্রিড। তবে এর পাশাপাশি রয়েছে স্থানীয় ব্রিডিং পদ্ধতি যা লোকাল ক্রস ব্রিড নামে পরিচিত। এসব ব্রান্ডের সব গরুই মোটাতাজাকরণ প্রক্রিয়ায় বড় করে বাজারে তোলা হয়। গরু মোটাতাজাকরণ একটি নিয়মিত ও প্রচলিত পদ্ধতি। বিশেষ পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত ইউরিয়া, লালিগুড় ও খড়ের একটি বিশেষ মিকচার আট দিন কোন পাত্রে বন্ধ করে রেখে তা রোদে শুকিয়ে গরু-মহিষকে খাওয়াতে হয়। তিন মাস এটা খাওয়ালে গরু-মহিষ খুব দ্রুত মোটাতাজা হয়ে ওঠে। এই গরুর মাংস মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়।

খামারীরা ও চাষিরা জানান, সাধারণত গরুকে প্রাকৃতিক পন্থায় মোটাতাজা ও সুস্থ রাখতে খড়, লালি গুর, ভাতের মার, তাজা ঘাস, খৈল, গম, ছোলা, খোসারী, মাসকালাই, মটরেরভূসিসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবার দেয়া হয়। গরুর জন্য এটা বিজ্ঞনসম্মত। এ নিয়মে গরু মোটাতাজা করা হলে ক্রেতা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন না। এ ধরনের গরুর মাংস খেয়ে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি থাকে না। প্রাকৃতিক উপায়ে মোটাতাজা গরু-মহিষের চাহিদা বেশি, দাম ভাল পাওযা যায়।

খামারীরা জানান, কোরবানির ঈদ সামনে এ অঞ্চলের কিছু কিছু অসাধু মওসুমি ব্যবসায়ী গরুকে মোটাতাজা করতে ব্যবহার করছে নানা ওষুধ। তারা রোগাক্রান্ত গরু অল্প টাকায় কিনে মোটাতাজা করে বেশি লাভে বিক্রি করে। অধিক লাভের আশায় গরু মোটাতাজা করতে ব্যবহার করা হয় ষ্টেরয়েড ও হরমোন জাতীয় ওষুধ। এসব ওষুধ বিভিন্ন ফার্মেসি গবাদিপশু চিকিৎসালয়ে পাওয়া যায়। ফার্মেসি ব্যসায়ীরা সহজেই এসব ওষুধ গরু ব্যসায়ীদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। এসব ওষুধ গরুকে খাওয়ালে কয়েক মাসের মধ্যে গরুর শরীর ফুলে মোটা হয়ে যায়। এই গরু দেখতে সুন্দর হয়। এ বছর কৃত্রিম পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজাকরণের হার অনেক কমে গেছে। এ বছর পাবনা-সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের শতকরা ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ খামারী ও চাষি প্রাকৃতিক নিয়মে গরু-মহিষ মোটাতাজা করছেন বলে তারা এ প্রতিনিধিকে জানিয়েছেন।

সাঁথিয়া উপজেলার মনমথপুর গ্রামের খামারী আব্দুল মান্নান জানান, তিনি গত বছর ১২টি গরু বিক্রি ৭৫ হাজার টাকা লাভ করেন। এবার তিনি প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে ১৮টি গরু মোটাতাজা করেছেন। এদিকে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বৈধ ও অবৈধ পথে ভারতীয় গরু, মহিষ আমদানি হওয়ায় এ অঞ্চলের গোখামারি ও চাষিরা লোকসানের মুখে পড়তে পারেন বলে তিনি আশঙ্ক প্রকাশ করেছেন।


আরো সংবাদ

সকল