১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

রোহিঙ্গা তরুণদের মধ্যে হতাশার ঝুঁকি বাড়ছে : ইউনিসেফ

রোহিঙ্গা তরুণদের মধ্যে হতাশার ঝুঁকি বাড়ছে : ইউনিসেফ - সংগৃহীত

বাংলাদেশে উদ্বাস্তু হিসেবে বসবাস করা রোহিঙ্গা তরুণদের মধ্যে হতাশার ঝুঁকি ব্যাপকমাত্রায় বেড়ে যাচ্ছে। শিক্ষার পূর্ণাঙ্গ সুযোগ ছাড়া, কিশোর-কিশোরীরা পাচারকারীদের শিকার হতে পারে। কারণ এই পাচারকারীরা হতাশগ্রস্থ তরুণ রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের বাইরে পাচারের প্রস্তাব দেয়। তাছাড়াও মাদক ব্যবসায়ীরাও এই এলাকায় সচল। বিশেষ করে, রাতের বেলা নারী ও মেয়েদের হয়রানি এবং নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হয়।

‘বিওন্ড সারভাইভাল: রোহিঙ্গা রিফিউজি চিলড্রেন ইন বাংলাদেশ ওয়ান্ট টু লার্ন’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। শুক্রবার রিপোর্টটি প্রকাশ করে ইউনিসেফ। চরম সহিংসতা, জাতিগত নিধনের ফলে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা প্রায় ৭ লাখ ৪৫ হাজার রোহিঙ্গা নাগরিকের উদ্বাস্তু জীবনের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে এই প্রতেবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

এতে আরো বলা হয়- বেশিরভাগ উদ্বাস্তু বাস করে এমন বড় বড় আশ্রয়কেন্দ্র ও তার আশেপাশে শিক্ষা ও দক্ষতা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টির জন্য জাতিসংঘের শিশু সংস্থা তাদের প্রকাশিত নতুন প্রতিবেদনে জরুরি বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসার দুই বছর পরেও বাংলদেশে আশ্রয় নেয়া ৫ লাখেরও অধিক রোহিঙ্গা শিশুর মানসম্পন্ন শিক্ষা ও জীবন-দক্ষতা খুবই জরুরি।

তবে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে যে, ২০১৯ সালের জুন মাস পর্যন্ত সামগ্রিক শিক্ষাখাত ৪ থেকে ১৪ বছর বয়সী ২ লক্ষ ৮০ হাজার শিশুকে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রদান করা হয়। এ সকল শিশুদের মধ্যে থেকে ইউনিসেফ ও তার সহযোগীরা ২,১৬৭টি শিক্ষা কেন্দ্রে ১ লাখ ৯২ হাজার রোহিঙ্গা শিশুর শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করেছে। তারপরও ২৫ হাজারের বেশি শিশু কোনো ধরণের শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে না এবং এখনো অতিরিক্ত ৬৪০টি শিক্ষা কেন্দ্রের প্রয়োজন। এছাড়াও, ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুদের ৯৭ শতাংশ এখনো কোনো ধরণের শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে না।

ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর বলেন,‘বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শিশু ও তরুণদের জন্য শুধুমাত্র বেঁচে থাকাই যথেষ্ট নয়। তাদের দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা প্রদান করা ভীষণ প্রয়োজন। এসব কারণে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় গুণগত শিক্ষা এবং দক্ষতা বিকাশের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’

প্রতিবদেনে জানানো হয়, আশ্রয়কেন্দ্রের শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে অধ্যয়নরত কম বয়সী উদ্বাস্তু শিশুদের জন্য আরো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা এবং শেখার উপকরণ ক্রমান্বয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে। রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য আরো কাঠামোবদ্ধ শিক্ষার ব্যবস্থা করতে সহায়তা করার জন্য ইউনিসেফ এবং অন্যান্য সংস্থাগুলো মিয়ানমার ও বাংলাদেশ সরকারকে জাতীয় শিক্ষামূলক সম্পদসমূহ- যেমন, শিক্ষা পাঠ্যক্রম, শিক্ষণ এবং প্রশিক্ষণ ম্যানুয়্যাল ও মূল্যায়ন পদ্ধতি- ব্যবহারের অনুমতি প্রদানের আহ্বান জানিয়েছে।

মিস ফোর বলেন,‘শিক্ষণ ও প্রশিক্ষণের উপকরণ সরবরাহ করা একটি বিশাল কাজ এবং সকল সহযোগীর পূর্ণ সমর্থন পাওয়া গেলেই কেবলমাত্র এটি করা সম্ভব হবে। কিন্তু একটি প্রজন্মের শিশু ও তরুণদের আশা-আকাংখা ঝুঁকিতে রয়েছে। আমরা তাদেরকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে দিতে পারি না।’

যুব কেন্দ্র এবং কিশোর ক্লাবের উন্নয়নে ইউনিসেফ সহায়তা প্রদান করছে। বিস্তৃত একটি প্যাকেজের অংশ হিসেবে এসব কেন্দ্র ও ক্লাবে জীবন-দক্ষতা, মনো-সামাজিক সহায়তা, মৌলিক সাক্ষরতা এবং সংখ্যা গণনা ও বৃত্তিমূলক দক্ষতা দেয়া হয়। জুলাই ২০১৯ পর্যন্ত এরকম প্রায় ৭০টি ক্লাব চালু করা হয়েছিল। তবে, এরকম আরো অনেক কার্যক্রম প্রয়োজন বলেও প্রতিবেদনে অভিমত ব্যক্ত করা হয়।

ইউনিসেফ-এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি টমো হোজুমি বলেন,‘আমাদের লক্ষ্য হলো কিশোর-কিশোরীরা প্রতিনিয়ত যে সব ঝুঁকি যেমন, পাচার, নির্যাতন – মেয়েদের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ - মুখোমুখি হয়, সেগুলো মোকাবিলা করার জন্য তাদের যে সব দক্ষতা প্রয়োজন সেগুলো তৈরিতে সহায়তা করা। আরো বৃহৎ অর্থে, আমরা এই প্রজন্মের তরুণদের তাদের নিজেদের পরিচয় তৈরিতে সহায়তা করছি এবং যে কঠিন চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে তারা যাচ্ছে সেটার সমাধানের অংশ হিসাবে তাদেরকে গড়ে তুলছি।’

ইউনিসেফ জানিয়েছে, ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্বে মানবিক সংস্থাগুলো স্বাস্থ্য, পুষ্টি, পানি ও পয়ঃনিষ্কাষণ, শিক্ষা, সুরক্ষা এবং অন্যান্য মৌলিক সেবাসমূহকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি সাধন করেছে। উদাহরণ হিসেবে- চব্বিশ ঘণ্টা গর্ভবতী মা ও শিশুদের নিয়মিত চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রে স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা এবং পাইপযুক্ত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কলতলাগুলোতে ক্লোরিনযুক্ত পানির বিস্তৃত ব্যবস্থা করা। ডাইরিয়া এবং পানিবাহিত রোগ এখনো একটি হুমকি, কিন্তু শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির হার হ্রাস পেয়েছে।


আরো সংবাদ