২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

লবনের গাড়িতে সাড়ে সাত কোটি টাকার ইয়াবা

লবনের গাড়িতে সাড়ে সাত কোটি টাকার ইয়াবা - সংগৃহীত

লবন বোঝাই কভার্ড ভ্যানে মিললো সাড়ে সাত কোটি টাকার ইয়াবা। গত মঙ্গলবার মধ্যেরাতে লবন বোঝাই কাভার্ড ভ্যান থেকে ১ লাখ ৯৬ হাজার পিস এবং ট্রাকের অতিরিক্ত চাকার ভেতর থেকে ১০ হাজার পিস ইয়াবাসহ মোট ২ লাখ ছয় হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে র‌্যাব। জব্দকৃত ওই ইয়াবার আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় সাত কোটি ২১ লাখ টাকা।

এ সময় কাভার্ড ভ্যানের চালক মানিক মিয়া ও হেলপার আরিফ এবং ট্রাকের চালক মাসুম মিয়া ও হেলপার আব্দুল খালেককে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-১। এ চক্রেটির পরিবহন সেক্টরে বেশ কিছু সিন্ডিকেট রয়েছে। নিজেদের পেশার আড়ালে গোপনে মাদক কারবারীর সাথে জড়িত তারা। কক্সবাজারের স্থানীয় কিছু দালাল ও মাদক ডিলারদের যোগসাজশে পণ্যবাহী পরিবহনের চালক ও সহকারীদের মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ঢাকার পাচার করা হচ্ছে ইয়াবা। এই চক্রের নিয়ন্ত্রণাকারী টেকনাফের রফিক দালাল এবং ব্যবস্থাপনার সার্বিক দায়িত্বে রয়েছে চালক মাসুম বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

বুধবার দুপুরে কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের অইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান বলেন, মঙ্গলবার রাতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের পূর্বাঞ্চল এলাকায় অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেফতার ও ইয়াবা জব্দ করা হয়। এ সময় ইয়াবা সরবরাহ করার কাভার্ড ভ্যান (ঢাকা মেট্রো-ট-২২-২৯২৭) ও ট্রাক ( ঢাকা মেট্রো-ট-২২-০২৮০) জব্দ করা হয়।
তিনি বলেন, ইয়াবাগুলো সমুদ্র পথে মিয়ানমার থেকে মহেশখালী হয়ে চকরিয়ার একটি সিন্ডিকেট দ্বারা নিয়ে আসা হয়েছিল। ট্রাক চালক মাসুম ইয়াবা গুলো চকরিয়ার সিন্ডিকেট হতে গ্রহণ করে। ইয়াবা সংরক্ষণ শেষে প্রথমে ট্রাক নিয়ে মাসুম ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়, এর তিন চার ঘণ্টা পর মানিক কাভার্ড ভ্যান নিয়ে এগুতে থাকে। পরিকল্পনা ছিল সামনের ট্রাক ধরা পড়লেও পেছনের কাভার্ড ভ্যানে রক্ষিত বড় চালানটি যেন রক্ষা পায়।

তিনি আরও বলেন, গ্রেফতার চারজনই গাড়ি চালাতে জানলেও তাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক লাইসেন্স নেই। এ চক্রটির সদস্য ১৫ থেকে ২০ জন। তারা পরিবহন চালানোর ছদ্মবেশে মাদকের ব্যবসা করত। গত ১ বছর ধরে গ্রেফতারকৃতরা এ চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এর আগে তারা আটটি চালান পাচার করে। এ চক্রটি নিয়ন্ত্রণ করে টেকনাফের দালাল রফিক।

মুফতি মাহমিদ বলেন, গত ২৫ জুলাই টেকনাফে র‌্যাবের অতিরিক্ত পাঁচটি ক্যাম্প স্থাপনের ফলে মিয়ানমার থেকে টেকনাফ হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ইয়াবা সরবরাহ দুরুহ হয়ে উঠে। ফলে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা নিত্য নতুন রাস্তা ইয়াবা সরবরাহ করার পরিকল্পনা করে। ফলে ইয়াবা চালানকারীরা সমুদ্রপথে মহেশখালী হয়ে চকোরিয়া দিয়ে ইয়াবা চালানের নতুন রুট তৈরি করে।

এক প্রশ্নের জবাবে মুফতি মাহমুদ বলেন, ইয়াবা চালান ল্যান্ডরুটে অনেকটা কন্ট্রোল হলেও সীরুটে তা হয়নি। সেখানে হাজার হাজার ট্রলার রয়েছে, ওখানকার কারবারীদের ক্ষেত্রে সমুদ্র অনুকূল প্রতিকূল বলে কিছু নেই। তবে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের ব্যাপারে সোচ্চার রয়েছে। মাদকের গডফাদারদের ধরতে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

গ্রেফতারকৃতরা জানান, পরিবহন সেক্টরে এ ধরনের আরও বেশকিছু সিন্ডিকেট রয়েছে। কক্সবাজারের স্থানীয় কিছু দালাল মাদক ডিলারদের যোগসাজশে পণ্যবাহী পরিবহনের চালক ও সহকারীদের মোটা অঙ্কের টাকার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের গাড়িতে ইয়াবা রাখার জন্য প্রলুব্ধ করে।

আরো পড়ুন: পরিবহন শ্রমিকদের জন্য অবাধ ‘নেশা’
আবু সালেহ আকন (০৬ আগস্ট ২০১৮, ০৭:৪৬)
বঙ্গভবন পার্কের পাশের রাস্তায় সারিবদ্ধ গাড়িগুলো দেখলে যে কেউ মনে করবেন মিনি টার্মিনাল। গাড়িগুলো লাইন দিয়ে রাস্তার পাশে রাখা। রাত ৯টার পরে ওই রাস্তা দিয়ে চলাচলের সময় কেউ গাঁজার গন্ধ পাবেন। কখনো গাড়িগুলোর ভেতর থেকে, আবার কখনো পার্কের ভেতর থেকে বের হওয়া এ গন্ধ যেকোনো পথচারীর অস্বস্তির কারণ হয়ে ওঠে। অনেকে প্রকাশ্যেই গালাগাল করেন গাঁজাখোরদের। এখানে আরো অনেক নেশা চলে। নেশাখোরদের বেশির ভাগই পরিবহন শ্রমিক। পার্কিং করে কখনো গাড়ির ভেতরে; আবার কেউ পার্কে ঢুকে গাঁজা সেবন করে। এই নেশাখোররাই আবার গাড়ি চালায়।

সম্প্রতি একটি গাড়িতে করে শ্রীনগর থেকে ঢাকায় আসছিলেন শামীম, আলাউদ্দিনসহ কয়েকজন। তাদের গাড়িটি কেরানীগঞ্জের দিকে ঢুকতে একটি গর্তে ফেলে দেয় চালক। এ সময় গাড়ির অনেক যাত্রীই কমবেশি আহত হন। চালকের কাছে যখন যাত্রীরা জানতে চান তখন চালাক বলেন, মনে হচ্ছিল গর্তটা পার হয়ে যেতে পারব। কিন্তু পেছনের চাকা আটকে গেছে। যাত্রীদের অনেকেই বলেছেন, নেশাগ্রস্ত না হলে চালকের ওই বিষয়টি মনে হওয়ার কথা নয়।

সম্প্রতি ঢাকার মহানগর নাট্যমঞ্চে পরিবহন মালিক, শ্রমিক এবং ঢাকা মহানগর মেট্রোপলিটন পুলিশের একটি যৌথ সভা হয়। সেখানে বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি পরিবহন শ্রমিকদের মাদক গ্রহণের বিষয়টি উঠে আসে। শ্রমিকদের মাদকাসক্তের বিষয়টি তুলে ধরেন সেখানে পরিবহন মালিক নেতা খন্দকার এনায়েত উল্লাহ। ওই মিটিংয়ে পরিবহন মালিক সমিতির সেক্রেটারি খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, ঢাকায় প্রায় ৫০ হাজার পরিবহন শ্রমিক রয়েছে, যার ৫০ শতাংশই মাদকাসক্ত। মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের এক ঊর্ধŸতন কর্মকর্তা বলেছেন, ইয়াবা সেবন করলে তা তাৎক্ষণিক পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। অ্যালকোহল সেবন করলে তা পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব। কিন্তু ইয়াবা সেবন করলে তা পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না। ফলে পরিবহন শ্রমিকেরা এখন নির্বিঘেœ ইয়াবা সেবন করে গাড়ি চালান।

রাজধানীর মতিঝিলের টিঅ্যান্ডটি কাঁচা বাজারের রাস্তায় মতলব এক্সপ্রেস, এয়ার এশিয়ানসহ বিভিন্ন পরিবহনের গাড়ি লাইন ধরে পার্কিং করা থাকে। বিআরটিসিরও বেশকিছু গাড়ি কমলাপুর কাউন্টারের আশপাশে রাখা থাকে। পাশে ব্যাংক কলোনির একাধিক বাসিন্দা জানান, পার্কিং করা এ গাড়িগুলোর ভেতর ও বাইরে মাদকাসক্তদের ভিড় জমে যায় সন্ধ্যার পরে। তখন সাধারণ মানুষের হাঁটা দায় হয়ে ওঠে।

বিপ্লবী সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আলী রেজা নয়া দিগন্তকে বলেন, মাদকের ব্যবহার সর্বত্রই বেড়েছে। সেই সাথে পরিবহন সেক্টরের শ্রমিকদের মধ্যেও বাড়বে- এটাই স্বাভাবিক। তিনি বলেন, পরিবহন শ্রমিকদের হাতে নগদ অর্থ থাকে। শ্রমিকদের কেউ কেউ মাদকের পেছনেই এ অর্থ ব্যয় করেন। অনেক শ্রমিক রয়েছে যারা মাদক আনা-নেয়ার সাথেও জড়িত। এরূপ অন্তত ৫০ শ্রমিক রয়েছে যারা এখন মাদক মামলায় জেলে। 
আলী রেজা আরো বলেন, অনেক মালিক আছেন যারা ইয়াবা ক্যারির জন্য চালকদের ব্যবহার করে থাকেন। ওইসব মালিক রাতারাতি বড়লোক হয়ে গেছেন। এ নিয়ে মালিকপক্ষের সাথে একবার বৈঠকে বসেছিল কিন্তু বৈঠকটি শেষ পর্যন্ত হয়নি।

পুলিশের একাধিক সদস্য বলেছেন, প্রায়ই পরিবহন শ্রমিকদের নেশা করার অপরাধে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই ছাড়া পেয়ে যায়। নেশা করে একপর্যায়ে তারা বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তার পরেও তারা গাড়ি চালায়। এ ক্ষেত্রে মালিকেরাও দোষী বলে দাবি করেন ওই কর্মকর্তারা।

 


আরো সংবাদ