১৪ ডিসেম্বর ২০১৯

আমি হতবাক

-

পুঞ্চ নদীর তীরে অবস্থিত এই গ্রামের নাম মাদারপুর। হাজিরা থেকে তিতরি নোট ক্রসিং পয়েন্টের দিকে যেতে নিয়ন্ত্রণ রেখার সন্নিকটে অবস্থিত এ গ্রামের অধিবাসীরা কয়েক দিন ধরে নিজেদের ঘরে বন্দী। কেননা ভারতীয় বাহিনী এ গ্রামের মানুষদের একের পর এক লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে যাচ্ছে। এ অঞ্চলে বেশি উঁচু পাহাড় নেই। ছোট ছোট পাহাড়ের চূড়ায় সে বাহিনীর মোর্চা রয়েছে। পক্ষান্তরে, মাদারপুর রয়েছে উপত্যকার নিচে। ভারতীয় বাহিনী বেশির ভাগ সময় গ্রামবাসীর মুরগি ও ছাগলকেই টার্গেট বানাত; কিন্তু গত ৫ আগস্টের পর থেকে তারা মানুষকে টার্গেট বানাচ্ছে। এ গ্রামের কাছাকাছি গাছের আড়ালে এলাকার এক প্রবীণ ব্যক্তি আমাকে বললেন, আমরা ১৯৪৭ সালে নিজেদের বাহুর জোরে পুঞ্চের এ এলাকাকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলাম।

আমরা শ্রীনগরের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম; কিন্তু ভারতের ধোঁকাবাজ প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত নেহরু জাতিসঙ্ঘে পৌঁছে যান এবং অস্ত্রবিরতি করান। এই অস্ত্রবিরতি রেখা পরবর্তী সময়ে আয়ে ‘নিয়ন্ত্রণ রেখা’ হয়ে যায়। আর ভারত ওই রেখাকে স্বতন্ত্র সীমান্ত বানাতে চাচ্ছে। কিন্তু আমরা কাশ্মিরের ভাগ মানব না। আমরা খুব দ্রুত নিয়ন্ত্রণ রেখাকে মুছে ফেলব। কাছে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকরা তাদের ওই প্রবীণ ব্যক্তির কথাগুলো সমর্থন করে বলল, আমাদের ওপর প্রতিদিন গুলিবর্ষণের উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে আমাদের এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়া। কিন্তু আমরা ঘর-গেরস্তি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে নিয়ন্ত্রণ রেখা অতিক্রম করার চেষ্টা করব। প্রবীণ ব্যক্তিটি বললেন, তাত্তা পানির সন্নিকটে দাররা শের খান গ্রামে ভারতীয় বাহিনী বিয়ের এক অনুষ্ঠানে গুলি বর্ষণ করেছে।

আমার এক পুরনো বন্ধু লাল মুহাম্মদ শহীদ হয়ে গেছেন, যার বয়স ছিল আশি বছরের বেশি। বিশ্ব কি দেখতে পাচ্ছে না, বিয়ের অনুষ্ঠানেও হামলা করছে? এ কথা শুনে বললাম, দাররা শের খান কত দূরে? প্রবীণ ব্যক্তিটি বললেন, কমপক্ষে এক ঘণ্টা ড্রাইভ করতে হবে। কিন্তু ওখানে পৌঁছাও কঠিন। কেননা ওই গ্রামের লোকেরাও মাদারপুরবাসীর মতো গৃহবন্দী হয়ে আছেন। যেই ঘর থেকে বের হচ্ছে, ভারতীয় বাহিনী তার ওপরই গুলি বর্ষণ করে। প্রবীণ ব্যক্তিটি বললেন, দাররা শের খানের নিকটবর্তী সাহরাতে ভারতীয় বাহিনী একটি গার্লস কলেজ ও ছোট হাসপাতালে গুলিবর্ষণ করেছে। আপনি ওখানে চলে যান। আমি সাহরার পথ জেনে নিলাম। বিদায় নিতেই প্রবীণ ব্যক্তিটি জানতে চাইলেন, এটা কি সত্য যে, নরেন্দ্র মোদিকে আরব আমিরাতের সবচেয়ে বড় পুরস্কার দেয়া হবে? আমি হ্যাঁ-সূচক মাথা দোলালে, তিনি বললেন, আমরা এই পুরস্কারের কথা কখনো ভুলব না। আমরা যখন লাশ ওঠাচ্ছি, তখন তাকে পুরস্কার দেয়া হচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর আমি পুঞ্চ নদী তীর ঘেষে রওয়ানা দিলাম। একটি ছোট সেতু পার হয়ে সাহরা পৌঁছলে দাররা শের খানের আশি বছর বয়সী লাল মুহাম্মদের পরিবারের লোকজনের সাথে সাক্ষাৎ হলো, যারা কিছু আহত শিশুকে চিকিৎসার জন্য সাহরা নিয়ে এসেছেন। এ সব ছোট ছোট শিশু ঘরের কাছে গোলা বিস্ফোরণে আহত হয়েছে। আর যে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে তাদেরকে চিকিৎসার জন্য আনা হয়েছে, এক দিন আগে এর ওপরও গোলা বর্ষণ করা হয়েছে। ওই শিশুদের বাবা আমাকে বললেন, অধিকৃত কাশ্মিরের মানুষও নিজেদের ঘরে বন্দী, আর আমরাও আমাদের ঘরে বন্দী। তারাও লাশ ওঠাচ্ছে, আমরাও লাশ ওঠাচ্ছি। তাদের শিশুরাও স্কুলে যাচ্ছে না, আমাদের শিশুদের স্কুলও বন্ধ। নিয়ন্ত্রণ রেখার আশপাশে শুধু স্কুল-কলেজ নয়, বেশির ভাগ ব্যবসায়কেন্দ্রও বন্ধ। তবে আমরা এখান থেকে পালাব না; লড়াই করব।

একটু ভিড় জমে গেল। এক সুদর্শন যুবক আমাকে লক্ষ্য করে বলল, একটা কথা বলার ছিল। সাহরা সরকারি গার্লস কলেজে পৌঁছার জন্য তাড়াহুড়া করছিলাম, যেখানে ভারতীয় বাহিনী গোলা বর্ষণ করেছিল। আমি মুচকি হেসে যুবককে বললাম, আমার তাড়া আছে। সে আমার সাথে সাথে চলতে থাকে। সে বলল, আপনি কি ইরানের রাহবার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বক্তব্য পড়েছেন, যিনি এ জটিল সময়ে আমাদের কাশ্মিরিদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন? আমি বললাম, হ্যাঁ, তার টুইটে তো ভারতীয় মিডিয়াতে বেশ মাতম চলছে। যুবক বলল, আমাদের খুনি মোদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে পুরস্কার দেয়া হচ্ছে, পাকিস্তান সরকার কি আমাদের হিতাকাক্সক্ষী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় নাগরিক সম্মাননা প্রদান করবে? এ কথা শুনে হঠাৎ থেমে গেলাম। গভীর দৃষ্টিতে ওই যুবকের দিকে তাকালাম। তার চোখ দিয়ে আগুন বের হচ্ছিল। নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলাম, এ প্রশ্নের উত্তর কী? জবাব খুঁজে পেলাম না। ওই যুবকের সাথে কোনো ভুল আলোচনা করতে চাচ্ছিলাম না। আমি নীরবে সামনে এগিয়ে চললাম।

সাহরা গার্লস কলেজে বোমাবর্ষণের দৃশ্য দেখে আমি স্থানীয় লোকদের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে নিজের গাড়িতে বসলাম। আমার ইসলামাবাদ পৌঁছার তাড়া ছিল, যাতে নিয়ন্ত্রণরেখার সুরতহাল জিও নিউজের মাধ্যমে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে পারি। গাড়িতে বসামাত্রই আলী খামেনির ব্যাপারে জানতে চাওয়া কাশ্মিরি যুবক আবার সামনে এসে দাঁড়াল। বলল, ঠিক আছে, খামেনি নয়, আমাদের বোন নাজশাহকে পুরস্কার প্রদান করুন, যে মোদিকে পুরস্কারদাতাদের একটা প্রতিবাদী পত্র লিখেছে। ওই যুবককে বললাম, আমার ক্ষমতার মধ্যে থাকলে, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও নাজশাহ উভয়কে পুরস্কার দিতাম।

বিশ্বাস করুন, ওই যুবক আমাকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। হতবাক করে দিয়েছে। আমি কোটলি হয়ে ইসলামাবাদ ফেরার পথে তোফাইল হুশিয়ারপুরির ব্যাপারে ভাবছিলাম। তার একটি চিরবসন্ত সঙ্গীত আজো কাশ্মিরিদের মুখে মুখে গীত হয়- আয় মরদে মুজাহিদ জাগ যারা, আব ওয়াকতে শাহাদত হ্যায় আয়া- হে মর্দে মুজাহিদ, একটু জাগো, শাহাদতের সময় এসেছে। সারা বিশ্বের কাশ্মিরিরা নিজেদের কিছু ভাইয়ের হাতে নিজেদের খুনিকে সম্মাননা প্রদানে বেশ কষ্ট পেয়েছে। কাশ্মিরিরা আগেও জীবন দিয়েছে, আগামীতেও জীবন দেবে; কিন্তু তাদের জিজ্ঞাসা, যখন তারা লাশ ওঠাচ্ছে, তখন তাদের পক্ষে সোচ্চার হওয়া আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ওই ধরনের পুরস্কার কি প্রদান করা হবে, যেমনভাবে তাদের মুসলিম ভাইয়েরা মোদিকে প্রদান করেছে?

লেখক : পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট, প্রেসিডেন্ট জি নিউজ নেটওয়ার্ক (জিএনএন)

পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং থেকে ভাষান্তর  ইমতিয়াজ বিন মাহতাব


আরো সংবাদ

দুই মন্ত্রীর ভারত সফর বাতিল নিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকার বিশ্লেষণ (১২৩৬৫)দৃশ্যমান হচ্ছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ক্রিকেট স্টেডিয়ামের (১১৭৫৭)আসাম রণক্ষেত্র, নিহত ৫, আক্রান্ত নেতা-মন্ত্রীর বাড়ি (১১৪২২)গৌহাটিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের গাড়িবহরে হামলা (১০২৯৩)সানিয়ার বোনকে বিয়ে করলেন আজহারের ছেলে (১০২০৩)ভারত সফর বাতিল করেছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী! (৯৮০৯)বিজিবির হাতে আটক হওয়ার পর যা বললেন ভারতের নাগরিক ক্ষিতিশ (৮১১৯)দৈনিক সংগ্রাম কার্যালয়ে হামলা, সম্পাদক পুলিশ হেফাজতে (৭৭৫৩)পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরও বাতিল (৭১৬৬)ব্যতিক্রমী সেঞ্চুরি করলেন বুমবুম আফ্রিদি (৭০২১)



hacklink Paykwik Paykasa
Paykwik