০৯ ডিসেম্বর ২০১৯

মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী

মওলানা ভাসানী - ছবি : সংগ্রহ

মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১৮৮০ সালের ১২ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলার সয়াধানগড়া গ্রামের এক বনেদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার ডাকনাম চেগা মিয়া। পাঁচ বছর বয়সে মক্তবে ওস্তাদের কাছে পড়ালেখায় হাতেখড়ি। মাত্র ছয় বছর বয়সে তিনি পিতৃহীন হন এবং ১২ বছর বয়সে মা মারা যান। পিতৃস্নেহ বঞ্চিত হওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে তার দুই ভাই ও এক বোনও মারা যান। ভাসানী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তেমন পাননি। ওস্তাদের কাছে মক্তবের পাঠ সমাপ্ত করেন এবং নিজ প্রচেষ্টায় উর্দু, ফার্সি, হিন্দি, অসমিয়া, আরবি ও ইংরেজি ভাষা শিখেছিলেন। তার শিক্ষা ও জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা পারিপার্শ্বিক পরিবেশ ও আল্লাহ তায়ালার অশেষ রহমতের মাধ্যমে গড়ে ওঠে।

বাবা বেঁচে থাকতেই ময়মনসিংহের কল্পাগ্রামে ভাসানীকে পাঠানো হয়েছিল পীর সৈয়দ নাসিরউদ্দিন বোগদাদীর কাছে। পরবর্তী সময়ে তিনি পীর বোগদাদীর সংস্পর্শে জীবনের দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেন। ১৯০৬ সালে বোগদাদীর মুসাফিরখানায় হক্কুল্লাহ ও হক্কুল এবাদ মিশনের কাজ জোরেশোরে চলছিল। মওলানা ভাসানী ছিলেন তার একজন যোগ্য সাগরেদ। পীর বোগদাদী বড় হুজুর এবং ভাসানী ছোট হুজুর হিসেবে পরিচিত হন। তখন থেকে তিনি তালের আঁশের টুপি ব্যবহার করা শুরু করেন।

মওলানা ১৯০৮ সালে আসাম মুসলিম লীগের সভাপতি; ১৯১৫ সালে তিনি আসাম আঞ্জুমান ওলামার সভাপতি এবং ১৯১৬ সালে আসাম কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯১৯ সালে তিনি বৃহত্তর রাজনৈতিক অঙ্গনে পা বাড়লেন। তখন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, মাওলানা আজাদ সুবহানী ও মাওলানা আবুল কালাম আজাদের সংস্পর্শে আসেন।

মওলানা জমিদার প্রথাবিরোধী সংগ্রামে সাধারণ মানুষের সাহসী নেতৃত্ব প্রদান করেছিলেন। টাঙ্গাইলের কাগমারীতে শিক্ষকতা জীবন থেকেই এ আন্দোলন শুরু করেছিলেন। ২৪ বছরের তরুণ মওলানা আসামে গিয়ে উঠলেন। সেখানে বাস্তুহারা বাঙালি জনগোষ্ঠী তাকে নেতা হিসেবে গ্রহণ করে। ব্রিটিশ সরকার ঘোষিত কুখ্যাত ‘লাইন প্রথার’ বিরুদ্ধে তিনি আন্দোলন শুরু করেন বাঙালিদের স্বার্থে। ১৯৩১ সালের এই সময়ে তিনি ব্রহ্মপুত্রের ভাসানচরে বসবাস করতেন। সেখানে সাধারণ মানুষকে অসামান্য নেতৃত্ব প্রদানের মাধ্যমে জনগণের দ্বারা ‘ভাসানী’ উপাধিতে ভূষিত হন।

১৯৩৭ সালে বন্যাপ্লাবিত টাঙ্গাইলে মওলানা ভাসানী এলেন ত্রাণসামগ্রী নিয়ে। আস্তানা স্থাপন করলেন কাগমারীতে। শুরু হলো নতুন সংগ্রাম। জনগণের পক্ষ থেকে দাবি তুললেন সন্তোষের জমিদারি উচ্ছেদের। কাগমারীতে হজরত শাহজামানের মাজারে মসজিদ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলেন তিনি। কিন্তু জমিদারদের চক্রান্তে এবং সরকারের আদেশে তিনি বহিষ্কৃত হয়ে আসাম চলে যেতে বাধ্য হন। ৩৫ বছর বয়সে বগুড়ার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের মেয়ে আলেমা খাতুনকে তার পীরের নির্দেশে বিয়ে করেন।

বীরনগরের প্রতাপশালী জমিদারের কন্যা আলেমা খাতুন মওলানা ভাসানীর মৃত্যুশয্যা অবধি তার পাশেই ছিলেন। এ ছাড়া আরো দু’বার দ্বার পরিগ্রহ করেছেন তিনি।
আসামের ১৩ বছরের প্রবাস জীবনে আট বছরই কারাগারে কেটেছে ভাসানীর।

বাঙালিদের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি আসাম আইনসভার সদস্য ছিলেন ১১ বছর। ১৯৪৬ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে টাঙ্গাইল মহকুমায় মওলানা ভাসানী নিখিল ভারত মুসলিম লীগের পক্ষে যে গণ-আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, তার ফলে মুসলিম লীগের পক্ষে বিপুল ভোট পড়ে। ১৯৪৮ সালে আসামের কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে তিনি পূর্ব বাংলায় চলে আসেন। সন্তোষের মাটিতে স্থাপন করেন তার তৎপরতার কেন্দ্র।
ভাসানী ছিলেন আপসহীন সংগ্রামী নেতা। তাই ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের গণবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে ভূমিকা গ্রহণ করেন। সময়োপযোগী ও অগ্রগামী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার মতো দূরদর্শিতার জন্য জাতীয় নেতা হিসেবে তিনি মর্যাদা লাভ করেন। ১৯৪৮ সাল থেকেই ভাসানী রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।

১৯৪৯ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ঢাকা সফরে এলে মওলানা ভুখা মিছিলে নেতৃত্ব দেন। ১১ অক্টোবর পুরান ঢাকায় আরমানীটোলা ময়দানের জনসভায় আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের কথা ঘোষণা দিয়ে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করেন। ১৬ অক্টোবর তাকে গ্রেফতার করা হয়। জেলে অনশন ধর্মঘট চলাকালে ১৯৫০ সালে তাকে মুক্তি দেয়া হয়েছিল। ১৯৫৩ সালে শেরেবাংলা ও সোহরাওয়ার্দীর সাথে মিলিত হয়ে ‘যুক্তফ্রন্ট’ গঠন করেন নির্বাচন উপলক্ষে। এরপর প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়ী হয়।

১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি কেটে দেয়া নিয়ে অন্যান্য নেতার সাথে মওলানার মতবিরোধ ঘটেছিল। এ বছরই তিনি কৃষক সমিতি গঠন করেন। ১৯৫৭ সালে ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের উদ্দেশে ‘আসসালামু আলাইকুম’ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দান করেন সংগ্রামী ভাসানী। ১৯৫৭ সালেই আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপ গঠন করেন। ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে প্রধান সেনাপতি জেনারেল আইয়ুব খান দেশের ক্ষমতা দখল এবং ভাসানীকে অন্তরীণ করেন।

মওলানা ভাসানী ১৯৬৪ সালে সর্বজনীন ভোটাধিকার প্রদানের আহ্বান জানান। গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে সমগ্র প্রদেশে প্রতিবাদ দিবস পালিত হলো। ভাসানী ছিলেন এর অন্যতম আহ্বায়ক। ১৯৬৫ সালের শুরুতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী ফাতেমা জিন্নাহকে সমর্থন দান করেন। সে বছর পাক-ভারত যুদ্ধে তৎকালীন পাকিস্তানের একতা ও সংহতির প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেছেন।

১৯৬৮ সালে শেষ দিকে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনকে মওলানা ভাসানীই গণ-আন্দোলনে পরিণত করেছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ সালে হয় গণ-অভ্যুত্থান। আইয়ুব গদি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন মওলানা নেতৃত্বে জনগণের আপসহীন আন্দোলনের প্রচণ্ড চাপে।

১৯৭০ সালে ভাসানী পশ্চিম পাকিস্তান সফর করেন। ’৭০ সালের ১২ নভেম্বরের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠীর বিমাতাসুলভ আচরণের নিন্দা জানান তিনি। ৪ ডিসেম্বর ভাসানী পল্টন ময়দানে বিরাট জনসভায় প্রকাশ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন। ১৯৭১ সালের ৯, ১০, ১১ ও ১২ মার্চ মোমেনশাহী, খুলনা ও রাজশাহীর বিশাল জনসভায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন এবং পাকিস্তানি শাসকদের উদ্দেশে ঘোষণা করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বার্তা।
ব্রিটিশ আমলে অনুন্নত ও পশ্চাৎপদ আসামে মওলানা ৩৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। বগুড়ায় হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ, জয়পুরহাটে পাঁচবিবি উচ্চবিদ্যালয়, রংপুরে একটি উচ্চবিদ্যালয় ও টাঙ্গাইলে বিন্নাফৈর হাইস্কুল ও মওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজ এবং তার জীবনের শেষ সৃষ্টি সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। স্কুল-কলেজসহ ১১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত। শিক্ষা লাভ করা নর-নারীর জন্য ফরজ। মহানবী সা:-এর এই শাশ্বত বাণী সারাজীবন মনেপ্রাণে গ্রহণ করেছেন ভাসানী।

বহু নেতাকে দেখা যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ পেলে জীবদ্দশাতেই নিজের নামে, পিতা বা মাতার নামে বা কোনো আপনজনের নামে এর নামকরণ করে থাকেন। মওলানা ভাসানী নিজের বা আপনজনের নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করেননি।

১৯৮৭ সালের একদিন কলেজের কয়েকজন সহকর্মী শিক্ষক নিয়ে গেলাম তৎকালীন বিএনপি নেতা ও সাবেক মন্ত্রী আবদুর রহমানের বাসায়। দীর্ঘক্ষণ আলাপচারিতার মাঝে তিনি বললেন, টাঙ্গাইলের মওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজের সরকারীকরণের ব্যাপারে মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান এসেছিলেন হুজুর ভাসানীর বাসায়। আমার সামনেই তাদের আলোচনা হচ্ছিল। হুজুর তখন বললেন, মুজিব, আমার এ প্রতিষ্ঠানটি সরকারি করে দাও। মুজিব হেসে বললেন, ‘হুজুর! প্রতিষ্ঠানটি কেন এক অবাঙালি নেতার নামে করেছেন? বরং এটা আপনার নামে করে দেই, কী বলেন?’ এ কথা শুনে মওলানা রাগ করে ডান হাতের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বললেন, ‘আমি মওলানা মোহাম্মদ আলীর পশমের সমানও হবো না। তার সাথে তুমি আমাকে তুলনা করছো?’ এ জবাব পেয়ে শেখ সাহেব চুপ করে রইলেন। পরে হুজুরের কথামতো কাজ করলেন। এই ছিল মওলানা ভাসানীর আদর্শ।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে মওলানা ভাসানী ভারতে চলে যান এবং একপর্যায়ে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলীর সভাপতির পদ গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭২ সালের ২ এপ্রিল ঢাকায় পল্টনের জনসভায় চোরাচালানের বিরুদ্ধে আপসহীন মনোভাব ব্যক্ত করেন। এ সময় সৈয়দ ইরফানুল বারীর সম্পাদনায় সাপ্তাহিক ‘হক কথা’ পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন, যা ছিল জনপ্রিয়। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের মানুষের দরদি বন্ধু আপসহীন মওলানা ভাসানী অনশন ধর্মঘট শুরু করেন সরকারের দায়িত্বহীনতা এবং দেশে আইনশৃঙ্খলাহীনতা ও দুর্ভিক্ষের প্রতিবাদে। তখন আন্দোলন করতে গেলে তাকে গৃহবন্দী করা হয়। চীন, মিসর, আমেরিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ভাসানী সফর করেছিলেন। মাও সে তুং, চৌ এন লাই, নাসেরসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নেতার সাথে ছিল তার পরিচয় ও বন্ধুত্ব।

১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাসে ভারত কর্তৃক গঙ্গা নদীর পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার এবং মরণ ফাঁদ ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের প্রতিবাদে অশীতিপর এই নেতা সে বছর ১৬ মে ঐতিহাসিক ফারাক্কা মিছিলের নেতৃত্ব দান করে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।

১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর ৯৬ বছর বয়সে এই সংগ্রামী মহান পুরুষ বাংলার মানুষের নয়নমণি, মজলুম জনতার কণ্ঠস্বর মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ইন্তেকাল করেন। টাঙ্গাইলের সন্তোষে তাকে দাফন করা হয়।


আরো সংবাদ




Paykwik Paykasa
Paykwik