০৭ ডিসেম্বর ২০১৯
আজ বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস

সচেতনতার হোক জয়

-

প্রাচীনকাল থেকে ‘মধুমেহ’ নামে শরীরের যে উপসর্গ, সেটিই হাল আমলের বিশ্বব্যাপী মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টিকারী ‘ডায়াবেটিস’ বা বহুমূত্র। স্বভাবতই মূত্র বেশি হলে শরীরে পানিশূন্যতা সৃষ্টি হয়। ফলাফল অতি তৃষ্ণা। ডাক্তারি ভাষায় শরীরবৃত্তীয় এ ঘটনাগুলো মেলিটাস, ইনসিপিডাস, এডিএইচ, অ্যান্টিভাইইউরেটিক হরমোনের ক্রিয়াকলাপের ফল ‘ডায়াবেটিস’। দেহযন্ত্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হচ্ছে লিভার বা যকৃৎ। এর নিচের দিকে অগ্ন্যাশয় নামে একটি প্রত্যঙ্গ আছে। ওখান থেকে একধরনের রস নির্গত হয়ে খাবারকে প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে শক্তি উৎপাদন করে। অগ্ন্যাশয় থেকে নিঃসৃত রসের নামে ইনসুলিন। এটি একটি হরমোন। এর সহায়তায় দেহের কোষগুলো রক্ত থেকে শর্করা বা গ্লুকোজ বা চিনিজাতীয় শক্তি শোষণ করে থাকে এবং দেহ চলাচল উপযোগী হয়। সেই অগ্ন্যাশয় যদি যথেষ্ট অগ্নিরস বা ইনসুলিন উৎপন্ন করতে না পারে, রক্তে শর্করা বা চিনির আধিক্য দেখা দেয়।

শরীরে সুনির্দিষ্ট মাত্রার অধিক চিনির উপস্থিতিই ‘ডায়াবেটিস’। এর মূল কারণ অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন। এটির সঠিক মাত্রার নিঃসরণ অনিশ্চিত না করা গেলে ঘটে নানা জটিলতা, তখন দেহের কোষকলার শক্তি কমে আসে এবং অক্সিজেন নিতে অসুবিধা হয়। অক্সিজেনের অভাবে দেহকোষ মরতে থাকে। ফল হয় বিকলাঙ্গতা। ইনসুলিন নিঃসৃত তারতম্যের কারণে ডায়াবেটিসকে দুই ভাগে বিভক্ত করা যায় : ডায়াবেটিস মেলিটাস ও ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস। দুই ডায়াবেটিসের ক্রিয়াকলাপ বিপরীতমুখী। পরেরটির ক্ষেত্রেই কারণ মূত্রাধিক্য। তবে মানবদেহে বিশ্বব্যাপী প্রথমটি বা ডায়াবেটিস মেলিটাসের প্রকোপ অনেক বেশি। চিকিৎসা সহায়তা ও মাত্রানির্ভরতার ওপর ভর করে ডায়াবেটিস মেলিটাসকে দুই ধরনের ভাগ করা হয়েছে। একটি টাইপ-১, অন্যটি টাইপ-২। টাইপ-১ রোগে অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন নিঃসরণকারী কোষগুলো ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে ধীরে ধীরে শরীরে প্রয়োজনীয় মাত্রার ইনসুলিন উৎপাদন কমতে থাকে। রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বাধ্যতামূলকভাবে কৃত্রিম ইনসুলিন ইনজেকশন আকারে শরীরে প্রবাহিত করতে হয়। একে অটোইমিউন বলা হয়। জন্মগত হরমোন তারতম্যের কারণে সাধারণত শিশু ও তরুণদের মধ্যে এই মধুমেহ অধিক হয়। জন্ম থেকে ৩০ বছর বয়সের মধ্যেই তা ধরা পড়ে। টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীরা নিঃসৃত অগ্নিরস যথাযথভাবে শরীরে শোষণ করতে পারে না। তা উদ্বৃত্ত থেকে যায়। ফলে শরীরে সুগারের মাত্রা বেড়ে যায়। প্রাথমিক অবস্থায় কায়িক শ্রম, ব্যায়াম এবং খাদ্যবিধির ওপর নির্ভর করে এটা মোকাবেলা করা যায়। সাধারণত ৪০ বছর বয়সের পর এ বহুমূত্রের আক্রমণ শুরু হয়। তবে স্বল্প ক্ষেত্রে শিশু ও তরুণদেরও হতে পারে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডায়াবেটিস রোগীর ৯০ শতাংশই হলেন টাইপ-২।

এর সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। বিশ্বব্যাপী মানুষের খাদ্যাভ্যাসও যন্ত্রনির্ভর হয়ে গেছে। শ্রম কমে গেছে। ডায়াবেটিসকে উসকে দেয়- এমন খাবার পাওয়া সহজ। মিষ্টি ও মিষ্টিজাতীয় খাবারের দোকানপাটে এখন অলিগলি, ঘাট, ফুটপাথ সয়লাব। এসব কেনার সামর্থ্য বৃদ্ধিও অন্যতম প্রধান কারণ। ডায়াবেটিস রোগের প্রধান উপসর্গ অতিশয় দুর্বলতা, সার্বক্ষণিক ক্ষুধা, অধিক তৃষ্ণা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া ইত্যাদি। ফলে খাবারের প্রতি অধিক আগ্রহ হওয়া স্বাভাবিক। খাদ্য গ্রহণেও চিকিৎসকের নির্দেশনা, সচেতনতা, জীবনধারার পরিবর্তন, নিয়মিত ব্যায়াম- সর্বোপরি এই রোগ সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের শ্রেষ্ঠ উপায়। অনেক দিন ধরে রক্তে শর্করা বা চিনির উপস্থিতি অনিয়ন্ত্রিত বা অতিরিক্ত থাকলে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা সৃষ্টি হয়। হৃৎপিণ্ডের রোগ, মস্তিষ্কের প্রদাহ, স্ট্রোক, কিডনি বিকলতা, চোখের ব্যাধির নানা উপসর্গ, অন্ধত্ব হওয়ার মতো জটিলতা সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক ঘটনা।

সারা বিশ্বে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধি, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, স্থূলতা বৃদ্ধি পাওয়া প্রভৃতি কারণে ডায়াবেটিস আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া এবং উন্নত যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান ডায়াবেটিস রোগীর দিক দিয়ে শীর্ষে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডায়াবেটিসকে ‘বৈশ্বিক মহামারী’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সাবধান করেছে।

এই রোগ সম্পর্কে ১৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের প্রাচীন মিসরীয় লিপিতে উল্লেখ পাওয়া যায়। ভারতীয় আয়ুর্বেদ চিকিৎসকরাও এই রোগটির অস্তিত্ব খুঁজে পান এবং সংস্কৃত ভাষার সাথে মিল রেখে এর নাম দিয়েছিলেন ‘মধুমেহ’। গ্রিক চিকিৎসক অ্যাপোলোনিয়াস খ্রিষ্টপূর্ব ২৩০ অব্দে এই রোগটিকে ‘ডায়াবেটিস’ নামে অভিহিত করেন। ৪০০ সালে ভারতীয় আয়ুর্বেদ চিকিৎসক সুশ্রুত এবং চরক ডায়াবেটিসকে টাইপ-১ ও টাইপ-২ হিসেবে চিকিৎসা শুরু করেছিলেন। ডায়াবেটিস আক্রান্তের দীর্ঘ যাত্রাপথে অধ্যয়ন ও গবেষণায়, নির্ভরশীল চিকিৎসা সূত্র ইনসুলিন আবিষ্কার করেন কানাডীয় দুই বিজ্ঞানী ফ্রেডরিক গ্রান্ট বেনটিং ১৯২১ সালে ও চার্লস বেস্ট ১৯২২ সালে। উভয় বিজ্ঞানীকে ১৯২৩ সালে চিকিৎসা শাস্ত্রে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃত ডায়াবেটিস মহামারী বাংলাদেশকেও বড় ঝাঁকুনি দিচ্ছে। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রায় ৭ শতাংশ সরাসরি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ২০১৮ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের প্রায় ৭.১ মিলিয়ন মানুষ মৃত্যুভীতির, ব্যয়বহুল এই রোগে আক্রান্ত। ‘বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি’ তাদের গবেষণায় দেখিয়েছে, ২০৪৫ সালের মধ্যে এদেশে আক্রান্তের সংখ্যা হবে ১৩.৭ মিলিয়ন। ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিক ফেডারেশন বলছে, যারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে তার ৮০ শতাংশই নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশের মানুষ। তাদের জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসরীতির খুব দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে।

আমাদের দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষই জানেন না, তিনি সারা জীবনের জন্য বয়ে বেড়াচ্ছেন মৃত্যুঝুঁকির ‘ডায়াবেটিস’। যারা জানেন যে, নিজে আক্রান্ত তাদের মধ্যে ৫৭ শতাংশকেই রোগের সঠিক জ্ঞান ও সুচিকিৎসার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। সারা বিশ্বে প্রতি বছর ১০ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করে শুধু ডায়াবেটিস সম্পর্কে অজ্ঞানতার জন্য। বিভিন্ন মাত্রার ডায়াবেটিসের জন্য উপসর্গ মোতাবেক চিকিৎসকরা বিশেষ দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকেন। কায়িক শ্রম, খাদ্য নিয়ন্ত্রণ, জীবনযাত্রার পরিবর্তন, শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবন, পরিমিত সহনীয় মাত্রা খাওয়ার ওষুধ দিয়ে ডায়াবেটিস রোগকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে। অবশ্য সব রোগীর বেলায় তা প্রযোজ্য হয় না। যাদের শরীর যন্ত্র থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইনসুলিন তৈরি হয় না কিংবা কারো ক্ষেত্রে নিঃসরিত ইনসুলিন পর্যাপ্ত থাকলে তা শোষণের সক্ষমতা থাকে না, সে ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও শারীরিক গঠন পর্যালোচনা করে চিকিৎসকরা ইনসুলিনকেই নির্ভরশীল মনে করেন। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজির সর্বাধুনিক গবেষণায় সাশ্রয়ী দামের ও অধিক মানের হিউম্যান ইনসুলিন তৈরি করা হচ্ছে। মানুষের ডিএনএ থেকে ‘জেনেটিক’ সংগ্রহ করে ব্যাকটেরিয়া সংযোজনের মাধ্যমে দ্রুত বংশ বৃদ্ধি করে আধুনিক, কার্যকর ব্যবহার উপযোগী ইনসুলিন বোতলজাত করা হয়। এর নাম হিউম্যান ইনসুলিন।

ইনসুলিন আবিষ্কারের আগে সারা পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষ আক্ষেপ নিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছে।

রোগাক্রান্ত হয়েও নির্ভয়-নির্বিঘ্ন জীবনযাপনের নির্ভরতার প্রতীক ইনসুলিন আবিষ্কারক ফ্রেডরিক বেনটিংয়ের জন্মদিন ১৪ নভেম্বর। তার স্মরণে, বিশ্বজুড়ে ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৯১ সাল থেকে ‘বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ডায়াবেটিস প্রতিরোধের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন জনপ্রিয় করে তোলার লক্ষ্য শতভাগ পূর্ণতা পাক, এই প্রত্যাশায় পালিত হচ্ছে এবারের ‘বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস’।

লেখক : টেকসই উন্নয়ন কর্মী
[email protected]


আরো সংবাদ




Paykwik Paykasa
Paykwik