০৭ ডিসেম্বর ২০১৯

কোনো ব্যক্তিই দেশের চেয়ে বড় নয়

সাদ হারিরি -

লেবাননের ৪৯ বছর বয়সী প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি ‘কোনো ব্যক্তি দেশের চেয়ে বড় নয়’ - এই সত্য কথাটি বলে বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করেছেন। ২০০৫ সালে তার সুপরিচিত বাবা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরি নিহত হওয়ার পর নিয়মতান্ত্রিকভাবে শাসনভার গ্রহণ করে তিনি ২০১৬ সালের ডিসেম্বর থেকে অক্টোবর ২০১৯ পর্যন্ত লেবাননের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন একনাগাড়ে। এর আগেও নভেম্বর ২০০৯ থেকে জুন ২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি এই পদে আসীন ছিলেন। ২০১৯ সালের অক্টোবরে তার এবং তার সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে একটানা প্রায় দুই সপ্তাহ বিক্ষোভের মুখে তিনি ওই উক্তি করে শাসনক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ালেন। দমন-পীড়নের মাধ্যমে শাসনকাল প্রলম্বিত করার অথবা ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার চেষ্টা করেননি। এটি তার দেশপ্রেম ও জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন। তৃতীয় বিশ্বের দেশনায়কদের ক্ষেত্রে এ নজির বর্তমান যুগে বিরল।

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ টাউন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাদ হারিরি বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে ডিগ্রি লাভ করেছেন। ১০ হাজার ৪৫২ বর্গকিলোমিটার আয়তন এবং ৬০.৮২ লাখ জনসংখ্যার লেবাননে প্রধানত তিনটি সম্প্রদায়ের মানুষের বাস- মোট জনসংখ্যার মধ্যে মুসলিম ৫৪ শতাংশ, খ্রিষ্টান ৪০.৪ শতাংশ ও দ্রুজ ৫.৬ শতাংশ। প্রায়ই তারা নিজ সম্প্রদায়ের পতাকা নিয়ে বিক্ষোভে নামেন। এবার নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধি ও কর বৃদ্ধির জেরে সবাই বিক্ষোভে একই সুরে সুর মিলিয়েছেন বিভেদ ভুলে। লক্ষণীয় বিষয় হলো এবারের আন্দোলনে অনেক ক্ষেত্রেই নেতৃত্ব দিচ্ছে খ্রিষ্টানরা। আশির দশকে গৃহযুদ্ধের সময় থেকেই ইসরাইল লেবাননের খ্রিষ্টানদের মদদ ও অস্ত্র জুগিয়ে আসছে। এহেন পরিস্থিতিতে সরকারবিরোধী আন্দোলনে ইসরাইলের কাজ আরো সহজ হলো বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

লেবাননের এ সরকারবিরোধী আন্দোলনকে বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারবিরোধী আন্দোলন ও সরকারের অবস্থানের সাথে মিলিয়ে দেখা যায়। বাংলাদেশের ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশেও লেবাননের মতো একাধিক সম্প্রদায়ের মানুষের বাস- প্রধানত মুসলিম এবং হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান। দেশের মোট ১৬.৪৭ কোটি জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ মুসলমান এবং মুসলিম জনসংখ্যার দিক থেকে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও পাকিস্তানের পরে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ। অপর ১০ শতাংশের মধ্যে ৮.৬ শতাংশ হিন্দু, যা বিশ্বহিন্দু জনসংখ্যার দিক থেকে ভারত ও নেপালের পরে তৃতীয় স্থানে; ০.৫ শতাংশ খ্রিষ্টান এবং অন্যান্য ০.৯ শতাংশ যার মধ্যে আছে বৌদ্ধ, শিখ ইত্যাদি। এই দেশে মুসলমানদের বাইরে অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায় রাজনৈতিকভাবে বেশ সক্রিয় এবং প্রভাবশালী। দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকজনের নেতৃত্বে ‘হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্যপরিষদ’ নামে একটি ‘সাম্প্রদায়িক’ সংগঠন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বেশ শক্তিশালী। দেশের ৯০ শতাংশ মুসলমানও ক্ষেত্রবিশেষে তাদের কাছে হার মানে।

এই শক্তির উৎস খুঁজতে গেলে বাংলাদেশের ১৯৭১-এর ঘটনাপ্রবাহ, ভৌগোলিক অবস্থান ও বর্তমান সরকারের প্রকৃতির দিকে তাকাতে হয়। ভৌগোলিকভাবে প্রধানত হিন্দু অধ্যুষিত বিশাল ভারত বাংলাদেশকে পশ্চিম, উত্তর, পূর্ব (এ পূর্ব-দক্ষিণে অল্প এলাকায় মিয়ানমার সীমান্ত) এই তিন দিক থেকে বেষ্টন করে আছে আর দক্ষিণে আছে বঙ্গোপসাগর। ১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় প্রায় এক কোটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ (প্রধানত হিন্দু) ভারতের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন। তাদের সাথে আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মীও ছিলেন।

এর প্রতিক্রিয়ায় ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১-এর ডিসেম্বরে এক সংক্ষিপ্ত সশস্ত্র যুদ্ধে তদানীন্তন পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটিয়ে তাদের বাংলাদেশে ফেরার সুযোগ করে দেন। এরপর আওয়ামী লীগ শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশে সরকার গঠন করে। আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের নিবিড় সখ্য অনেক পুরনো এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ প্রভাব এখন ব্যাপক। ১৯৭৫ সালে ঘাতকের হাতে শেখ মুজিব নৃশংসভাবে নিহত হওয়ার পর যে দলের বা যে সরকারই (সামরিক বা বেসামরিক) ঢাকায় ক্ষমতাসীন হয়েছে, তাদের প্রত্যেকেই কমবেশি ভারতের প্রভাব বলয়ের ভেতরই ঘুরপাক খেয়েছে। ফলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশাল ভারতের ছায়াতে শক্তি সঞ্চয় করেছে এবং বাংলাদেশের রাজনীতিসহ, নানা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উঠে এসেছে।

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকালে ১৯৭০-এর নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী, আওয়ামী লীগের নেতারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম ভোটারদের এতিমের মতো ক্রুদ্ধ সেনাবাহিনীর হাতে ফেলে ভারতে চলে যায়। সেই সঙ্কটকালে অন্য দলগুলো, যারা ১৯৭০-এর জাতীয় নির্বাচনে একটি আসনও পায়নি, তারা দৃশ্যত পাশে এসে দাঁড়ায়। এটা করতে গিয়ে কোনো কোনো ইসলামী বড় দল স্বাধীনতাপ্রত্যাশী হিন্দুদের প্রতি কিছু বিরূপ আচরণ করেছে। এটি তাদের বড় অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়েছে। কারণ যাই হোক বিচারের দণ্ড সাধারণত বিজয়ীদের হাতেই থাকে। পাকিস্তানপন্থী ভারত ও হিন্দুবিদ্বেষী হিসেবে আখ্যায়িত করে আওয়ামী লীগ কয়েকটি দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ’৭১-এর যুদ্ধকালে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ এনেছে।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে যাবতীয় আন্দোলনের বিরোধিতায় হিন্দু সম্প্রদায়ের বহু নেতা সক্রিয় নেতৃত্ব ও সহযোগিতা দিচ্ছেন। অধিকন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে থেকেই ভারত ও তার মিত্র দেশগুলো আওয়ামী লীগকে মদদ জুগিয়ে এসেছে। এহেন পরিস্থিতিতে সরকারবিরোধী আন্দোলন ভারতের কাজে আসবে না এটা তারা জেনে শুনেই বিরোধিতা করেছে। মনে করা হয়, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে হিন্দুত্ববাদী ভারত এবং বাংলাদেশের অন্তত প্রধান সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নাগরিক হিসেবে প্রাপ্য অধিকারের চেয়ে বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের সাথেও বাংলাদেশের কৌশলগত সম্পর্ক স্বাভাবিক হচ্ছে না।

আওয়ামী লীগ সরকার যেভাবেই ক্ষমতায় আসুক না কেন এবং জনগণের যত অপ্রিয় ও যত দুর্নীতিগ্রস্তই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলা এবং তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত দু-দু’টি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে এ দলের ক্ষমতা দখল পরবর্তী সময়ে এর প্রতিবাদে বিরোধী দলগুলোর ন্যায্য আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার মধ্য দিয়ে তা প্রমাণিত হয়েছে। ২০০৬ সালে দেশের অন্যতম বৃহৎ ও প্রভাবশালী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে অন্যায্য আচরণের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ লগি-বৈঠা নিয়ে প্রচণ্ড আন্দোলন করেছিল। রাজপথে তখন মানুষ খুন করে তাদের দাবি আদায় করা হয়েছে। এবার আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ন্যায্য আন্দোলনে বিএনপি এবং অন্য দলগুলো সরকারের নেতাকর্মী ও বিবিধ বাহিনীর অত্যাচারে রাস্তায় দাঁড়াতেই পারছে না; গণতান্ত্রিক আন্দোলন তো দূরের কথা।

নৈতিক ভিত্তিহীন এ সরকারকে বিগত দু’টি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনকে সংশোধন করে পরিচ্ছন্ন একটি নির্বাচন দিতে বাধ্য করা যাবে বলে মনে হয় না। এটা জেনেই আওয়ামী লীগ নৈতিকতাবিবর্জিত কাজ অবাধে করতে পেরেছে। কেবল আর্থিক অনিয়ম-বিশৃঙ্খলা ও চুরি-ডাকাতিই দুর্নীতি নয়, নিয়ম-নৈতিকতা বিবর্জিত কার্যকলাপও দুর্নীতির আওতায় পড়ে। অনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য সরকার পড়শি দেশকে তেমন কোনো কিছু প্রাপ্তি ব্যতিরেকেই ট্রানজিট দিয়েছে। তিস্তা নদীর পানির হিস্যা আদায়ে ভারতের ওপর চাপ প্রয়োগে বিফল হয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যুসহ বাণিজ্যিক ও পররাষ্ট্রীয় নানা বিষয়ে ভারতকে বহু ছাড় দিয়েছে এবং দিচ্ছে। বিনিময়ে ভারত থেকে ছেলে ভুলানো ‘ঠাকুর শান্তি পুরস্কার’ পাওয়া গেছে। পশ্চিম থেকে অন্যান্য পুরস্কারে ও উপাধিতে ভূষিত হওয়ায় দলে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ইমেজ বৃদ্ধি পেলেও বাস্তবে এটা দেশের কোনো কাজে আসবে কি? পক্ষান্তরে মুসলিম দেশগুলো বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

সরকার ব্যাপক দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে বলে দাবি করছে। দেখা যায়, সরকারদলীয় লোকেরাই ধরা পড়ছে। এতে প্রতীয়মান হয় বিগত প্রায় এক যুগে শাসকদলীয় অতি উচ্চস্তর থেকে নিম্নস্তরের নেতাকর্মীরা দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। দুর্নীতি করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সরকারের আমলে এটি স্বাভাবিক। বিগত দু-দু’টি নির্বাচনে যে অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে তাতে দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের সায় ছিল বলা যায়। দুর্নীতির জোরে ক্ষমতা দখল করে সরকার দেশ, দল ও সরকারের লোকদের দুর্নীতিমুক্ত করবে কী করে? এটা করতে গেলে তো প্রথমে ক্ষমতা ছাড়তে হয়। সেটি হবে বলে মনে হয় না। ছলে বলে কৌশলে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখা হবে। এটা অনুধাবন করা দরকার, নিজেরা শুদ্ধ হওয়ার আগে দেশে বা দলে শুদ্ধি অভিযান চালানো যায় না। ‘আপনি আচরি ধর্ম পরকে শিখাও’। এটি করতে হলে যেকোনো দলকে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসতে এবং দুর্নীতিমুক্ত থাকতে হয়।

নিজ দলের ভেতর যে দুর্নীতিবাজেরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে এবং উঠছে, তা কি হাইকমান্ড জানেন না বা জানতেন না? নেতানেত্রীর নান্দীপাঠ করে করেই তো দুর্নীতিবাজেরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ক্ষমতায় আসার এবং থাকার জন্য তাদের ব্যবহার করা এবং প্রশ্রয় দেয়া হয়েছে। মাথায় পচন ধরলে শরীরের অবশিষ্টাংশ রক্ষা করা যায় না। এ সব দুর্নীতিবাজ স্তবস্তুতি গেয়ে ও তোষামোদ করে ভাসিয়ে দিয়েছে যেন ক্ষমতায় থেকে সেটি উপভোগ করা যায়। তাদের শায়েস্তা বা ত্যাগ করবেন কী করে? সরকার তাদের দমন করতে পারবে বলে মনে হয় না, কারণ তার ক্ষমতার নৈতিক ভিত্তি নেই।

দলের চুনোপুঁটি ও বিরোধীদের আটকে জনগণের আইওয়াশ করতে চাইলে পার পাওয়া যাবে না। বাস্তব অভিজ্ঞতা হলো বিগত দু-দু’টি নির্বাচনে ভোটারদের ভোট দেয়ার প্রয়োজন হয়নি বা তারা ভোট দিতে পারেনি। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মুখ বন্ধ রাখতেই সর্বস্তরে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিতে হয়েছে এবং হচ্ছে। এভাবে এক যুগে প্রায় গোটা সমাজকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে ফেলা হয়েছে। এখন পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে ‘ঠগ বাছতে গাঁ উজাড়;’ কেউ এর ঊর্ধ্বে নন। তবে সমাজ দুর্নীতিমুক্ত হওয়া জরুরি এবং সেই লক্ষ্যে দুর্নীতিমুক্ত জাতীয় নির্বাচনও জরুরি। যদি সত্যিই দুর্নীতিমুক্ত দেশ চান অতি দ্রুত দুর্নীতিমুক্ত জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানই বুদ্ধিমানের কাজ। সরকার বিরোধীদের প্রতি স্বার্থদুষ্ট সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিপনার ধুয়া তুললেই কোনো কাজ হবে না।

লেখক : অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও ভাইস প্রিন্সিপাল, কুমিল্লা মহিলা সরকারি কলেজ


আরো সংবাদ




Paykwik Paykasa
Paykwik