১৪ নভেম্বর ২০১৯

হারিয়ে যেন খুঁজে ফিরি

-

বাবার প্রজন্ম-সময়ের অভিজ্ঞান ছিল সাদামাটা। তাই সাদা পপলিনের হাওয়াই বা নানা রঙের হাফ শার্ট ও পাঞ্জাবি ছিল তার প্রিয় পোশাক। পোশাকই বলত মনের কথা। ভবিষ্যৎকে অতীতের পাটিগণিতে বের করে আনার জ্ঞান সাধারণ বলে বিবেচিত; কিন্তু ওই সব আসাধারণ ও বিরল মানুষদেরই তা আছে। কোনো ছল-চাতুরী ছিল না। পৃথিবী নামক বদ্ধজলায় একে অপরকে ফাঁকি দিয়ে গিলে খেয়ে বাড়তে চাওয়া, ব্যাঙাচিদের টিকে থাকবার লড়াইয়ের মতোই মানুষের জীবন। ভোগ-লালসার লড়াকু ঝাপটা রন্ধ্রে রন্ধ্রে। জীবনকে জীবনের জন্য গড়ছেন, জীবিকার জন্য বা ‘করে খাবার’ জন্য নয়। তাই তার প্রজ্ঞা ছিল সীমাছুট। এখানেই আমার বাবা মরহুম সাংবাদিক হেলাল হুমায়ুনের মতো মানুষরা ভাস্বর। বাবা সাংবাদিকতার সাধনায় নিয়োজিত ছিলেন আগাগোড়া।

এই প্রথম কলম হাতে নিলাম আব্বুকে নিয়ে কিছু লিখব ভেবে। মনে হচ্ছে, শব্দের ভাণ্ডারে ভাটা পড়ে গেছে। বারবার স্মৃতির ক্যানভাসে হারিয়ে যাচ্ছি। লিখতে বসেছি, তখন খেয়াল করলাম দু’চোখে অশ্রু ঝরে পড়ছে। চোখ মুছতে মুছতে ভাবলাম, সব সন্তানেরই বুঝি এমনটা হয় যখন সে তার পরলোকগত মা-বাবার জন্য কিছু লিখতে চায়। আমার জন্মের পর থেকে শুরু করে বাবার ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত সব স্মৃতি লিখে শেষ করা অসম্ভব, তবুও আবেগাপ্লুত মন নিয়ে সামান্য এই প্রয়াস।

‘বাবা’ শব্দটার মধ্যেই একটা ভরসা পাওয়া যায়। মাথার ওপর ছায়া যেমন, আব্বু মানুষটাও হয় তেমনই। আমার বাবা ছিলেন কিছুটা ভিন্ন, কারণ তিনি শুধু নিজ সন্তানদের জন্য ভরসা ছিলেন না, ছিলেন আরো অনেকেরই ভরসাস্থল। সব মতাদর্শের মানুষকে কাছে টানার বিরল শক্তি ছিল তার। ব্যক্তিস্বার্থ কিংবা ভোগ লালসার সঙ্কীর্ণতা কখনো কলুষিত করতে পারেনি বলেই তিনি ছিলেন সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য, ছিলেন পরোপকারী সজ্জন। জনপ্রতিনিধিত্ব না করেও যে অন্যের উপকার করার জন্য কেউ আন্তরিক ও নিঃস্বার্থ হতে পারে, বাবা ছিলেন তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সারা জীবন তিনি চেনা-অচেনা মানুষকে বিপদ থেকে বাঁচানোর জন্য উন্মুখ ছিলেন। অদ্ভুত তার ব্যক্তিত্ব যা সম্ভ্রম জাগায় ক্ষণে ক্ষণে। মান+যোগ হুঁশ নিয়ে যে মানুষ, আমার বাবা এর একটি নজির। তার মধ্যে ছিল পারিবারিক মূল্যবোধ, সামাজিক অনুশাসন, ধর্মপ্রাণতা আর বাংলাদেশের মাটি থেকে উৎসারিত হৃদয়বৃত্তির সমবায়। পারিবারিক জীবনে বাবা ছিলেন আমরা তিন ভাইবোনের একজন বন্ধুর মতো। তিনি তার ব্যস্ত জীবনের ফাঁকে সময় বের করে আমাদের আদর-ভালোবাসা, স্নেহ মমতা দিয়ে যত্ন নিতেন। আমার মায়ের কাছে তিনি ছিলেন আদর্শ স্বামী। সংসারের খুঁটিনাটি সব কিছু তিনি খেয়াল করতেন। আমাদের পরিবারে কখনো অর্থবিত্তের অভাব ছিল না, আবার তিনি আদর্শের ব্যাপারে কোনো আপস করতেন না। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে তিনি পছন্দ করতেন। অবসর সময়ে বাবা আমাদের নিয়ে গল্প করে কাটাতেন। ছিলেন একজন আলোময় মানুষ।

শিক্ষাই যে একজন মানুষকে আদর্শবান হিসেবে গড়ে তুলতে পারে, এটাতে বাবা বিশ্বাস করতেন। তার নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত- চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার আল হেলাল আদর্শ ডিগ্রি কলেজ, তালগাঁও আল হেলাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং আল হেলাল মহিলা মাদরাসা এর জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। নাড়ির টান তার মধ্যে এতটাই কাজ করত যে, নিজের বিপুল সম্পদ, অক্লান্ত পরিশ্রম, সময়, মেধা উজাড় করে দিয়েছেন গ্রামের মানুষদের ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো কিংবা অবকাঠামো উন্নয়ন তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার জন্য, যা এলাকার অনেক বিত্তশালী ব্যক্তিই করেননি। ৪০ বছর তিনি সাংবাদিকতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন। ছাত্রজীবনেই তার সাংবাদিকতা জীবন শুরু। কর্মময় জীবনে তিনি বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকার চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান, সাংবাদিক সংগঠন ও সমাজকল্যাণ সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। শিল্পপতি এ কে খান, বিচারপতি আবদুর রহমান চৌধুরী, মুফতি মাওলানা মোহাম্মদ আমিনসহ অনেক প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বের জীবনীগ্রন্থের তিনি ছিলেন সম্পাদক। সাহিত্য-সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে তার অনন্য অবদানের জন্য তিনি একাধিক স্বর্ণপদকে ভূষিত হয়েছিলেন।

মরহুম হেলাল হুমায়ুনের মতো একজন আলোকিত ব্যক্তিত্বের সন্তান হওয়াটা সৌভাগ্যের, তেমনই দায়িত্বও এসে যায় এর সাথে। দোয়ার দরখাস্ত থাকবে বাবার মাগফিরাতের জন্য; তার দেখানো পথ অনুসরণ করে আমরা সন্তানরা যেন দেশ, জাতি, সমাজ ও মানুষের কল্যাণে নিবেদিত হতে পারি।

বাবা আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছেন তার তিন বছর পূর্ণ হলো আজ। সরাসরি খুব কম বলেছি ‘আব্বু, ভালোবাসি’। দীর্ঘশ্বাসগুলো অনেক পোড়ায় যখন উঁকি দেয় তার স্মৃতিগুলো মনের গহিনে।

লেখক : নয়া দিগন্ত’র সাবেক চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান মরহুম হেলাল হুমায়ুনের পুত্র


আরো সংবাদ