২২ নভেম্বর ২০১৯

ডাল মে কুছ কালা হায়

-

সাম্প্রতিককালে আমাদের দেশে যেসব অনৈতিক ঘটনা ঘটছে, তা সবাইকে হতবাক করেছে। এর মধ্যে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয়, অসামাজিক কাজ যেমন- খুন, গুম, ধর্ষণ, দুর্নীতি, নৈতিকতাহীনতার প্রসারের কথা। দ্বিতীয়ত, ভিন্নমত পোষণকারীদের প্রতি সরকারের অসহিষ্ণুতা, উচ্চ থেকে নিম্নপর্যায়ে পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অরাজকতা ও নৈতিকতাহীনতা, ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের ক্রমবৃদ্ধি, বিদেশে প্রচুর অর্থপাচার, মদ-জুয়ার আড্ডা ও ক্যাসিনো বাণিজ্যের উত্থানসংশ্লিষ্ট সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যাপক অব্যাহত অব্যবস্থাপনা। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক ও পররাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা সমস্যা নিরসন, বিদেশে এদেশীয় শ্রমশক্তির চাহিদা হ্রাস ও প্রবাসীদের ভোগান্তি, ভারতের সাথে বাংলাদেশের প্রতিকূলে অসম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক লেনদেন এবং বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি হ্রাস। এ সবই পরপর দুই মেয়াদে প্রশ্নবিদ্ধ পন্থায় ক্ষমতাসীন সরকারের সার্বিক অসফলতার পরিণতি।

যে দেশে সরকারের ক্ষমতার নৈতিক ভিত্তি নেই, সে দেশে মানুষের সুস্থ মানসিক বিকাশের সুযোগ কোথায়? এ অসুস্থ মানসিকতা দেশে দল-মত ও জাতি-ধর্ম, শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে প্রায় সবাইকে গ্রাস করে ফেলেছে। এর কারণ বাংলাদেশে সুশিক্ষার প্রসার হচ্ছে না। বহুকাল ধরে শিক্ষাকে ‘জাতির মেরুদণ্ড’ বলা হয়ে আসছে। সে মেরুদণ্ড এতদিনে ঘুণে ধরে নড়বড়ে হয়ে গেছে। শিক্ষা আজ আর কোনো ব্রত নয়। এর বাণিজ্যায়ন হয়ে গেছে। লাভজনক এ বাণিজ্যে শিক্ষক থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী হয়ে অভিভাবক পর্যন্ত জড়িয়ে পড়েছেন। এর পৃষ্ঠপোষকতা করছেন সরকারদলীয় রাজনীতিকেরা। অধিকন্তু শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি থেকে শুরু করে নিম্নে প্রাথমিক শিক্ষকরা পর্যন্ত শাসকদলীয় ছাত্র ও সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর দ্বারা নিগৃহীত। শিক্ষা কারা দেবেন? অনৈতিকভাবে ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অঙ্গুলি হেলনে ও অর্থের চাকায় ভর করে বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা শিক্ষাঙ্গনে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে চলেছে। ভর্তিবাণিজ্য, পরীক্ষবাণিজ্য, কোচিংবাণিজ্য ও আবাসনবাণিজ্য ইত্যাদি যাবতীয় অনৈতিক বাণিজ্য আজ সুশিক্ষার ব্রতকে রাহুগ্রস্ত করছে।

সরকারদলীয় রাজনীতিকরা আজ অবাস্তব প্রলাপ বকছেন। প্রলাপ প্রলাপই। এর সাথে দেশপ্রেমের কোনো সম্পর্ক নেই। দেশের বেশির ভাগ বুদ্ধিজীবীই সরকারের ‘ভাড়াটে’ বলে মনে হতে পারে। এসব ভাড়াটে বুদ্ধিজীবী সরকারদলীয় রাজনীতিকদের মতোই প্রলাপ বকে অনেকে নাকি অর্থবিত্তে ফুলে-ফেঁপে উঠছেন। একই সাথে, সরকারদলীয় ছাত্রনেতাদের অনেকেই বর্তমানে ছাত্রাবস্থায়ই বিপুল বিত্তের মালিক হয়ে যাচ্ছে। ষাটের দশকে এ দেশের ছাত্রনেতারা, যাদের অনেকেই আজ প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিক, তারা দেশপ্রেম ও নৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে সরকারের বিরোধিতা করে জেল খাটতেন। আজ দেশের ছাত্রনেতারা অনৈতিক সরকারের পক্ষাবলম্বন করে পাজেরো জিপ হাঁকায়, কয়েক কোটি টাকার বাড়ি বানায়, ব্যবসা চালায় এবং টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ইত্যাদি অকর্মে লিপ্ত। আরো কত কী! অনৈতিকভাবে নির্বাচিত সরকার এসব ছাত্র, শিক্ষক, রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী, আমলা, বিভিন্ন স্তরের সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তা ও অন্যান্য পেশার লোকদের দলীয় ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে চলেছে। কবি জীবনানন্দ দাশের ভাষায় (একটি শব্দ পরিবর্তন করে) এদের কার্যকলাপ দেখে বলতে হয় “অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ ‘দেশে’ আজ,/ যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা;/ যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই, প্রীতি নেই, করুণার আলোড়ন নেই/ ‘দেশ’ অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া/ যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি/ এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়/ মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা/ শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়”। এটাই সত্য এ দেশে আজ।

এমনটি কেন হলো? এর কারণ হলো, সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের হৃৎস্পন্দনে এবং বিশ্বাসে সৃষ্টিকর্তা ও তার অনুশাসনের প্রতি আনুগত্য, দেশপ্রেম ও মানবদরদের অভাব। কথিত আছে স্টিফেন ডিকাটুর (Stephen Decatur) ১৮১৬-১৮২০ সালের এক ডিনারোত্তর টোস্টে (toast) বলেছিলেন, 'Our Country! In her intercourse with foreign nations may she always be in the right; but right or wrong, our country!' পরবর্তীকালে ১৮৭২ সালে উক্তিটি এভাবে সংশোধিত হয়- 'My country, right or wrong; if right, to be kept right; and if wrong, to be set right.' এ উক্তিটি কার্ল শুলর্জের উক্তি বলে স্বীকৃতি পায়। এ উক্তি সাধারণত ‘দেশপ্রেমের’ উক্তি বলে কথিত। তবে এ উক্তি সমালোচনা রহিত নয়। জেমস ফেনিমোর কুপার বলেন, 'I will stand by my country whether it be right or wrong', or to attack such patriotism as unthinking: "...that patriotism which shouts 'our Country right or wrong,' regardless alike of God and his eternal laws..." এবং জি. কে. চেস্টারটনের ভাষায় 'My country, right or wrong,' is a thing that no patriot would think of saying. It is like saying, 'My mother, drunk or sober.' এরই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৭-এর স্বাধীনতার পরপরই বলেছিলেন- ‘মাই কান্ট্রি রাইট অর রং’।

বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমানের অঙ্গীকার ছিল ‘সোনার বাংলা’ গড়ার। কিন্তু অনেকের মতে, এর মূলনীতির সব ক’টাই "regardless alike of God and his eternal laws..." ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদে যা-ই থাকুক, সমাজতন্ত্রে ধর্মবিশ্বাস নেই। এ নীতির ফলে সে সময়ে দেশে ব্যাপক অরাজকতা দেখা দিয়েছিল। তাই দেশকে সুস্থির করার লক্ষ্যে শেখ মুজিবের পক্ষে দেশের স্বাধীনতা ঘোষণাকারী, জিয়াউর রহমান সে নীতি এমনভাবে সংশোধন করেছিলেন, 'God and his eternal laws...'। ফলে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাছে তা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল এবং সুস্থিতি কিছুটা হলেও ফিরে এসেছিল। তবে অদৃষ্টের এমনই ফের যে, উভয়েই আততায়ীর গুলিতে নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন। এ জন্য উভয়ের দলই একে অপরকে দোষারোপ করছে, তবে নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছেন না, কারা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এবং এর নেপথ্যেই বা কারা।

এরপর মুজিবের কন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে তার পিতার অনুসৃত মূলনীতিগুলো পুনর্বহাল করে বিগত পরপর দু’টি দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন- একটি প্রতিদ্বন্দ্বীহীন ও অপরটি ভোটারবিহীন- করে বিপুল ব্যর্থতার দায় সত্ত্বেও ক্ষতায় আজো আছেন। এক যুগ ক্ষমতায় থেকে যা করেছেন তার বেশির ভাগই ‘ভুল সবই ভুল’। ভ্রান্ত ভিতের ওপর যেমন কোনো টেকসই ইমারত নির্মাণ করা যায় না, তেমনি ভ্রান্তনীতি, আদর্শ বা বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে কোনো ‘সোনার’ দেশও গড়ে তোলা যায় না। যে দেশের নীতি 'regardless alike of God and his eternal laws...' সে দেশ স্বভাবতই 'regardless alike of self-respect and sovereignty'। আজকের বাংলাদেশও তা-ই। সরকারদলীয় নেতা ও তাদের সমর্থকরা নিজেদের সাফল্য সম্বন্ধে যা-ই বলুন না কেন, কথায় বলে ‘বৃক্ষ তোমার নাম কী? ফলে পরিচয়।’ সাফল্যের প্রপাগান্ডা যা-ই হোক না কেন, এর কর্মফল এবং বিরাজমান অরাজকতাই বলে দিচ্ছে এ সরকার কতটা সফল আর কতটা বিফল। আমরা আশা করতে চাই, সরকার তা দ্রুত অনুধাবন করতে পারবে। দেশের সর্বক্ষেত্রে বিদ্যমান অরাজকতা দূর করার লক্ষ্যে এমন একটি সরকার প্রবর্তনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে হবে, যা দেশের প্রচলিত আইন তো বটেই, নৈতিকতার ভিত্তিতেও প্রতিষ্ঠিত বলে দেশ-বিদেশে নন্দিত হবে। যেকোনো দেশপ্রেমিক সরকারের কাছেই জনগণ সর্বাবস্থায় এমনটাই প্রত্যাশা করে থাকে।

লেখক : অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও ভাইস প্রিন্সিপাল, কুমিল্লা মহিলা সরকারি কলেজ


আরো সংবাদ

আজানের মধুর আওয়াজ শুনতে ভিড় অমুসলিমদের (২৫৪৫৭)ধর্মঘট প্রত্যাহার : কী কী দাবি মেনে নিয়েছে সরকার (২০৯৩৪)মানবতাকে জয়ী করেছে পাকিস্তান : রাবিনা ট্যান্ডন (১৯৪৬৭)কম্বোডিয়ায় কাশ্মির ইস্যুতে বক্তব্য, প্রতিবাদ করায় ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করা হলো বিজেপি নেতাকে (১৯১৮৮)ব্যাংকে ফোন দিয়ে তদবির করে ‘ছাত্রলীগ সভাপতি’ আটক (৯৮৭১)আবারো রুশ-চীনা অস্ত্র কিনবে ইরান, আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্রের (৯৭৬৩)৪ ভারতীয়কে জাতিসঙ্ঘের সন্ত্রাসী তালিকাভূক্ত করবে পাকিস্তান (৯৫৮৪)৩৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে নেপাল-ভারত তুমুল বিরোধ (৯৩৪৩)গৃহশিক্ষক বিয়েতে বাধা দেয়ায় ছাত্রীর আত্মহত্যা (৯০৫০)ইলিয়াস কাঞ্চনকে যে কারণে সহ্য করতে পারেন না বাস-ট্রাক শ্রমিকরা (৯০১৪)