২০ নভেম্বর ২০১৯

‘রোহিঙ্গা’ : এখন বিরাট সমস্যা

-

রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের জন্য আজ এক বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিয়ানমার সরকার সহসা তাদের ফিরিয়ে নেবে কি না- সেটাই এখন প্রশ্ন। বাংলাদেশের কূটনীতি রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে ব্যর্থ হয়েছে বললে অতুক্তি করা হবে না। ২০১৭ সালে আগস্ট মাসে মুসলিম রোহিঙ্গাদের জনগোষ্ঠীর তাড়িয়ে দেয় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর যৌথ কমান্ড হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে এবং বাড়িঘর ধ্বংস করে। কয়েক লাখ মিয়ানমারের রোহিঙ্গা বাংলাদেশে মানবিক কারণে আশ্রয় লাভ করেছে। এ জন্য বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন দেশ থেকে প্রশংসা পায়। আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন কর্তৃক আয়োজিত কর্মসূচির মাধ্যমে ২৫ আগস্ট বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা গণহত্যা দিবস পালন করেছে। অথচ মিয়ানমার সরকার কূটনৈতিক ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেছে। ২০১৮ সালের জুন মাসে বেইজিংয়ে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী, মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বৈঠকে মিলিত হন। সেখানে সিদ্বান্ত হয় বাংলাদেশ সরকার ও মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান করবে। এবং এ সমস্যা আন্তর্জাতিকীকরণ করা হবে না। এ ব্যাপারে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিখিতভাবে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ সভাপতি লিখিতভাবে জানান ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে। ২৮ সেপ্টেম্বর চীন সরকার ভেটো প্রদান করে, যাতে কোনো কমিটি গঠন করা না যায়। যে কমিটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরে মানবাধিকার ধ্বংস করা এবং গণহত্যার বিষয় পরীক্ষা করবে সে কমিটি গঠন করতে দেয়া হয়নি। বেইজিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছিল উভয় সরকার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান করবে বন্ধুত্বের মাধ্যমে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, যুক্ত ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করবে রোডম্যাপ তৈরি করার জন্য এবং রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর সময় নির্ধারণ করা হবে। ২০১৮ সালে নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকার এক চুক্তি করে। এই চুক্তি মিয়ানমার সরকারের স্বার্থ অনুযায়ী করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এই চুক্তি ১৯৯৩ সালের চুক্তি অনুযায়ী করা হয়েছে। অথচ ১৯৮০ সালের চুক্তিতে রোহিঙ্গাদের বার্মার নাগরিক হিসেবেই গণ্য করা হয়েছিল। বার্মার তদানীন্তন ও দীর্ঘকালীন সরকারপ্রধান জেনারেল নে উইন ১৯৮২ সালে নতুন নাগরিক আইন তৈরি ও জারি করেন। এই আইনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়। অন্য দিকে জাতিসঙ্ঘ উদ্বাস্তু সংস্থা অভিযোগ করে যে, এই চুক্তিতে জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার সংস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অথচ শরণার্থীসংক্রান্ত সেবা তারাই প্রদানকারী সংস্থা জাতিসঙ্ঘের পক্ষ থেকে। উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, মিয়ানমার সরকার অন্য দিকে জাতিসঙ্ঘের হাইকমিশন ফর রিফুজি (ইউএনএইচসিআর) সংস্থার সাথে চুক্তি করেছিল ২০১৮ সালের ৬ জুন মাসে। এই চুক্তিতে ছিল পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে, যাতে রোহিঙ্গারা অনুকূল সমর্যাদায় রাখাইন স্টেটে ফিরে যায় এবং তাদের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা, চলাফেরার স্বাধীনতা এবং নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিতে হবে। মিয়ানমার সরকার আরো একটি চুক্তি করেছে জাতিসঙ্ঘের উন্নয়ন সংস্থার সাথে। জাতিসঙ্ঘের হাইকমিশন ফর রিফুজি মিয়ানমার সরকারের সাথে যে চুক্তি করেছিল বাংলাদেশ সরকার সেগুলো চুক্তিতে কেন অন্তর্ভুক্ত করেনি?

চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত কালাদান সংবাদ সংস্থা জানিয়েছিল, ২০১২ সালে রাখাইনে মায়ু পাহাড় রেঞ্জ মিলিটারি ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরি করা হয়। এ ছাড়া মাছ ধরার সব বোট বাজেয়াপ্ত করা হয়। নাফ নদীতে বার্মিজ নেভি বোট পাহারা দিত চব্বিশ ঘণ্টা। সুতরাং কথিত জঙ্গি বাহিনী পুলিশ পোস্ট আক্রমণ করার অভিযোগ বাস্তবসম্মত নয়। একটা অজুহাত দাঁড় করিয়েছিল মিয়ানমার সরকার। রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বরোচিত আক্রমণ করার ‘কারণ’ দাঁড় করানো হয়েছিল। সুতরাং ২৫ আগস্ট ২০১৭ সালে আরাকান বাহিনীর পুলিশ ফাঁড়ি আক্রমণ ছিল অজুহাত।

অথচ রোহিঙ্গারা যুগ যুগ ধরে রাখাইন রাজ্যে বাস করছে। বার্মা সরকার আরাকান প্রদেশে নাম পরিবর্তন করে রাখাইন স্টেট করে ১৯৮৯ সালে। রাখাইন স্টেট এক দিকে চীন স্টেট, উত্তর দিকে গধমিধু, বাগো রিজিওন, আয়েয়ারবাডি রিজিওন পূর্ব দিকে, বঙ্গোপসাগর পশ্চিম দিকে এবং বাংলাদেশের চিটাগাং ডিভিশন উত্তর দিকে অবস্থিত। রোহিঙ্গারা আরব, মোগল, ইরানি ও বাঙালির মিশ্রণে মুসলিম এবং হিন্দু মিশ্র জাতি। ফার্সি রাখাইন স্টেটের কোর্টের ভাষা ছিল ১৮ শতাব্দী পর্যন্ত। রাখাইন স্টেটে বৌদ্ধ ও রোহিঙ্গা মুসলিমরা যুগ যুগ ধরে বসবাস করে আসছে। অথচ মিয়ানমারের সাবেক রাষ্ট্রপতি জেনারেল থেইন সেইন ইউনাইটেড নেশনস হাইকমিশনার ফর রিফুজি অ্যান্তেনিও গুতেরেসকে ১২ জুলাই ২০১২ সালে বলেছিলেন, রোহিঙ্গাদের তৃতীয় কোনো দেশে পাঠাতে অথবা ইউএনএইচসিআর তাদের দেখাশোনা করবে। অথচ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্বাস দিয়েছিলেন, রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবেন তারা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ২০১১ সালের ৫ ডিসেম্বর মাসে দুই দিনের শুভেচ্ছা সফরে মিয়ানমার গিয়েছিলেন। সাথে ছিলেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডাক্তার দীপু মণি।

এখানে উল্লেখযোগ্য, বাংলাদেশ সরকার ১৯৫১ সালের স্ট্যাটাস অব রিফুজি-সংক্রান্ত ইউনাইটেড নেশনস কনভেনশন অথবা ১৯৬৭ স্ট্যাটাস অব রিফুজি-সংক্রান্ত প্রটোকলে সই করেনি। এ অবস্থায় বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা রিফুজি গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক কোভেনান্ট ও কনভেনশনে সই করেছে সেহেতু আন্তর্জাতিক চার্টার ও বিধান নাগরিক নয় এমন ব্যক্তিদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করবে।

কিন্তু বাংলাদেশের ওপর রোহিঙ্গা ইস্যুর গুরুতর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে প্রভাব পড়ছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আইন ও শৃঙ্খলা ক্ষেত্রে বিপর্যয় আসছে। ২০১২ সালে গুতেরেস জাতিসঙ্ঘের হাইকমিশনার ফর রিফুজি ছিলেন। বর্তমানে তিনি জাতিসঙ্ঘের সেক্রেটারি জেনারেল। সুতরং তার অনেক দায়িত্ব। জাতিসঙ্ঘের উচিত এই মানবিক সমস্যার আশু সমাধান করা।

লেখক : সাবেক কূটনীতিক এবং নোভা টোস্ট মাস্টার ইন্টারন্যাশনাল ক্লাবের সাবেক প্রেসিডেন্ট, লিখছেন আমেরিকার ভার্জিনিয়া থেকে।
[email protected]


আরো সংবাদ