২০ অক্টোবর ২০১৯

কয়েদি জেলারের কথা শোনে না

কয়েদি জেলারের কথা শোনে না - ছবি : সংগ্রহ

আমরা তাকে গ্রেফতার করে কয়েদখানায় ফেলে রেখেছিলাম। সন্দেহ করা হচ্ছিল, তিনি তার শত্রুর সাথে গোপনে কথাবার্তা বলছেন। কয়েক বছর কয়েদখানায় রাখার পর এক দিন আমরা তাকে মুক্তি দিয়ে বললাম, ‘যাও। এবার গিয়ে শত্রুর সাথে কথাবার্তা বলো।’

তিনি গ্রেফতারও হয়েছিলেন কারো ইচ্ছায়, আবার তাকে মুক্তিও দেয়া হয়েছিল বিশেষ কারো ইচ্ছায়। মুক্তি পেয়েই তিনি শত্রুর সাথে আলোচনায় শামিল হলেন। আর আমরা স্লোগান দিতে লাগলাম, ‘এ আলোচনা আমাদের কারণে শুরু হয়েছে। আমরা এ আলোচনার সফলতায় বেশ বড় ভূমিকা পালন করছি।’ কিন্তু হঠাৎ এ আলোচনা বাধাগ্রস্ত হলো। যদি দ্বিতীয়বার এ আলোচনা শুরু না হয়, তাহলে ব্যর্থতার দায় আমাদের ওপরও আসবে। বিষয়টা তখন শুধু অভিযোগ পর্যন্ত থাকবে না, আরো আগেও যেতে পারে। আজ আমরা বড় অসহায়ভাবে এমন এক ব্যক্তির ওপর ভরসা করে বসে আছি, যিনি কিছু দিন আগে পর্যন্ত ছিলেন আমাদের কয়েদি। ওই কয়েদির নাম মোল্লা আবদুল গনি ব্রাদার, যিনি দোহায় আমেরিকার সাথে আলোচনারত আফগান প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন।

মোল্লা ব্রাদারকে ২০১০ সালে করাচির কাছের এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হলে মার্কিন মিডিয়া দাবি করেছিল, তিনি ওই সময় আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের সাথে গোপনে কথাবার্তা বলছিলেন। কারজাই ব্রাদারের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন এবং প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তিনি লয়া জিরগাতে আফগান তালেবানের সাথে আলোচনার জন্য প্রস্তুত। তৎকালীন পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের কাছে এটা খুব খারাপ লেগেছিল যে, আফগান তালেবান ও হামিদ কারজাই একে অপরের সাথে যোগাযোগ শুরু করেছে। ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি মোল্লা অবদুল গনি ব্রাদারকে গ্রেফতার করা হলে কিছু পশ্চিমা গণমাধ্যম এ দাবিও করেছিল যে, এ গ্রেফতারি আমেরিকার সরবরাহকৃত তথ্যের ভিত্তিতে হয়েছে। এটাও বলা হয়েছিল, পাকিস্তানের তৎকালীন আর্মি চিফ জেনারেল আশফাক পারভেজ কিয়ানির অবসরে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছিল। তিনি তার চাকরির মেয়াদ বাড়াতে চাচ্ছিলেন। এ কারণে তিনি মোল্লা ব্রাদারকে গ্রেফতার করেন, যাতে আফগান শান্তি আলোচনায় তার গুরুত্ব বেড়ে যায় এবং ওই গুরুত্বের কারণে তার মেয়াদও বেড়ে যায়। জেনারেল কিয়ানির চাকরির মেয়াদ বেড়েছিল, কিন্তু আফগান শান্তি কার্যক্রম আগে বাড়েনি, কেননা কয়েদি হওয়ার পর মোল্লা ব্রাদার তার জেলারের কথা মানতে অস্বীকার করেছিলেন।

গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জালমে খলিলজাদেকে আফগানিস্তানের জন্য আমেরিকার বিশেষ দূত হিসেবে নিযুক্ত করেন, যাতে তিনি তালেবানের সাথে শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করতে পারেন। জালমে খলিলজাদে বুঝতে পারেন, শান্তি আলোচনার সূচনা মোল্লা ব্রাদারের মুক্তি ছাড়া সম্ভব নয়। এ কারণে পাকিস্তানের কাছে তার মুক্তির দাবি করা হয়। ২০১৮ সালের অক্টোবরে পাকিস্তান মোল্লা ব্রাদারকে মুক্তি দিলে আফগান তালেবান সাথে সাথে তাকে তাদের আলোচনার প্রতিনিধি দলের প্রধান বানিয়ে দেয়। আলোচনা শুরু হলে আফগানিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞ, কিছু ‘আফগানবিষয়ক অভিজ্ঞ ব্যক্তি’ সময়ের আগে ওই আলোচনার সফলতার দাবি করা শুরু করেছেন। শুধু তাই নয়, ওই সফলতার কৃতিত্বের ভাগ নেয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপও শুরু হয়ে যায়। দোহায় আফগান তালেবানের প্রতিনিধি দলের সাথে যখনই যোগাযোগ করা হয়েছে, তখনই বারবার তারা একই কথা বলেছেন, ‘এ আলোচনা আমাদের নয়, বরং ট্রাম্পের প্রয়োজন। আমরা শান্তি চাই, তবে শান্তির নামে আত্মসমর্পণ করব না।’

আলোচনা চলাকালে পাকিস্তানে তাদের একাধিকবার ডাকা হয়েছে। তারা এ বিষয় নিয়ে টালবাহানা করেছেন যাতে তাদের ওপর এ অভিযোগ আরোপ করা না হয় যে, তারা পাকিস্তানের হাতের পুতুল। তবে পাকিস্তানেও কিছু মানুষ তাদের সাথে ছবি বানিয়ে নিজেদের গুরুত্ব বাড়াতে চান। অবশেষে তালেবান তাদের কিছু প্রতিনিধিকে পাকিস্তান পাঠানোর প্রস্তুতির কথা প্রকাশ করলে আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি অসন্তুষ্ট হন। তিনি খলিলজাদের মাধ্যমে পাকিস্তানকে হুমকি দেন, যদি ইমরান খান তালেবানের সাথে সাক্ষাৎ করেন, তাহলে বিচ্ছিন্নতাবাদী বেলুচদের আমার বিমানে বসিয়ে মোদির কাছে নিয়ে যাবো।’ আফগান তালেবানের ধারণা ছিল না যে, পাকিস্তান আশরাফ গনির হুমকিতে পড়বে। তবে পাকিস্তান হুমকিতে পড়েছে এবং তালেবানকে বলা হয়েছে, আপনারা পাকিস্তান সফর কিছু দিনের জন্য মুলতবি রাখুন।

জালমে খলিলজাদের ধারণা ছিল, আগস্টের প্রথম সপ্তাহে শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হবে, কিন্তু তা সফল হয়নি। আফগান তালেবান তাদের ভূখণ্ড থেকে মার্কিন সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের দাবি করছে, আর খলিলজাদে তাদের কাছে নিঃশর্ত অস্ত্র সমর্পণের দাবি করছেন। ওই সময় আফগান ন্যাশনাল আর্মির কিছু উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা তালেবানের সাথে যোগাযোগ করে বলেন, ‘শান্তি চুক্তির সাথে সাথে তারা তাদের জওয়ানদের তালেবানকে সহায়তা করার ঘোষণা দেবেন। প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি যখন এটা জানতে পারেন, তখন তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বার্তা প্রেরণ করেন যে, শান্তিচুক্তি আপনার আত্মসমর্পণে রূপ নিতে যাচ্ছে।’ ৯ সেপ্টেম্বর ডেভিড ক্যাম্পে আমেরিকা সরকার শান্তি চুক্তি ফাইনাল করতে চাচ্ছিল, যাতে ১১ সেপ্টেম্বর ট্রাম্প দাবি করতে পারেন যে, তিনি আফগানিস্তানে ‘শান্তি প্রতিষ্ঠা’ করেছেন। কিন্তু তালেবান আমেরিকার শর্তগুলো মানতে অস্বীকার করে বসে। ফলে ট্রাম্প আলোচনা বাতিল করে দেন। বিগত দিনে ট্রাম্প পাকিস্তানের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করেছিলেন। এর আসল কারণ ছিল, ট্রাম্প আফগানিস্তানে তার সাফল্য দেখতে পাচ্ছিলেন। কিন্তু তালেবান শান্তি আলোচনার নামে আত্মসমর্পণে অস্বীকার করেছে। এখন ট্রাম্পও মুশকিলে, পাকিস্তানও মুশকিলে। কিন্তু মোল্লা ব্রাদার আমেরিকা বা পাকিস্তানের স্বার্থ নয়, বরং তিনি নিজের জাতির স্বার্থ দেখবেন। তিনি তার জাতির কথা শুনবেন। তিনি তাদের কথা শুনবেন না, যারা তাকে কয়েদখানায় নিক্ষেপ করে গর্ব করতেন।
পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং ০৯ সেপ্টেম্বর,
২০১৯ সংখ্যা থেকে ভাষান্তর

ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
[email protected]
লেখক : পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট, প্রেসিডেন্ট জি নিউজ নেটওয়ার্ক (জিএনএন),
পাকিস্তানের জিও টিভির নির্বাহী সম্পাদক


আরো সংবাদ




portugal golden visa
paykwik