২০ অক্টোবর ২০১৯

ভারতের জন্য অন্ধকার দিন সামনে

বিচারপতি মার্কন্ডে কাটজু - ছবি : সংগ্রহ

জার্মানিতে বিজ্ঞান যেমন নাৎসি যুগে বর্ণবাদী ‘মাম্বু জাম্বোতে’ পরিণত হয়েছিল, তেমনি ২০১৪ সালের পর ভারতে বিজ্ঞানের একই অবস্থা হয়েছে এবং নাৎসি জার্মানিতে যেমন ইতিহাস বিকৃত হয়েছিল, তেমনি ২০১৪-পরবর্তী ভারতেও তা ঘটেছে। আর গোয়েবলস জার্মানির মিডিয়াকে বেছে নিয়েছিল, তেমনিভাবে ভারতীয় মিডিয়ার বেশির ভাগকে সজ্জিত করা হয়েছে এবং আমাদের প্রভুকে ‘মৃত্যু অভিযাত্রার অভিবাদন’ জানানো হচ্ছে। ভারতের জন্য অন্ধকার দিন সামনে।

ভারতে এখন এমন কিছু ঘটছে, যা নাৎসি যুগে জার্মানিতে সংঘঠিত ঘটনার কথা আমাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। ১৯৩৩ সালের জানুয়ারিতে হিটলার ক্ষমতা নেয়ার পরে প্রায় পুরো জার্মানি ‘পাগল’ হয়ে যায়, লোকেরা ‘হেইল হিটলার’, ‘সিগ হিল’, ‘জুডেন ভেরেক’ বলে চিৎকার করে আর সম্মোহিত ‘জম্বি’র মতো পাগলটির প্রশংসা করতে থাকে। ইউটিউবে যে কেউ এসব এখনো দেখতে পারেন। জার্মানরা এমন এক উচ্চ সংস্কৃতির মানুষ, যারা ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ও আইনস্টাইনের মতো দুর্দান্ত বিজ্ঞানী, গ্যেটে ও শিলারের মতো দুর্দান্ত লেখক, হেইনের মতো মহাকবি, মোজার্ট, ব্যাখ এবং বিটোফেনের মতো দুর্দান্ত সঙ্গীতশিল্পী, মার্টিন লুথারের মতো দুর্দান্ত সংস্কারক, ক্যান্ট, নিৎশে, হেগেল ও মার্কসের মতো দুর্দান্ত দার্শনিক, লাইবনিটজ, গাউস ও রিমানের মতো দুর্দান্ত গণিতবিদ এবং ফ্রেডারিক দ্য গ্রেট ও বিসমার্কের মতো দুর্দান্ত রাজনীতিবিদ তৈরি করেছিল। প্রত্যেক জার্মানকে পেয়েছি এক-একজন ভালো মানুষ হিসেবে।

তবুও হিটলার যখন দৃশ্যপটে আসেন এবং বলেন, জার্মানরা হেরেনভলক (মাস্টার রেস বা সেরা জাতি) আর ইহুদিরা তাদের সমস্ত দুর্ভোগের জন্য দায়ী, তারা তখন বোকার মতো এসব বাজে কথা গিলছিল এবং ইহুদিদের ওপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে সামান্য কিছুই করেছিল। ফলে হলোকাস্ট ঘটেছিল। তখন অনেক জার্মান এমনকি এটিকে সমর্থনও করেছিল।

কিভাবে এটা হলো? অবশ্যই জার্মানরা বোকা লোক নন অথবা তারা ভেতরে ভেতরে বাজে মানুষও নন। আমি দেশটির ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ৯৯ শতাংশ মানুষকে সব সময় ভালো হিসেবেই পেয়েছি। তাহলে কিভাবে জার্মানরা ৬০ লাখ ইহুদিকে গ্যাস চেম্বারে পাঠাতে পেরেছে?

আমার মতে, এটি ঘটেছিল এ কারণে যে, আধুনিক প্রচার-প্রচারণা এমন এক শক্তিশালী জিনিস, যা এমনকি অতি সংস্কৃতিবান ও বুদ্ধিমান মানুষের মনকেও বিষাক্ত করে ফেলতে পারে। তৎকালীন বেশির ভাগ জার্মানের ক্ষেত্রে এটিই ঘটেছিল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর জার্মানদের আত্মমর্যাদার সঙ্কট এবং ১৯২৯ সালের মহামন্দার পরে ব্যাপক বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সঙ্কটে হিটলারের মতো কুৎসিত ব্যক্তির প্রচারণার সহজ চারণভূমি হয়ে ওঠে দেশটি। এটি বেশির ভাগ জার্মানকে গ্রাস করেছিল।

বেশির ভাগ ভারতীয়ের ক্ষেত্রেও এখন একই ঘটনা ঘটছে। ২০১৪ সালে দক্ষিণপন্থী হিন্দু নব্য-ফ্যাসিবাদী দল বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভারতে সংখ্যালঘুদের (বিশেষত মুসলমানদের) বিরুদ্ধে গো-হত্যা ও হিন্দু মেয়েদের প্ররোচিত করার (লাভ জিহাদ) ঘৃণ্য বক্তৃতা দিয়ে বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক প্রচার চালানো হচ্ছে। এর ফলে ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের বেশির ভাগেরই মন বিষাক্ত হয়ে ওঠে।
গত কয়েক বছরে রামমন্দির নির্মাণের দাবি এবং মুসলমানদের গণপিটুনিতে হত্যা নিয়মিত বিষয় ছিল। পাকিস্তানের বালাকোটে বিমান হামলা এবং উগ্র ভারতীয় গণমাধ্যম দ্বারা যুদ্ধের হিস্টিরিয়া সৃষ্টি এই প্রচারণার অংশ ছিল; আর সাম্প্রতিক সংসদ নির্বাচনে বিজেপির পক্ষে এক বিস্ময়কর বিজয়ে এসবের প্রচুর লাভ পেয়েছে বিজেপি।

মনে হয়, ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ রহিত করার বিষয়টি কেবল একটি চমক (যেহেতু এটি ভারতের আসল সমস্যার কোনো সমাধান করবে না)। এর ফলে বেশির ভাগ হিন্দু উগ্র হয়ে ওঠে (যেমনটি আমেরিকায় হিউস্টনের ‘হাওডি মোদি’ সমাবেশেও দেখা যায়) এবং উদযাপন করেছে ‘শয়তান’ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এক দুর্দান্ত ‘বিজয়’।

ভারতের আসল সমস্যা হলো রেকর্ড হারের বেকারত্ব (ভারত সরকারের একটি সংস্থার জাতীয় নমুনা জরিপে প্রকাশিত), মারাত্মক শিশু অপুষ্টি (ভারতে প্রতি দু’টি শিশুর একটি পুষ্টিহীন), বিপুলসংখ্যক কৃষকের আত্মহত্যা (তিন লাখেরও বেশি), জনগণের জন্য যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা ও সুশিক্ষার প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি, ধনী-দরিদ্রের মধ্যে বিরাট ব্যবধান (ভারতের ১৩৫ কোটি জনসংখ্যার নিচের অর্ধেকের চেয়ে শিখরের সাতজন বেশি সম্পত্তির মালিক)। এসব কিছু সাম্প্রতিক লোকসভা নির্বাচনের ইস্যুর মধ্যে স্থান পায়নি।
‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ হলো উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপের মতো শিল্পোন্নত সমাজের একটি বৈশিষ্ট্য। এটি বেশির ভাগ এশীয় দেশের মতো সামন্তবাদী বা আধা সামন্ত সমাজের বৈশিষ্ট্য নয়। কেবল সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার উল্লেখ দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ করে না। ভারত এখনো আধা সামন্তবাদী, যেটা এখানে প্রচলিত বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। বেশির ভাগ ভারতীয় গভীরভাবে ধর্মপ্রাণ এবং প্রায় ৮০ শতাংশ ভারতীয় নাগরিক হিন্দু হওয়ায় তারা সাম্প্রদায়িক প্রচারের সহজ শিকার হয়।

আমার নিজের মনে হয়, ভারতের বেশির ভাগ হিন্দু, একই সাথে বেশির ভাগ মুসলমানও সাম্প্রদায়িক। যখন আমার হিন্দু আত্মীয় আর বন্ধুদের মধ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সর্বাধিক বিদ্বেষের বিষ দেখি (এটা নিশ্চিত হওয়ার পরে যে, সেখানে কোনো মুসলিম উপস্থিত নেই) তখন এটিই মনে হয়। একজন মুসলমানকে যখন গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়, তখন বেশির ভাগ হিন্দু উদাসীন থাকেন, কেউ কেউ খুশিও হন। একজন ‘সন্ত্রাসী’ কমলো বলে!

সাম্প্রদায়িকতা (সংখ্যালঘুদের, বিশেষত মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা) বেশির ভাগ হিন্দুর মধ্যে সব সময়ই সুপ্ত ছিল। কেবল বারুদের কৌটাটিকে বিস্ফোরণে পরিণত করার জন্য কোথাও থেকে একটি স্ফুলিঙ্গের অপেক্ষায় ছিল। মুসলিমবিরোধী ও খ্রিষ্টানবিরোধী সংগঠন আরএসএসের প্রাধান্য বিস্তার করা দল, বিজেপি ২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে সাম্প্রদায়িক আগুন নিজের আস্তিনের মধ্যে মজুদ করে রেখেছিল।
এখন যেহেতু বিজেপি এবং তার নেতা মোদি এক বিস্ময়কর জয় পেয়েছেন, জনগণের কাছ থেকে তাদের সমস্যার সমাধানের জন্য প্রচুর চাপ পড়বে। এই চাপ থাকবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, কৃষকদের দুর্দশা কাটানো, শিশুর অপুষ্টি কমানো, সঠিক স্বাস্থ্যসেবা এবং ভালো শিক্ষা প্রদান ইত্যাদির জন্য।

তবে এটি কিভাবে করা হবে সে সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই। এর পরিবর্তে ভারতে যা সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে চলেছে, তা হলো- অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মুখ থুবড়ে পড়েছে, জিডিপির প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়ে ৫ শতাংশে নেমে এসেছে, শিল্প উৎপাদন তীব্রভাবে হ্রাস পেয়েছে (যেমন অটো সেক্টর, রিয়েল এস্টেট, বিদ্যুৎ ইত্যাদি) এবং রেকর্ড ও উচ্চ হারে বেকারত্ব সৃষ্টি হয়েছে।

সুতরাং এই অবনতিশীল প্রকৃত সমস্যাগুলো থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্য দিকে ফেরাতে একটি ‘বলির পাঁঠা’ খুঁজে পেতে হবে। হিটলার ইহুদিদের মধ্যে এটি খুঁজে পেয়েছিল, তেমনি ভারতে এই বলির পাঁঠা হবে আমাদের মুসলমানেরা আশঙ্কা করি যে, এখন তাদের ওপর বারবার নিপীড়ন-হত্যাযজ্ঞ চালানো হবে (এবং খ্রিষ্টানদের ওপর কিছুটা হলেও তা হবে)।

জার্মানিতে বিজ্ঞান যেমন নাৎসি যুগে বর্ণবাদী ‘মাম্বু জাম্বোতে’ পরিণত হয়েছিল, তেমনি ২০১৪ সালের পর ভারতে বিজ্ঞানের একই অবস্থা হয়েছে এবং নাৎসি জার্মানিতে যেমন ইতিহাস বিকৃত হয়েছিল, তেমনি ২০১৪-পরবর্তী ভারতেও তা ঘটেছে। আর গোয়েবলস জার্মানির মিডিয়াকে বেছে নিয়েছিল, তেমনিভাবে ভারতীয় মিডিয়ার বেশির ভাগকে সজ্জিত করা হয়েছে এবং আমাদের প্রভুকে ‘মৃত্যু অভিযাত্রার অভিবাদন’ জানানো হচ্ছে। ভারতের জন্য অন্ধকার দিন সামনে।

[বিচারপতি মার্কান্ডে কাটজু ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারক এবং ভারতের প্রেস কাউন্সিলের সাবেক চেয়ারম্যান।]

সূত্র : ম্যাটার্স ইন্ডিয়া
অনুবাদ : মাসুমুর রহমান খলিলী


আরো সংবাদ




portugal golden visa
paykwik