১৪ নভেম্বর ২০১৯

বোল্টনের অপসারণে ইরানের স্বস্তি

-

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে টানাপড়েন নতুন কোনো বিষয় নয়। দীর্ঘ দিনের ইতিহাস সেটা। তবে ট্রাম্পের পূর্বসূরি বারাক ওবামা সম্পর্কের এ তিক্ততা বেশ খানিকটা কমিয়ে এনেছিলেন। আচরণে এনেছিলেন নমনীয়তা। কিন্তু ২০১৬ সালের শেষ দিকে ক্ষমতায় বসার পর থেকেই পুরো আবহটা পাল্টে ফেলেন ট্রাম্প। ২০১৫ সালে ছয় বিশ্বশক্তির সাথে তেহরানের পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়ে ওয়াশিংটন দেশটির ওপর আগের সব অবরোধ-নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করে। পাশাপাশি ক’দিন পরপরই বিভিন্ন অজুহাতে তারা ইরানকে জর্জরিত করতে থাকে নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞায়। এর ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের ওপর তাদের সর্বশেষ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ১০ সেপ্টেম্বর। সেদিন বিপ্লবী গার্ড বাহিনীসহ আরো কিছু ইরানি সংস্থার ওপর নতুন অবরোধের ঘোষণা দেয় ওয়াশিংটন।

নিজেদের এসব অবরোধ-নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সব সময় অভিযোগ করে আসছে, ইরান গোপনে পরমাণু তৎপরতা চালাচ্ছে। তারা তাদের পরমাণু স্থাপনা পরিদর্শনে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা আইএইএকে সহযোগিতা করছে না। নিজেদের সর্বশেষ নিষেধাজ্ঞাটি আরোপ করার ক্ষেত্রেও তারা এ অভিযোগ করে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, যে আইএইএকে সহযোগিতা করছে না বলে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, সে সংস্থাই কিন্তু উল্টো কথা বলছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর যখন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এ অভিযোগ করছেন, তার মাত্র এক দিন আগে আইএইর ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক কর্নেল ফেরুতা ইরান সফর শেষে তার সংস্থাকে সহযোগিতা করার জন্য তেহরানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

এদিকে হঠাৎ করেই ট্রাম্প তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনকে পরিষ্কার করেছেন। যে বোল্টনের পরামর্শে এতদিন ইরানের ওপর চাপ দিয়ে গেছেন, আফগানিস্তান-ইয়েমেনে যুদ্ধ চালিয়েছেন, সে বোল্টনের ব্যাপারে ট্রাম্প বলেছেন, আমি জন বোল্টনকে জানিয়ে দিয়েছি, হোয়াইট হাউজে তার আর কোনো কাজ নেই। কারণ তার অনেক পরামর্শের সাথে আমার মতপার্থক্য রয়েছে। ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে দায়িত্ব পালন করে আসা বোল্টন ছিলেন ট্রাম্পের তৃতীয় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। ট্রাম্পের এ স্বল্প মেয়াদে এর আগে এ পদ থেকে বিদায় নিতে হয়েছে মাইকেল ফ্লিন ও ম্যাকমাস্টারকেও। বোল্টন অবশ্য বলেছেন, তাকে বরখাস্ত করা হয়নি, তিনি নিজেই পদত্যাগ করেছেন।

ইরান এই প্রথম ট্রাম্পের কোনো পদক্ষেপে নিজেদের সমর্থন জানিয়েছে। ওয়াশিংটনকে বোল্টনের মতো যুদ্ধবাজদের এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি আরো বলেন, মার্কিনিদের উপলব্ধি করতে হবে যুদ্ধোন্মাদনা ও যুদ্ধবাজরা তাদের জন্য সুবিধাজনক কিছু নয়। তাদের এ ধরনের বিষয়গুলো এড়িয়ে চলতে হবে। অন্য দিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাওয়াদ জারিফ বলেন, যুদ্ধের প্রধান প্ররোচক জন বোল্টনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রেরও যুদ্ধোন্মাদনার অবসান হওয়া উচিত।

তবে তেহরান এ-ও জানিয়েছে, মার্কিন প্রশাসনে রদবদলের কারণে তাদের ব্যাপারে ইরানের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন আসবে না। কারণ, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সরকারের শত্রুতা ও বিদ্বেষের শেকড় অনেক গভীরে এবং এক বা দু’জন কর্মকর্তাকে সরিয়ে দিলে তা ওই শত্রুতা অবসানে আসলে কোনো প্রভাব ফেলবে না।

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলী শামখানি বলেছেন, আমেরিকা তার আন্তর্জাতিক প্রতিশ্র“তি পূরণ করে পরমাণু সমঝোতায় ফিরে আসে কি না এবং তেহরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে কি না তার ওপর ওয়াশিংটনের ব্যাপারে ইরানের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের বিষয়টি নির্ভর করছে।

অবশ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন বরাবরই বলে আসছিল, ইরানের সাথে বিরোধ মেটানোর একমাত্র উপায় আলোচনায় বসা। তবে এটি কেবল তখনই সম্ভব যখন পারমাণবিক শর্তের বিষয়ে উভয়ে একমত হবে এবং জন বোল্টনের প্রস্থান ঘটবে।

তবে বোল্টনকে ছাঁটাইয়ের কিছুক্ষণের মধ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বলেন, জাতিসঙ্ঘের আসন্ন সাধারণ অধিবেশনের সময় কোনো পূর্বশর্ত ছাড়াই ইরানি প্রেসিডেন্টের সাথে বৈঠক করতে পারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তার এ কথার জবাবে তেহরান তাৎক্ষণিকভাবে জানিয়েছে, ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া না হলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো আলোচনায় বসবে না।
জন বোল্টন যুদ্ধবাজ হিসেবে অনেক আগে থেকেই খ্যাত। আর সে কারণেই একবার ট্রাম্প মজা করে বলেছিলেন, এমন কোনো যুদ্ধ নেই যেটা জন পছন্দ করেন না। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হওয়ার আগে বোল্টন ফক্স নিউজের ভাষ্যকার ছিলেন। তিনি আগস্ট ২০০৫ থেকে ডিসেম্বর ২০০৬ পর্যন্ত জাতিসঙ্ঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তা ছাড়া সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান এবং জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসনের অধীনেও বোল্টন কাজ করেছেন।

বেশ কয়েক বছর ধরে জন বোল্টন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছিলেন। তবে উত্তর কোরিয়া ও আফগানিস্তান বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে মতবিরোধে জড়িয়েছিলেন জন বোল্টন। তিনি আফগানিস্তানের তালেবানের সাথে শান্তিচুক্তির বিরোধিতা করেন। তালেবান নেতাদের ক্যাম্প ডেভিডে ট্রাম্প যে আমন্ত্রণ জানান, বোল্টন তাতেও দ্বিমত করেন।

চীন, রাশিয়া, ইরান, উত্তর কোরিয়া, আফগানিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যসহ প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ট্রাম্প ও বোল্টনের অবস্থান ছিল পরস্পরবিরোধী। আবার অনেক ইস্যুতেও তাদের মতের মিল থাকলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে ব্যর্থ হওয়ায় বোল্টনের ওপর ক্ষিপ্ত হন ট্রাম্প। ভেনিজুয়েলার রাজনৈতিক ইস্যুটি ছিল তেমনই এক ইস্যু। ভেনিজুয়েলা ইস্যুতে লেজেগোবরে করে ফেলায় তিনি বোল্টনকে দায়ী করে বলেন, সে আমাকে ভুল পথে পরিচালিত করেছে।

ইরান ইস্যুতে নরম সুর
এদিকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনের পদচ্যুতির এক দিনের মধ্যেই ইরান প্রশ্নে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কণ্ঠে ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে। ১১ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউজে তিনি ইঙ্গিত দেন, ইরানের প্রতি ‘সর্বাত্মক চাপ’ প্রয়োগের চলমান নীতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।

জানা গেছে, ইরানের বর্তমান আর্থিক জটিলতা থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যে বড় ধরনের ঋণ দিতে আগ্রহী ট্রাম্প। ২০১৫ সালে সম্পাদিত পারমাণবিক চুক্তি ভঙ্গ না করার শর্তে ইরানকে ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দেয়ার একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। প্রস্তাবটির ব্যাপারে ট্রাম্প প্রশাসন ফরাসিদের সাথে কথাবার্তা শুরু করেছে।

ট্রাম্প বলেন, আমার মনে হয় ইরানের সাথে বিরাট একটা সম্ভাবনা আছে। আমরা সেখানে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করছি না। আশা করি, ইরানের সাথে আমরা একটা চুক্তিতে পৌঁছাতে পারি। যদি এ ধরনের চুক্তি হয় তাহলে সেটা আমাদের জন্য ভালো।

সদ্য সমাপ্ত জি-৭ বৈঠকে কোনো আগাম ঘোষণা ছাড়াই ইরানি প্রধানমন্ত্রী জাভেদ জারিফ উপস্থিত হয়েছিলেন। বেশির ভাগ পর্যবেক্ষকের ধারণা, ট্রাম্পের অনুমোদন ছাড়া জারিফকে বৈঠকে উপস্থিত থাকার আমন্ত্রণ কিছুতেই পাঠাতেন না ম্যাক্রোঁ।

তবে মার্কিন প্রশাসনের সাম্প্রতিক এই পদক্ষেপগুলোতে ইরানের খুব বেশি উচ্ছ্বসিত হওয়ার আসলেই তেমন কিছু নয়। কারণ এ বোল্টন যে ট্রাম্পের মেয়াদের শুরু থেকেই জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার আসনে বসে ট্রাম্পকে এসব বুদ্ধি দিয়ে এসেছেন, তা নয়। বরং তিনি মাত্র গত বছরেই এ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। ট্রাম্পের পাশে এমন কিছু যুদ্ধবাজ কর্মকর্তার অবস্থান ছিল সব সময়েই। তাদের সরিয়েই বোল্টনকে ওই পদে বসিয়েছিলেন ট্রাম্প। আবার জন বোল্টনকে সরিয়ে নেয়ার মাধ্যমেই যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের মতিগতি যে পাল্টে যাচ্ছে তার বিন্দুমাত্র নিশ্চয়তা নেই। বরং এ আশঙ্কাও রয়েছে যে, হয়তো ট্রাম্প বোল্টনের চেয়ে আরো যুদ্ধবাজ কাউকে খুঁজে পেয়েছেন ওই পদের জন্য। একই কথা প্রযোজ্য আর অন্য সব কথার ক্ষেত্রেও।

কারণ এর আগেও ট্রাম্প অগণিত যে পরিবর্তন এনেছেন তার প্রশাসনে, তাতে ট্রাম্প বা মার্কিন প্রশাসন কোনোটিতেই দৃষ্টিভঙ্গি সামান্যতম পরিবর্তন আসেনি। ফলে ভবিষ্যতেও যে এর চেয়ে ভালো কোনো ফল আসবে অথবা যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি ইরানের পক্ষে যাবে, সে আশা আপাতত না করাই ভালো।


আরো সংবাদ