১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সমাজব্যবস্থা ও নাগরিক অধিকার

সম্রাট সাইরাস এবং তার সুযোগ্য পুত্র দারিয়ুস পারস্যের বৃহৎ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পথিকৃৎ। পারস্য সাম্রাজ্যের পশ্চিমে বিস্তৃতিকালে সুসভ্য গ্রিক নগর রাষ্ট্রগুলোর বাধার মুখে পড়ে। স্পার্টার পদাতিক বাহিনীর নেতৃত্বে গ্রিক জোট নৌ-পরাজয়ের সম্মুখীন হলে এথেন্স নৌশক্তি অর্জন করে পারস্য শক্তিকে পরাজিত করে। এথেন্স নৌশক্তিকে ব্যবহার করে নগর রাষ্ট্রগুলোর বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। পেরিক্লিস যুগে তা পূর্ণতা লাভ করে। মেসিডোনিয়ার রাজা ফিলিপ ও তার পুত্র আলেকজান্ডার গ্রিক নগররাষ্ট্রগুলোকে অধিগ্রহণ করে পূর্বে পারস্য পেরিয়ে পাঞ্জাব এবং দক্ষিণে মেসোপটেমিয়া (ইরাক) পেরিয়ে মিসর পর্যন্ত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। রোমানরা রাজার যুগ ও প্রজাতন্ত্রের যুগ পেরিয়ে সম্রাটের যুগে সেকালের বৃহত্তম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে।

ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর মৃত্যুর পর উমাইয়া বংশের রাজতন্ত্র পশ্চিমে স্পেন থেকে পূর্বে ভারত বর্ষ পর্যন্ত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। তাতাররা কৃষ্ণ সাগর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত বিশাল সাম্রাজ্য কায়েম করে। শিল্প বিপ্লবের পর ইউরোপ সমগ্র পৃথিবী দখল করে নেয়। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে সমগ্র পৃথিবীর ‘অঘোষিত নেতা’ হিসেবে আবির্ভূত হলো। পৃথিবীর ইতিহাসে সব সাম্রাজ্যই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এবং শোষণের উদ্দেশ্যে। বিজিত রাষ্ট্রের সম্পদ লুট এবং জনগণকে দাসে পরিণত করে বিজয়ীরা ভোগে মত্ত থেকেছে।

আবার রাজা ও অভিজাতরা নিজ রাজ্যের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে নির্যাতন ও শোষণ করে এসেছে। প্রাচীন যুগের ধর্ম ও আইন অনেক ক্ষেত্রে অভিজাতদের ভোগ ও শোষণে ভূমিকা রেখেছে। বিকৃত ধর্ম ছিল অভিজাতদের রক্ষাকবচ। আর আইন ছিল নিম্ন শ্রেণীর মেনে চলার বিষয়। সভ্যতার ইতিহাসে গ্রিক সভ্যতা দর্শনের অগ্রগতির ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখলেও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি। অবশ্য এথেন্সের নেতা সোলন নাগরিকদের জন্য আইন প্রণয়ন করে স্মরণীয় হয়ে আছেন। তবে গ্রিক সভ্যতা দাস শ্রেণীর শ্রমের ওপর নির্ভরশীল ছিল। অশিক্ষিত রোমানরা নিজেদের অভিজাত অবস্থান রক্ষার জন্য আইন তৈরি করেছে অসংখ্য।

দ্বিতীয় শ্রেণীর ‘প্লেবিয়ান’রা বারবার বিদ্রোহ করে নিজেদের অধিকার কিছুটা অর্জন করেছিল আইনের স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে। তারপরও সিভিল আইন পুরো সুবিধা দিয়ে গেছে অভিজাতদেরকেই। আগের দিনের ছোট ভূমির অধিকারীরা অধিকার হারিয়েছে রোমান আইনের কারণে। অভিজাতদের বড় ভূমির অধিকার দেয়া হয়েছে ছোটদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে। অপর দিকে মুসলিম শাসন বিস্তৃতি লাভ করেছিল সাম্যের শাসনের কারণে; দাস প্রথা অবৈধ এবং সম্পত্তিতে নারীদের অধিকার ঘোষণার মধ্য দিয়ে। কিন্তু খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগের পর উমাইয়া, আব্বাসীয়, ফাতেমি, মামলুক ও ওসমানীয় যুগে করের ভার জনগণকে বহন করতে হতো। ইউরোপীয় যুগে রাজার জায়গা দখল করে নেয় বণিকেরা। তারা প্রথমত ছিল সামন্ত প্রভু যারা বেশির ভাগ ভূমির মালিক ছিল।

পরবর্তীকালে শিল্পে বিপুল পুঁজি বিনিয়োগ করে পুঁজিপতি হলো। কারখানার উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য বিশ্বব্যাপী কলোনি প্রতিষ্ঠা করে তারা। এক দিকে পণ্য বিক্রয়; অন্য দিকে কলোনির ভূমিতে সামন্ত প্রথা প্রচলন করে খাজনা আদায়ের। সহযোগী সামন্ত জমিদাররা ভোগ ও বিলাসী জীবন যাপন করত। আর সাধারণ উপনিবেশ বা জনগণ শোষণ ও শাসনে পিষ্ট হতে থাকে। কলোনির শোষিত জনগণ নিজেদের অধিকার আদায়ে অনবরত সংগ্রাম করতে থাকে।

ফলে ইউরোপীয়রা তাদের স্বাধীনতা দিতে এক পর্যায়ে বাধ্য হয়। ১৯৪৭-এর স্বাধীনতার পর পাকিস্তান সরকার জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অকৃষি প্রজাস্বত্ব আইন ও কৃষি প্রজাস্বত্ব আইন প্রণয়ন করেছিল। এতে জনগণ ভূমির অধিকার পায়। এ রকমটা ঘটে সমগ্র বিশ্বব্যাপী। অন্য দিকে, পুঁজিপতিরা কৌশল পরিবর্তন করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বায়নের ধারণা বিপণন করতে থাকে। ১৯৭০-এর দশকে বাণিজ্যে আরো লাভের আশায় বিনিয়োগের ধারণা উদ্ভাবন করা হয়। আজ পুঁজিপতিরা স্বাধীন ও গরিব দেশগুলোর সস্তা শ্রম ব্যবহার করে উৎপাদন খরচ কমিয়ে আরো বেশি লাভ করার ব্যস্ত। আর গরিব দেশগুলোর রাজনীতিবিদেরা নিজেদের লাভের আশায় বিনিয়োগের প্রতি আকৃষ্ট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাণিজ্যিক আইন নতুন করে তৈরি হলো পুঁজিপতিদের স্বার্থে। আর রাজনীতিবিদেরা এতে সহযোগিতা করেছে তাদের সহযোগী হয়ে।

পারস্য সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়েছিল বীর আলেকজান্ডারের আক্রমণে। তার সাম্রাজ্য ভেঙে পড়েছিল স্থানীয়দের সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দিয়ে। রোম সাম্রাজ্য ভেঙে পড়েছিল সেনাবাহিনীতে জার্মানদের অন্তর্ভুক্ত করে। আব্বাসীয় খেলাফত ভেঙে পড়েছিল তুর্কিদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করে। ইউরোপিয়ানরাও সাম্রাজ্য হারিয়েছে সেনাবাহিনীর স্থানীয় সদস্যদের বিরোধিতার কারণে। আজো গণতান্ত্রিক সব সরকারের নির্ভরশীলতার ভিত্তি সে দেশের সেনাবাহিনী। বলা যায় স্বৈরতন্ত্র ও পুঁজিবাদের রক্ষক বিলাসী সেনাবাহিনী।

আজ পর্যন্ত অধিকার আদায়ে পৃথিবীতে দু’টি প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গণ-আন্দোলন ও ত্যাগ এবং বিচার বিভাগের যুগান্তকারী রায়। সংবিধান তথা অধিকারের প্রথম সনদ ‘ম্যাগনাকার্টা’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রাজাদের বিরুদ্ধে সামন্তদের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে, ব্রিটেনে অলিভার ক্রমওয়েলের পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে, ফরাসি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে। আর রোমান শাসনামলে বিচার বিভাগে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং ব্রিটিশ চ্যান্সেরি কোর্টে ন্যায়পরায়ণতার নীতি প্রয়োগ করা হয়।

লেখক : আইনজীবী, জজকোর্ট, ঢাকা
ই-মেইল : [email protected]


আরো সংবাদ