film izle
esans aroma Umraniye evden eve nakliyat gebze evden eve nakliyat Ezhel Şarkıları indirEzhel mp3 indir, Ezhel albüm şarkı indir mobilhttps://guncelmp3indir.com Entrumpelung wien Installateur Notdienst Wien webtekno bodrum villa kiralama
২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০

এক বিরল প্রতিভার তিরোধান

মীজানুর রহমান শেলী - ছবি : সংগ্রহ

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী বিরল ব্যক্তিত্ব ড. মীজানুর রহমান শেলী আর নেই। গত ১২ আগস্ট ঈদুল আজহার দিন সবাই যখন ঈদুল আজহা উদযাপনে ব্যস্ত, ঠিক তখন অনেককে কাঁদিয়ে অগণিত বন্ধু-বান্ধব শুভানুধ্যায়ী রেখে শেলী ভাই চলে গেলেন না ফেরার জগতে।

অতীতে সংবাদপত্র হিসেবে ইংরেজি পত্রিকা পাঠকদের প্রিয় ছিল পাকিস্তান অবজারভার, হলিডে এবং মাসিক ‘কনসেপ্ট’ ম্যাগাজিন। এনায়েত উল্লাহ খানের অতুলনীয় ইংরেজিসমৃদ্ধ সাপ্তাহিক হলিডে পড়ার নিত্যসঙ্গী ছিল একটি ডিকশনারি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সময়কার ‘স্টার’ মীজানুর রহমান শেলী সম্পাদিত, মাসিক কনসেপ্ট অব পাকিস্তান ছিল মেধাবী ছাত্রদের প্রিয় ম্যাগাজিন। বিশেষ করে তৎকালীন সিএসএস (সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিস) বা ইপিসিএস (ইস্ট পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস) পরীক্ষার সাফল্যপ্রত্যাশীদের অবশ্য পাঠ্য ম্যাগাজিন ছিল এটি। কারণ শেলীর লেখা ছিল দুর্বোধ্য শব্দমুক্ত কিন্তু সাবলীল, Lucid এবং Prolific। তার লেখা পাঠককে আকৃষ্ট করত এবং এগিয়ে নিয়ে যেত। সেদিনের কনসেপ্ট তদানীন্তন পাকিস্তানের দুই অংশের বাইরে বিদেশেও স্থান করে নিয়েছিল। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে এর প্রচুর পাঠক ছিলেন। এই দুই দেশের লাইব্রেরিতে কনসেপ্টের দুর্লভ কপি আজো পাওয়া যায়।
মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের প্রিয় ‘কনসেপ্ট’ পড়া হতো ইংরেজি শেখার জন্য। শেলী ছিলেন আমাদের মতো সিএসএস প্রার্থীদের মডেল। মাসিক কনসেপ্টের মালিক তথা প্রকাশক ছিলেন ওই সময়কার দুই উদীয়মান তরুণ জাকী-মোশাররফ জুটি। পরে জাকী উদ্দিন আহমদ স্বনামধন্য ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি জাকী-মোশাররফ গ্রুপের চেয়ারম্যান জাকীর বন্ধু মোশাররফ হোসেন (পরে এমপি) ছিলেন কনসেপ্টের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক। দুই বন্ধুর ব্যবসায়িক সম্পর্ক যুগযুগান্তর ধরে ছিল কিংবদন্তিতুল্য।

কোরবানের ঈদের নামাজ আদায় করে এসএমএস করে জাকী ভাইকে ঈদের শুভেচ্ছা জানালাম। কিন্তু বরাবরের মতো কোনো জবাব দিলেন না। ভাবলাম হয়তো বা কোরবানি নিয়ে ব্যস্ত। জবাব দেয়ার ফুরসত ছিল না। তাই আর ফোন করিনি জাকী ভাইকে। পরদিন কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে আমার মোবাইল ফোনে একটি কণ্ঠ ভেসে এলো; ওদিক থেকে জাকী ভাই বলছেন, ইবরাহিম, আমাদের প্রিয় শেলী আর নেই। শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম, আমি নিজেও নিস্তব্ধ- আমাদের প্রিয় শেলী ভাই সত্যিই আর নেই।

বৃহস্পতিবার (১৫ আগস্ট) বাদ জোহর তাদের গ্রিন রোডের বাড়ির সামনে ডরমিটরি মসজিদে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। ড. কামাল হোসেন, রাশেদ খান মেনন, মোজাফফর হোসেন পল্টু, রাষ্ট্রদূত মুহাম্মদ জমির, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. সাদত হুসাইনসহ বহু রাজনৈতিক নেতা ও অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র আমলা জানাজায় অংশ নেন। সরকারের অনেক সচিবও জানাজায় অংশগ্রহণ করেছেন। অনেকেই বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে জানাজা আয়োজন না করার জন্য আক্ষেপ করলে শেলী ভাইয়ের ছেলে তামজিদ বিন মিজান বলেন, ‘এ মসজিদে আমার বাবা বিগত ৫০ বছর নামাজ আদায় করেছেন। এ মসজিদের মুসল্লিদের আবেগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং তাদের দাবিতে আমরা এখানেই জানাজার ব্যবস্থা করেছি।’ যা হোক, জানাজায় দলমত নির্বিশেষে সব শ্রেণীর মানুষ অংশগ্রহণ করেন। পাঁচ তলা মসজিদ কানায় কানায় ভরে পাশের রাস্তায়ও মুসল্লিদের সঙ্কুলান হচ্ছিল না।

১৯৪৩ সালে মুন্সীগঞ্জের কুসুমপুর গ্রামে শেলীর জন্ম। ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মীজানুর রহমান শেলী ইন্তেকাল করেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। শিক্ষাজীবনে এসএসসি পরীক্ষায় ২০তম হলেও এইচএসসি থেকে বিএ (অনার্স) হয়ে এমএ পর্যন্ত প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকারের ধারা অব্যাহত রাখেন তিনি। তৎকালীন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় তিনি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সম্মিলিত মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিলেন। লেখাপড়া শেষ করেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বীয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। আমি ছিলাম ইতিহাসের ছাত্র আর একটি সাবসিডিয়ারি বিষয় ছিল রাষ্ট্রবিজ্ঞান। সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জুয়েল’ মিজানুর রহমান শেলীর লেকচার শোনার ক্ষেত্রে কমবেশি সব নবীন শিক্ষার্থীরই আকাক্সক্ষা ছিল। বিষয়ের মিল না থাকলে তো সে আকাক্সক্ষা পূরণ হওয়ার সুযোগ থাকে না। আমার সাবসিডিয়ারি বিষয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান হওয়ার কারণে সেই সুযোগ হয়েছিল। শেলী ভাই আমাদের সাবসিডিয়ারি ক্লাস নিতেন। ক্লাসে তার লেকচার, বাচনভঙ্গি, ইংরেজি উচ্চারণ ছিল অসাধারণ। মন্ত্রমুগ্ধের মতো আমরা তার বক্তব্য শুনতাম।

১৯৬৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে শেলী পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগ দিলে আমরা তার অসাধারণ লেকচার থেকে বঞ্চিত হলাম। সরকারি চাকরির ফাঁকে শেলী লন্ডন ইউনিভার্সিটি থেকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়ে পিএইচডি অর্জন করেছেন। চাকরি জীবনে সর্বশেষ অবস্থান হিসেবে সরকারের সমাজকল্যাণ অধিদফতরের মহাপরিচালক (যুগ্ম সচিব) ছিলেন। আমলাতন্ত্রের গণ্ডি থেকে বের হয়ে বৃহত্তর পরিসরে নিজেকে সমৃদ্ধ করার মানসে ১৯৮০ সালে লোভনীয় সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দেন। ’৮০-এর দশকের শেষ দিকে তিনি দেশের নির্দলীয় টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। অবসর নিয়েই তিনি লেখাপড়া ও গবেষণায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তিনি উন্নয়ন ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিডিআরবির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং ‘এশিয়ান অ্যাফেয়ারস’ সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ বাংলাদেশ নামে আন্তর্জাতিক মানের সাময়িকীর সম্পাদক ছিলেন।

সাপ্তাহিক সচিত্র স্বদেশের উপদেষ্টা সম্পাদক ছাড়াও ইংরেজি দৈনিক বাংলাদেশ টাইমসের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন মীজানুর রহমান শেলী। তিনি একাধিক জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত কলাম লিখতেন। তিনি প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানির চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে একাধিক বই লিখেছেন। ২০০৮ সালে তাকে বাংলা একাডেমি ফেলোশিপ দেয়া হয়। তিনি আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ বা এআইবিএ’সর ওভারসিজ ডাইরেক্টর ছিলেন। এটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের ১৮টি ইউনিভার্সিটি ও কলেজের একটি অ্যাসোসিয়েশন, যাদের কাজ হলো শিক্ষা ও গবেষণা। তিনি ছিলেন ঢাকা সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রধান উপদেষ্টা। ১৯৭৮ সালে আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক সামাজিক প্রতিষ্ঠান যেমন ন্যাশনাল এডুকেশন অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল (১৯৭৮), বাংলাদেশ জেল রিফর্মস কমিশন (১৯৭৮-৮০), ফিল্ম সেন্সর বোর্ড (৮৫-৮৬), ন্যাশনাল ডিজেস্টার প্রিভেনশন কাউন্সিল (৮৮-৯০), ন্যাশনাল পপুলেশন কাউন্সিল (৮৯-৯০) এবং সংবাদপত্র কর্মচারীদের বেতন কাঠামো নির্ধারণের জন্য গঠিত চতুর্থ ওয়েজ বোর্ড (৮৯-৯০)-এর সদস্য ছিলেন। মেধা ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ পোল্যান্ডের নেতা নোবেল বিজয়ী লেস ওয়ালেসা কর্তৃক পোলিশ অর্ডার অব মেরিট অর্জন করেছেন। শেষ জীবনে শোকাতুর হয়ে পড়েন ড. শেলী। কারণ তিনি পরপর স্ত্রী, তিনজন আপন ভাই ও বোনকে হারিয়ে এক প্রকার নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন। একমাত্র ছোট ভাই টিপু ও বড় ছেলে আরিফ ছিল শেষ জীবনের সঙ্গী। ছোট ছেলে আমেরিকায় বসবাসরত। তার অনেক বন্ধুর মধ্যে এক বন্ধু, বর্তমানে অন্যতম নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেছেন, ‘শেলীর সঙ্গে আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় কেটেছে ১৯৭৭ সালে লন্ডনে ও জ্যামাইকার কিংস্টনে। সে বছর জ্যামাইকায় অনুষ্ঠিত হয় প্রথম কমনওয়েলথ যুব সম্মেলন। কমলওয়েলথভুক্ত দেশগুলো থেকে যুব নেতারা ওই সম্মেলনে যোগ দিতে কিংস্টনে সমবেত হয়। অনেকে তাদের দেশের মন্ত্রী বা এমপি। এদের সবার বয়স ৩৫ বছরের নিচে। সম্মেলনে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করি আমি এবং ড. শেলী। ড. শেলী বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ দফতরের পরিচালক আর আমি সংস্কৃতি ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপসচিব। দুই সদস্যবিশিষ্ট প্রতিনিধিদলের শেলী ছিলেন দলনেতা। আমাদের সম্মেলন ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে সাত দিন ধরে চলে। প্রায় প্রতিটি সেশনে শেলী অসাধারণ বক্তব্য রেখেছে। ওর শব্দচয়ন, কথনভঙ্গি ও রসজ্ঞান তুলনাহীন। শেলী বক্তৃতায় কমনওয়েলথ যুব প্রতিনিধিদের মাতিয়ে রেখেছিল। ফলে সম্মেলনের কয়েক দিনের মধ্যেই বিভিন্ন দেশের যুব প্রতিনিধিদের সাথে আমাদের বন্ধুত্ব হয়ে যায়। বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করা আমাদের সার্থক হয়েছিল (প্রথম আলো, ১৭ আগস্ট ২০১৯)।

ব্যক্তিগতভাবে ড. শেলী ছিলেন ভদ্র, অমায়িক, সদালাপী, নিরহঙ্কার, বন্ধুবৎসল সজ্জন। বিখ্যাত বন্ধুজুটি, জাকী-মোশাররফের অতি প্রিয় শেলী ছিলেন তাদের মতো আড্ডাপ্রিয়। নিজের অতি প্রয়োজনীয় কাজ রেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডায় সময় কাটাতেন। আসর মাতিয়ে রাখতেন। একবার পরিচয় হলে তার বন্ধু হয়ে যেতে হতো। জাকী ভাইয়ের মাধ্যমে পরিচয় হলে আমিও তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন হয়ে যাই। একবার সান্নিধ্যে এলে আর ভোলা যায় না এই ক্ষণজন্মা বন্ধুবৎসল মানুষটিকে। এমন প্রতিভাবান সংস্কৃতিবান নিরহঙ্কার দুর্লভ প্রতিভা আমাদের সমাজে সত্যি বিরল।


আরো সংবাদ