১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

যা নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংসের লক্ষ্যে ঘটেছিল

-

‘এক-এগারো’র সরকারের দুই বছরের (২০০৭-০৮) কর্মকাণ্ডের সুবিধাভোগী আওয়ামী লীগ+জাপা সরকারের অধীনে তাদের নিয়োগকৃত কাজী রকিব উদ্দিন আহমদ ও কে এম নুরুল হুদার নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় ২০১৪-এর ৫ জানুয়ারি ও ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচন। সে সময়ে প্রশাসন, পুলিশ ও পোলিং অফিসারদের সার্বিক কর্মকাণ্ডের নিরিখে এবং সরকার সমর্থক বুদ্ধিজীবী, সুশীলসমাজের ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে জেনারেল মইন উ. আহমেদ ও তার সহযোগীদের ঘটানো এক-এগারোর নেপথ্য লক্ষ্য পরিস্ফুটিত হয়ে ওঠে। তাদের লক্ষ্য ছিল তিনটি- ১. ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি প্রস্তাবিত নবম সংসদ নির্বাচনকে একতরফা আখ্যা দিয়ে তা বন্ধ করা; ২). নির্বাচনের নামে প্রধানত আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসানো এবং

(৩) ’৯০-এর গণআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত এরশাদের ক্ষমতাচ্যুতির এক ধরনের প্রতিশোধ নেয়া। এক-এগারো সম্পর্কে সাবেক জাসদ নেতা ও লেখক গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদের লেখায় জেনারেল মইনের সাক্ষাৎকারের যে বিবরণ দেয়া হয়েছে তা হতে বোঝা যায়, ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির প্রস্তাবিত সংসদ নির্বাচনে এরশাদের মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ১৪ দল তাদের সব মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেয়ার ফলে ৩০টি আসনে প্রার্থীরা (১৫৪টি নয়) বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় ওই নির্বাচন ‘একতরফা’ হয়ে গিয়েছিল।

তাই ‘একতরফা নির্বাচন’ বন্ধ করে সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন না হলে জাতিসঙ্ঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে কর্মরত ১০-১৫ হাজার বাংলাদেশী সেনাসদস্যকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হবে বলে জাতিসঙ্ঘ এক পত্রে মইনকে জানিয়েছিল। আর তারা দেশে ফিরে এলে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতে পারে বিধায় তিনি ২২ জানুয়ারির নির্বাচন স্থগিত করার লক্ষ্যে বঙ্গভবনে গিয়ে জরুরি অবস্থা জারি এবং ড. ফখরুদ্দিন আহমেদকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করতে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দীন আহমেদকে সম্মত করিয়েছিলেন। একইভাবে সেনাপ্রধান এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ বঙ্গভবনে গিয়ে, মাত্র পাঁচ মাস আগে জনগণের ভোটে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে পদত্যাগে বাধ্য করে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে রাজি করিয়েছিলেন।

তেমনি ছিল জেনারেল মইনের ‘এক-এগারো’। কাকতালীয় ব্যাপার হচ্ছে, ১৯৮২ সালে যারা এরশাদকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন ২৫ বছর পরে তারাই মইনকেও অভিনন্দন জানালেন। ‘এক-এগারো’ ঘটিয়ে বলা হলো- দুই বছরের মধ্যে ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা তৈরি করে গণতন্ত্রের লাইনচ্যুত ট্রেনটি সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের মাধ্যমে সঠিক ট্র্যাকে তুলে দিয়ে বিদায় নেয়াই অস্থায়ী সরকারের একমাত্র লক্ষ্য। সাথে সাথে ১৪ দল ও তাদের সমর্থক বুদ্ধিজীবী, সুশীলসমাজ কোরাস গেয়ে ওঠে, ঠিক ঠিক তাই তাই।

১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে থাকা সত্ত্বেও ’৯১-এর নির্বাচনে ৯০টি আসন তারা পেয়েছিল, অথচ একই দল ’৯৬-এর নির্বাচনে ১৪০টি আসন পেয়েছিল। জাতীয় পার্টির সহায়তায় দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতাসীন হয়ে পাঁচ বছর দেশ শাসন করার পর ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আসন সংখ্যা ১৪০ থেকে মাত্র ৬০ এ নেমে আসে। সেবার জাতীয় পার্টির আসন সংখ্যা নেমে আসে ৩৫ থেকে ১৪ তে। আর এই নির্বাচনের ফল বাতিলের জন্য আওয়ামী লীগ তাদেরই নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদকে অনুরোধ জানিয়ে ব্যর্থ হয়ে ছিল। তারা তখনই সিদ্ধান্ত নেন, ক্ষমতায় তারা যেতে পারলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে নির্বাচনে আর তাদের পরাজিত হতে না হয়।

সেই লক্ষ্যেই সংসদের কমপক্ষে ২০০টি আসনে ‘জয়’ করায়ত্ব করতে ড. ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ‘১০০ শতাংশ নিরপেক্ষতা’র দাবিতে আন্দোলন করে মইন ও মাসুদের সহায়তায় এক-এগারো ঘটার পথ সুগম করা হলো। ৭৩০ দিনব্যাপী জনগণের মগজ ধোলাই করে ২০০৮ সালে ২৯ ডিসেম্বর অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের নামে আওয়ামী লীগ ও জাপা ২৬৫টি আসনে জয় লাভ করার পর অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের গ্যারান্টি ক্লজ, তথা সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ৩০ জুন ২০১১ পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের মাধ্যমে সংবিধান থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। অথচ এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানের দাবিতে আওয়ামী লীগ, জাপা ও জামায়াতের ১৪৭ জন এমপি ১৯৯৪ সালে জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগ করে ’৯৬-এর মার্চ পর্যন্ত ১৭৩ দিন হরতাল পালন করেছে।

তখন সচিব মহিউদ্দিন খান আলমগীরের নেতৃত্বে সরকারি কর্মচারীদের ‘বিদ্রোহ’ ঘটানো হয়। এ পরিস্থিতিতে দাবি মেনে বিএনপি সরকারকে ৩০ মার্চ ১৯৯৬ পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল। তৎকালীন সেনাপ্রধান লে. জেনারেল নাসিম বেগম জিয়ার বিএনপি সরকারকে সমর্থন না দেয়ায় সরকার পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিল। যেমন- ’৯০-এর গণআন্দোলনের সময় সেনাপ্রধান, নূর উদ্দিন (যিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের সমর্থক) দেখলেন, এরশাদের পতন হলে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হবে। তাই তিনি জেনারেল এরশাদ সরকারের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।

ফলে এরশাদ পদত্যাগে বাধ্য। অবসর গ্রহণের পর জেনারেল নুরুদ্দিনের আওয়ামী লীগে যোগদান ও মন্ত্রী হওয়া কী প্রমাণ করে। রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন, মইন ও মাসুদের ভয়ে জরুরি অবস্থা জারি এবং ফখরুদ্দিনকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করে তার সমর্থিত দল বিএনপিকে ‘যোগ্য প্রতিদান’ দিয়েছিলেন। অপরদিকে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরে রিভলবার হারানো তৎকালীন ক্যাপ্টেন মইন উ আহমেদকে ৩০ বছর পরে ২০০৫ সালে সেনাপ্রধান নিয়োগ করা হয়। ১৯৭৫ সালে রক্ষীবাহিনীর ডেপুটি লিডার পদ থেকে সেনাবাহিনীতে আগত মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে ২০০৫ সালে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে নবম ডিভিশনের জিওসি হিসেবে সাভার ক্যান্টনমেন্টে পোস্টিং দেয়া হয় প্রতিদান দিয়েছেন এই দুই জেনারেল ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বঙ্গভবনে একপ্রকার অভিযান চালিয়ে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ মইনের সেনাপ্রধানের চাকরির মেয়াদ ২০০৯ সালের জুন পর্যন্ত বৃদ্ধির অনুমোদন দিয়ে ছিল এবং মাসুদের চাকরির মেয়াদ পাঁচ বছর বৃদ্ধিপূর্বক তাকে রাষ্ট্রদূত করে রেখেছিল।

শুধু তাই নয়, ২০১৮ সালের মধ্য রাতের নির্বাচনে ফেনীর আসন হতে জাপার মনোনয়ন প্রার্থী সোনাগাজী-দাগনভূঁইয়া এবং জয় নিশ্চিত করতে সরকার সহায়তা করায় তিনিও আজ এমপি। এভাবেই তাদের পুরস্কৃত করা প্রমাণ করে যে, এক-এগারো হয়েছিল ছবিযুক্ত ভোটার তালিকার ওয়ান টাইম ব্যবহার করে ওয়ান টাইম অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের নামে বিশেষ দলকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য, যাতে পরে নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের কেউ পরাজিত করতে না পারে। ২০১৪ এর ৫ জানুয়ারি এবং ২০১৮ এর মধ্যরাতের নির্বাচন কিরূপ হয়েছে তা ঢাকা শহরে ১৫টি সংসদীয় আসনের নির্বাচনী ফলাফল দেখেই বোঝা যায়। কারণ ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে ঢাকা শহরের কোনো আসনেই কোনো প্রার্থী বর্তমান, পরপর দুইবার নির্বাচিত হতে পারেননি। এমনকি প্রধানমন্ত্রীও ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ঢাকা শহরে তার দুটি আসনেই পরাজিত হয়েছিলেন। অথচ ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে ২০০৮ সালের জয়ী সব প্রার্থী পরপর তিনবার পুনর্নির্বাচিত হওয়ার রেকর্ড গড়েছেন। এখন জাতিসঙ্ঘ, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহ এবং আওয়ামীলীগ সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা নিশ্চুপ কেন?

‘এক-এগারো’র ফলে দেশের রাজনীতি একাধিক নির্বাচন ও নির্বাচন কমিশনের ক্ষেত্রে তিনটি বড় রকমের পরিবর্তন ঘটেছে। (১) নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের পরাজিত করা পথ রুদ্ধ হয়েছে (২) নির্বাচনকে প্রভাবিত করার একমাত্র হাতিয়ার, নির্বাচনকালে ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতায় থাকার অধিকার অর্জিত হয়েছে এবং কাজেই এক-এগারোর কুশীলবদের সব উদ্দেশ্য সফল হওয়ায় পতিত স্বৈরাচারী নির্বাচিত নেতা হিসেবে মৃত্যুবরণের সৌভাগ্য হলেও জনগণের ভোটের অধিকার প্রয়োগের বিষয় তিমিরেই রয়ে গেল। তারা আবার জানে না কবে আবার স্বাধীনভাবে তা প্রয়োগ করতে পারবেন।


আরো সংবাদ