১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

রাজার দোষে রাজ্য নষ্ট, প্রজা কষ্ট পায়

-

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ঘোষণা করেছেন- কোনো ব্যক্তি বা কোনো জাতি যতক্ষণ পর্যন্ত তার বা তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তার বা তাদের ভাগ্য পরিবর্তন করে দেবেন না। পবিত্র গ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ আরো ঘোষণা করেছেন, যে জাতি অত্যাচারী হবে সে জাতির ওপর অত্যাচারী এবং জালিম শাসক চাপিয়ে দেয়া হবে। হজরত আবদুুল কাদের জিলানি র.-এর একটি বাণী এখানে উল্লেখ করছি। তিনি বলেছেন, ‘যে যেমন কর্ম করবে, সে তেমন ফল ভোগ করবে।’ অনেক পণ্ডিত বলে গেছেন ‘রাজার দোষে রাজ্য নষ্ট, প্রজা কষ্ট পায়।’

প্রায় রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শাসক নির্বাচিত হচ্ছে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতি হচ্ছে- ভোটে জনগণ তাদের মনমতো প্রার্থী বা শাসক দলকে নির্বাচিত করে থাকে। ভোট হচ্ছে প্রতিটি নাগরিকের কাছে পবিত্র আমানত। এটা অপাত্রে দিলে ভোটদাতাকে অবশ্যই জবাব দিতে হবে। কারণ অপাত্রে ভোট দেয়ার কারণে এমন একজন ক্ষমতাসীন হতে পারে, দেশবাসী তার কুশাসনের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত ও সর্বস্বান্ত হবে। তাতে দেশে চরম অশান্তি নেমে আসবে। অসৎ ও অপরাধী প্রার্থীকে ভোট দিলে সে জন্য অবশ্যই আল্লাহর দেয়া শাস্তি ভোগ করতে হবে।
শাসক গণতন্ত্রের লেবাস পরা নকল রাজা সাজলে তা হবে বিরাট অন্যায়। যখন কারো ন্যায্য অধিকার ক্ষমতার জোরে কেড়ে নেয়া হয়, তখন আল্লাহ চুপ করে বসে থাকতে পারেন না। ভুললে চলবে না, আল্লাহ সর্বদাই মজলুমের আবেদন কবুল করে থাকেন।

দেশে যা চলছে, আমার ৬৮ বছর বয়সে আগে কখনো তা দেখিনি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান পর্যন্ত ছাত্রীকে ধর্ষণ করছে, জীবন্ত পুড়িয়ে মেরে ফেলছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সর্বত্রই চলছে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ। শিশুদের ধর্ষণ করে হত্যা করা হচ্ছে। রাজপথে রামদা দিয়ে কুপিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে। গাড়িতে নারীরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এদিকে ভিন্ন মতাদর্শীদের রাস্তায় নামতে বাধা দেয়া হচ্ছে। সভা-সমাবেশ করতে পুলিশের অনুমতি নিতে হচ্ছে। তার পরও বাধার সম্মুুখীন হতে হচ্ছে। এ সবই ‘নকল রাজা’র শাষণে সম্ভব। সব চেয়ে বড় অন্যায়, সরকারি কর্মচারীদের ঘুষ খাওয়া এবং অযোগ্য লোকদের ঘুষের বদলে নিয়োগ দেয়া।

দেশে রাজা নেই, রাজতন্ত্র নেই। তা হলে রাজার দোষে এসব ঘটছে বলা কি সঠিক হচ্ছে? এ কথার উত্তর পেতে হলে গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের দিকে তাকাতে হবে। একমাত্র ক্ষমতাসীনদের নেতৃত্বে গড়া জোটের প্রার্থীরা ছাড়া অন্য কোনো দল বা জোটের প্রার্থীদের প্রচার চালাতে দেয়া হলো না। ঢাকা শহরে এক রাজনৈতিক নেতা ও নেত্রী দম্পতিকে শারীরিকভাবে পর্যন্ত লাঞ্ছিত করা হলো প্রচার মিছিলে। এভাবে সারা দেশে সরকার নির্যাতন চালিয়ে পরিবেশকে কলুষিত করে ফেলল। ঢাকা শহরে ২৯ ডিসেম্বর বিকাল থেকে সৃষ্টি করা হলো জনমনে চরম আতঙ্ক। রাতের প্রথম প্রহরেই ভোটকেন্দ্রে প্রিজাইডিং অফিসারদের সহযোগিতায় অন্তত ৫০ শতাংশ ব্যালটে নৌকা মার্কায় সিল মেরে বাক্সে ঢুকিয়ে রাখা হয়। যেখানে প্রতিপক্ষ শক্তিশালী, সেখানে পুলিশের বাধার সম্মুখীন হতে হলো।

পরদিন ভোটের সময়ে বিরোধী দলের পোলিং এজেন্টদের ভোটকেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হলো। কোনো কোনো কেন্দ্রে প্রবেশই করতে দেয়া হলো না। কোথাও কোথাও বিরোধী প্রার্থীকে গুলি করে আহত করে কেন্দ্রছাড়া করা হলো। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিতে বাধ্য হলো। এ সুযোগে সরকারি জোট একচেটিয়া ‘জয়লাভ’ করল। প্রতিটি কেন্দ্রে অবিশ্বাস্যরকম গোঁজামিলের প্রমাণ পাওয়া যায়। সারা দেশের ভোটনৈরাজ্যের চিত্র বিভিন্ন দল ও প্রতিষ্ঠান প্রচার করা শুরু করল। এ নির্বাচনের বিরূপ প্রভাব বিভিন্ন বিদেশী মিডিয়ায়। একটি প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনী জরিপ রিপোর্ট তুলে ধরছি। বিবেকবান মানুষ বলতে বাধ্য হবে- এ নির্বাচন পুরোপুরি ভাঁওতাবাজি। এর সাথে জড়িত সব সরকারি কর্মচারীকে বিচারের আওতায় আনা অপরিহার্য।

সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, এ নির্বাচনে চরম অনিয়ম হয়েছে। তিনি বলেন, মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে অনুরোধ, তিনি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে এ অনিয়মের অভিযোগগুলো তদন্ত করে, যারা দায়ী বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন, তাদের বিরুদ্ধে যেন ব্যবস্থা নেয়া হয়। নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। মানুষের মধ্যে অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা বদলের পথ রুদ্ধ হয়ে যেন না যায়।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, বিদেশী বিভিন্ন অরগানাইজেশন যখন বাংলাদেশ সম্পর্কে নেগেটিভ রিপোর্ট করে, তখন মন্ত্রীদের অনেকে বলেন যে, তাদের তথ্যের উৎস সম্পর্কে আমাদের সন্দেহ আছে। তবে নির্বাচনী তথ্যের ব্যাপারে তো সরকার বলতে পারবে না যে, উৎস সম্পর্কে সন্দেহ আছে। খোদ নির্বাচন কমিশন জালিয়াতি করেছে। এ বিষয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের দাবি সমর্থন করছি। সাংবিধানিক পদের কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি যদি মনে করেন যে, অসদাচরণের অভিযোগের কিছুটা হলেও বিশ্বাসযোগ্যতা আছে, তিনি তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করতে পারেন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনিয়মের এত তথ্য থাকা সত্ত্বে¡ও এই নির্বাচন কমিশন দিয়ে আর কোনো নির্বাচন করা ঠিক হবে না বলে মনে করেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ। বিশিষ্ট কলামিষ্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, অতীতে বাংলাদেশে অনেক অস্বচ্ছ নির্বাচন হয়েছে, গোঁজামিলের নির্বাচন হয়েছে। এবারে নির্বাচন কমিশন গোঁজামিলে না গিয়ে সোজামিলে চলে গেছে। ‘সোজামিল’ মানে শতভাগ ভোট। সংবাদ সম্মেলনে সুজন সভাপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান সভাপতিত্ব করেন অনুষ্ঠানে।

কলুষিত সরকার জনগণের কাঁধে চেপে বসে যা খুশি তাই-ই করে চলছে। জনগণের স্বার্থ দেখা তাদের মূল কাজ নয়, দেশে-বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়াই তাদের অনেকের কাজ। এগুলো কারা করে, তা দেশের মানুষ ভালো করেই জানে। জোরপূর্বক ক্ষমতায় আসার কারণে নিশ্চয়ই আল্লাহ খুশি হতে পারেন না। দেশে আজ কোনো মানুষেরই নিরাপত্তা নেই, ছেলেধরা-গলাকাটা আতঙ্কে মানুষ দিশাহারা, পথে-ঘাটে চলছে খুন, আগুনে পুড়িয়ে ছাত্রীদের মেরে ফেলা হচ্ছে। ধর্ষণ নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ঘুষ যেন একটি প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যোগ্য লোকের কর্মসংস্থান হচ্ছে না, প্রতিভার নেই মূল্যায়ন। রক্ষক-ভক্ষকে পরিণত হয়েছে, ন্যায়বিচার দেশ থেকে পালানোর উপক্রম। এ রকমের হাজারো অনিয়ম দেশে রয়েছে। কিছু দিন আগে এক রাষ্ট্রে একজন খুন হওয়ার কারণে নিজে ব্যর্থতার দায় নিয়ে সে দেশের পুলিশের আইজি ও স্বরাষ্ট্র সচিব স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। অথচ আমাদের এখানে কী হচ্ছে? ক্ষমতার এত লোভ কেন? দেশের মানুষকে ঠিকমতো নিরাপত্তা দিতে না পেরেও ক্ষমতায় থাকার অন্যায় খায়েশ কেন? হাসপাতালগুলো ডেঙ্গু রোগীতে ভরে গেছে। কিন্তু ডেঙ্গু কোনোভাবেই দমন করা সম্ভব হচ্ছে না। যেখানে রাষ্ট্রনায়করা দাম্ভিকতার স্বরে মিথ্যা কথা বলেন, সেখানে সাধারণ মানুষ আইনশৃঙ্খলা মানবে কেমন করে। নদ-নদীর দুই পাড় অবৈধ দখলদারদের দখলে চলে যাচ্ছে।

ফলে বন্যায় ডুবছে দেশ আর নদীর ভাঙন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বেড়ে গেছে খুনখারাবি। অন্যায়-অপরাধ অনেক বেড়েছে। কেননা, দেশের মানুষ অনেক ক্ষমতাবানদের অনুসরণ করছে, তাদের কাজকর্মে তাদের প্রতি চরম অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে। এভাবে দেশ চলতে থাকলে গণতন্ত্রের অস্তিত্ব বিলীন হতে পারে। ফলে দেশ ও জাতিকে চরম মূল্য দিতে হবে। ইতোমধ্যেই দেশ নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গেছে। এ মুহূর্তেই আমাদের বুঝতে হবে, দেশ বাঁচাতে হলে আমাদের কী কী করা প্রয়োজন।


আরো সংবাদ