১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

প্রিয়া সাহার অপ্রিয় বাতচিত

প্রিয়া সাহার অপ্রিয় বাতচিত - ছবি : সংগ্রহ

হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং দুদকের উপপরিচালক মলয় সাহার সহধর্মিণী প্রিয়া বালা সাহা ঐক্য পরিষদের মনোনীত দলের সফরসঙ্গী না হওয়া সত্ত্বেও ‘সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধি’ হিসেবে সম্প্রতি বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে হোয়াইট হাউজ অফিসে সাক্ষাৎ করতে সক্ষম হয়েছে। অথচ বাংলাদেশ থেকে প্রেরিত, ঐক্য পরিষদ প্রতিনিধিদলের নেতা নির্মল চ্যাটার্জীর সে সৌভাগ্য হয়নি। প্রিয়া সাহা ঢাকা বিমানবন্দরে তার নির্ধারিত ফ্লাইট মিস করলেও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিশেষ ফ্লাইটে ওয়াশিংটন পৌঁছে ট্রাম্পের আমন্ত্রণ রক্ষা করতে সফল হন। বিশ্বের যে তিনজন সংখ্যালঘু নেতা ট্রাম্পের সাথে কথা বলার সুযোগ পেয়েছে তাদের মধ্যে তিনিও একজন। প্রিয়া সাহা ‘মুসলিম মৌলবাদী’দের অত্যাচারে বাংলাদেশ থেকে তিন কোটি ৭০ লাখ হিন্দু দেশত্যাগের পরিপ্রেক্ষিতে সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধ করতে এবং তারা যাতে নিরাপদে ও শান্তিতে বাংলাদেশে বসবাস করতে পারে, তার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। প্রিয়া সাহার আমন্ত্রণ পাওয়া, যুক্তরাষ্ট্রে গমন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাথে কথা বলার সুযোগ পাওয়া- সবই রহস্যঘেরা এবং নীলনকশার অংশ বলে বাংলাদেশের জনগণ মনে করে। সম্মেলনে প্রেরিত হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের প্রতিনিধিদলের নেতা নির্মল চ্যাটার্জীর এ ব্যাপারে নিশ্চুপ থাকাও রহস্যজনক।

প্রিয়া সাহার বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগের প্রতিক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন দলের ঊর্ধ্বতন নেতারা প্রথমে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার পর দলটির সমর্থকেরা তার বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ মামলা করা শুরু করে দেন। বিষয়টি জানতে পেরে তখন লন্ডনে অবস্থানরত প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করার জন্য নির্দেশদানের পরিপ্রেক্ষিতে দলীয় নেতাকর্মীরাই শুধু চুপসে যাননি, সাথে সাথে দায়েরকৃত মামলাও শুনানি ছাড়াই খারিজ হয়ে যাওয়ার নজির সৃষ্টি হলো। সরকারি দলের এই পিছু হটা আরো রহস্যের জন্ম দেয়। এ দিকে প্রিয়া সাহা বাংলাদেশের এক সাংবাদিকের সাথে ভিডিও সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তার বক্তব্যের ব্যাপারে জানান, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলে থাকাকালীন সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রতিবাদে যে ভূমিকা রেখেছিলেন তাতে অনুপ্রাণিত হয়ে এবং তাকে অনুসরণ করে তিনি এই বক্তব্য দিয়েছেন। জনতা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবুল বারকাতের লেখা বইয়ের তথ্যে বাংলাদেশ থেকে তিন কোটি ৭০ লাখ হিন্দু ‘নিখোঁজ’ হয়ে যাওয়ার কথা তিনি বলেছেন। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া না এলেও ড. বারকাত তার বইয়ের তথ্য বিকৃত করে খণ্ডিতভাবে উপস্থাপনের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। প্রিয়া সাহার বক্তব্য ও ক্ষমতাসীন দলের পিছু হটা থেকে প্রতীয়মান হয়, ‘সেমসাইড ফাউল’ হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে সংখ্যালঘু হিন্দুদের নেতা সীতাংশু সংবাদ সম্মেলন করে প্রিয়া বালা সাহার অভিযোগের পক্ষে জোরালো সমর্থন জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে সংখ্যাগুরু জনগণের কিছু বলার না থাকলেও আনুপাতিক হারে বেশি সুযোগ সুবিধা ভোগ করার সুযোগ দেয়ার পরও তাদের সাম্প্রদায়িক ‘মুসলিম মৌলবাদী’ তকমা দেয়ায় বিস্মিত হলেন দেশের মানুষ।

মন্ত্রী মহোদয়দের বক্তব্যে জানা যায়, হিন্দু জনগোষ্ঠীর সদস্যরা সংখ্যায় ৮ শতাংশ হয়েও চাকরি-বাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে ২৫-৩০ শতাংশ সুযোগ সুবিধা ভোগ সত্ত্বেও তারা প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ করছেন। যেহেতু সংখ্যালঘুদের দেখভালের জন্য তাদের কাছে নির্ভরযোগ্য একমাত্র রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে মনে করা হয়, তাই ওই দলের মন্ত্রীদের দেয়া এই তথ্য ১০০ শতাংশ সঠিক বলে জনগণ বিশ্বাস করে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতাসীন মহলের বক্তব্য মতেই, সংখ্যালঘুদেরকে আনুপাতিক হারে প্রাপ্যের চেয়ে ১৮-২২ শতাংশ বেশি সুবিধা দেয়া হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন বাংকে ও সরকারি অফিসে এবং বিচার বিভাগে চাকরির পরিসংখ্যান নিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। দৃশ্যত বেশি সুযোগ সুবিধা পাওয়ার পরও সন্তুষ্ট নন বিধায় অসন্তুষ্টি বা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন প্রিয়া সাহা। দুদকের একজন উপপরিচালক এবং তার স্ত্রী যিনি একটি এনজিও চালান, তাদের আয় দিয়ে দুই সন্তানের যুক্তরাষ্ট্রে লেখাপড়ার ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব কি? আয়কর নথি পর্যালোচনা করলেই আসল ব্যাপার জানা যাবে। জানি না, দুদক তা করবে কি না।

প্রতিবেশী দেশের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে মুসলমানদের সংখ্যা জনসংখ্যার ২৮ শতাংশ হলেও সরকারি চাকরিতে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত কংগ্রেস শাসনামলে তাদের সংখ্যা ছিল ২ শতাংশ। ১৯৭৭ থেকে ২০১১ পর্যন্ত বাম ফ্রন্টের রাজ্যসরকার ক্ষমতায় থাকাকালে ৩৫ বছরে মুসলমানদের চাকরি প্রাপ্তি ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২ শতাংশ থেকে মাত্র ৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। ২০১১ সালে তৃণমূলের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার পর মসজিদের ইমামদের মাসিক ভাতা দেয়ার ব্যবস্থা করার ‘খেসারত’ তাকে দিতে হয়েছে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির কাছে ১৮টি আসন হারিয়ে। পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যাগুরু জনমতের বর্তমান যে মনোভাব, তাতে মাত্র দুই বছর পর ২০২১ সালে বিধানসভা নির্বাচনে ‘দিদি’র পরাজয় ‘অবশ্যম্ভাবী’ বলে মনে করা হচ্ছে।

কারণ তিনি মসজিদের ইমামদের ভাতা মঞ্জুর করায় ‘সংখ্যাগুরু’ ভোটাররা তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন। তদুপরি, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগেই রাষ্ট্রপতির শাসন জারির মাধ্যমে মমতা সরকারের পতন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ৭২ বছর ধরে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ নীতি অনুসরণ করে দেশের শাসনকার্য পরিচালিত হলেও সেখানে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা তলানিতে এসে ঠেকেছে। তবে সেই দেশের সংখ্যালঘুরা কোনো নালিশ জানাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে দেখা করার আমন্ত্রণ বা সুযোগ কখনো পাবেন বলে মনে হয় না।

মানুষ ভালো থাকার জন্য এবং বেশি সুযোগ সুবিধার আশায় এক দেশ থেকে অন্য দেশে মাইগ্রেট করে থাকে। ১৯৪৭ সালের পর বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে লাখ লাখ মানুষ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে এসেছেন। প্রিয়া সাহাও তার দুই মেয়েকে একই উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছেন। তৎকালীন পূর্ববঙ্গের বেশির ভাগ জমিদার, ধনী ব্যবসায়ী ও কুসিদজীবী ছিলেন প্রধানত একটি সম্প্রদায়ের। তারা জমির খাজনা ও ঋণের সুদের টাকার জন্য গরিব চাষিদের ওপর অনেক নিপীড়ন চালিয়েছিলেন। তবে তাদের বেশির ভাগ ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টের আগেই এবং বাকিরা পঞ্চাশের দশকে পশ্চিমবঙ্গে প্রস্থান করেছিলেন। তাদের ঋণের সুদের ফাঁদ থেকে নিরীহ চাষিদের রক্ষা করার জন্য তদানীন্তন বঙ্গীয় মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হককে ঋণ সালিশি বোর্ড গঠন করতে হয়েছিল। জোতদার হিন্দুরা অনেকে জমিজমা বিক্রি করে ষাটের দশক থেকে শুরু করে নব্বই দশক পর্যন্ত বাংলাদেশ ত্যাগ করেছেন। এমনকি, এক জমি গোপনে দুইজনের কাছে বিক্রি করার ঘটনাও ঘটেছে। তাতে অনেক মামলা-মোকদ্দমার উদ্ভব হয়েছে। অনেকে এ দেশের উপার্জিত আয় সীমান্তের ওপারে পাচার করে ওইখানে প্রচুর ধনসম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন বা ভালো অবস্থানে আছেন।

অনেকে তাদের সম্পত্তির মূল্যের চেয়ে বেশি অঙ্কের ঋণ ব্যাংক থেকে নিয়ে বা ব্যবসায়ী সমিতির কাছ থেকে সুদে মোটা অঙ্কের টাকা ধার করে রাতের আঁধারে দেশ ত্যাগ করে চলে গেছেন। তা ছাড়া ১৯৭১ সালের পর গরিব হিন্দুরা বিভিন্ন এনজিও এবং ব্যাংক থেকে কৃষিঋণ গ্রহণ করে তা পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে বাড়িঘর গোপনে বিক্রি করে দেশ ত্যাগ করার ঘটনা অনেক। সংখ্যাগুরু মুসলমান ধনী ব্যক্তিরা ঋণের টাকা পাচার করে বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন। গরিবেরা গ্রাম থেকে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে ডেরা বেঁধেছেন। অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত গ্রামে গ্রামে ঘুরে অনুসন্ধান চালিয়ে তার গবেষণার প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ না করে ঐকিক নিয়মে অঙ্ক কষে ‘তিন কোটি ৭০ লাখ হিন্দু নিখোঁজ’ হয়ে যাওয়ার তথ্য প্রদান করেছেন। এর মাধ্যমে প্রিয়া বালা সাহাদের হাতে একটি হাতিয়ার তুলে দিয়েছেন। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যরাতের নির্বাচনে ভোটাররা ব্যাপক ভোট দিতে না পারার অভিযোগ ব্যাপক। তবুও ‘স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ’ করতে পারার জন্য হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের নেতারা সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তাদের দৃষ্টিতে সুব্রত চৌধুরী, গয়েশ্বর রায়, নিতাই রায় চৌধুরী, গৌতম চক্রবর্তী এবং মিল্টন বৈদ্য- এরা কেউ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত নন, কারণ তারা বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ছিলেন। বাস্তবেও তাদেরকে নির্বাচনে প্রচারণা চালাতে দেয়া হয়নি এবং লাঞ্ছিত করা হয়েছে। প্রিয়া সাহার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় চায়ের কাপে ঝড় তুলে লাভ নেই। অচিরেই ঘটনা জানা যাবে, এর জন্য দায়ী কারা বা কোন দল।


আরো সংবাদ

আয়কর আপিল ট্রাইব্যুনালে জেলা জজ নিয়োগ দেয়া হবে : আইনমন্ত্রী ডিআইজি প্রিজনস পার্থ গোপালের জামিন নাকচ খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে মৎস্যজীবী দলের মানববন্ধন দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যাংক কর্মকর্তাদের তালিকা পাঠানোর নির্দেশ অধিক সার ব্যবহার পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর : কৃষি মন্ত্রী যথাযথ সেবা পেলে মানুষ কর দিতে উৎসাহিত হবে : এলজিআরডি মন্ত্রী নিরাপদ অভিবাসনের লক্ষ্য পূরণই আমাদের অঙ্গীকার প্রতিবন্ধীদের অধিকার সুরক্ষা আইন ২০১৩ বাস্তবায়নের আবেদন সাইটসের্ভাসের ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে আ’লীগের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির সম্মেলন করার নির্দেশ হাসপাতালে নবজাতক কন্যা ফেলে বাবা-মা উধাও ঢাবিতে ‘ইয়ুথ ইমপ্যাক্ট : আনলিশিং দ্য পাওয়ার অব ইয়ুথ’ শীর্ষক সেমিনার শুরু

সকল