২২ আগস্ট ২০১৯

অস্থির সমাজ

-

কালের আবর্তন বিবর্তন সূর্যের ঘূর্ণায়ন সাক্ষী হয়েছে বহু ইতিহাসের, অনেক সাম্রাজ্য সামন্তের পরিসমাপ্তি ঘটেছে এই ভূগোল থেকে। নানা যুদ্ধক্ষেত্রে অস্তমিত হয়েছে বহু স্বাধীন ভূখণ্ডের। আবার এই যুদ্ধক্ষেত্র থেকেই উদিত হয়েছে নীলিমা পূর্বদিগন্তে রক্তিম সূর্যের। প্রিয় মাতৃভূমি সোনার বাংলার স্বাধীনতার সূর্যও এভাবে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর আলো দিতে শুরু করে তার ৫৬ হাজার বর্গমাইল ভূমির সবুজ ভূখণ্ডে আশ্রিত সাড়ে ৭ কোটি জনতাকে। একটি সংবিধান, একটি সংসদ আর একটি পতাকা নিয়ে উঠে দাঁড়াতে চেয়েছে আমার বাংলাদেশ। দুই শতাধিক রাষ্ট্রের মাঝে নিজের এক সম্মানজনক অবস্থান তৈরির জন্য পার করেছে ইতোমধ্যে ৪৮ বছর।

প্রতিহিংসাপরায়ণতা থেকে শুরু করে উদরপূর্তি সবই হয়েছে এ দেশের রাজনীতিতে। কেন্দ্র থেকে শুরু করে একেবারে মফস্বল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে লোভ লালসা, সুদ, ঘুষ ও দুর্নীতির মতো নানা সামাজিক ব্যাধি। সাধারণ একজন ওয়ার্ড কমিশনার থেকে নিয়ে প্রতাবশালী মন্ত্রী পর্যন্ত কেউই বের হতে পারেননি এই অসৎ গণ্ডির বেড়াজাল থেকে। ফলে স্বাধীনতা-উত্তর ৪৮ বছর অতিবাহিত হতে চললেও পরিবর্তন হয়নি আমাদের সমাজ ব্যবস্থাপনার।

জরাজীর্ণ দশা, বরং অনেক ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে পড়েছি অনেক বেশি। আকার বেড়েছে আমাদের দেশ পরিচালনার বাজেটে; কিন্তু ক্ষুধা দারিদ্র্যমুক্ত সুন্দর একটি সমাজব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বেড়ে গেছে অতি ধনীর সংখ্যা, কিন্তু কমে যায়নি হতদরিদ্র মানুষের ক্ষুধার কষ্ট। ফসলের ন্যায্য দামের জন্য অসহায় কৃষকের আর্তনাদ এখনো শাসকগোষ্ঠীর ঘুম ভাঙায়নি। রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে আপন সন্তানের মতো স্নেহ ও মায়াভরা হাতে রোপণ করা সোনালি ফসল যখন প্রকৃত দাম না পাওয়ার ক্ষোভে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়, তখন স্বাধীন দেশে বসবাস করা একজন বাঙালির জন্য তা হয়ে দাঁড়ায় খুবই কষ্টকর।

আর সেই কষ্টের যন্ত্রণাকে আরো তীব্রতর করে তোলে যখন এ দেশেরই মন্ত্রী কৃষকের সেই কষ্টকে উপেক্ষা করে কৃষকের সাথে উপহাস করে। পাটকল থেকে চালকল সব কিছুরই দখল সব সময় থেকেছে ক্ষমতাসীন দলের এমপি মন্ত্রীদের হাতে। ফুলে ফেঁপে কলাগাছ হয়েছে এসব মধ্যস্বত্বভোগী। আর ক্ষুধার কষ্ট পেটে চেপে অনাহার রাত পার করেছে আমার দেশের মেহনতি শ্রমজীবী কৃষক মজুর; কিন্তু এতসবের পরও যখন শুনি অর্থনৈতিকভাবে আমরা অনেক এগিয়ে, তখন বুঝতে বাকি থাকে না এসব অর্থনৈতিক সুবিধা শুধু ধনীদের অতি ধনী করার জন্য আর দরিদ্রদের দরিদ্রে পরিণত করার জন্য।

ব্যক্তি থেকে সমাজ আর সমাজ থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত সর্বত্রই আজ এক মহামারী দুর্নীতি। প্রবলভাবে গ্রাস করে রেখেছে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে। দুর্নীতির লোভাতুর ছোবল থেকে রক্ষা পায়নি দুর্নীতি দমন কমিশনও। স্বেচ্ছাচারিতা আর জবাবদিহির অভাবে দুর্নীতির অভিযোগ বিরুদ্ধবাদীদের দমন করার সর্বোত্তম কৌশলে পরিণত হয়েছে। সমাজের উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত পর্যন্ত কেউই আজ রেহাই পাচ্ছে না সহজলভ্য এই অভিযোগের কুদৃষ্টি থেকে। ফলে তা আজ কারো পৌষ মাস আর কারো সর্বনাশের সর্বোত্তম প্রতীক হয়ে ভোগবাদীদের খায়েশ পূরণ করছে।

গুম, খুন, ধর্ষণ, জুলুম, নির্যাতন ও দমনপীড়নের যে সর্বব্যাপী আগ্রাসী অপতৎপরতা আজ আমাদের ব্যক্তি জীবন থেকে নিয়ে জাতীয় জীবন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে, তা রোধ করা ক্রমেই দুঃসাধ্য হয়ে উঠছে। যদি এখনই তার বেপরোয়া লাগাম টেনে ধরা না যায়, তবে হয়তো বা আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম এই জনপদকে এসব নোংরা নরাধমদের অপবিত্র থাবা থেকে মুক্ত করার জন্য আরেকবার বাংলার সূর্য সন্তানদের অস্ত্র হাতে নিজ দেশের নিজ ঘরের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।

মানবতা ও মনুষ্যত্বের কবর রচনা করে যে পৈশাচিকতার ধারা আজ আমাদের গ্রামগঞ্জের মাঠঘাটের বস্তি থেকে নিয়ে ইট-পাথরে ঘেরা দালান ইমারতের শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে, তা বাংলার ইতিহাসের যেকোনো অধ্যায়কে খুব সহজভাবে পরাজিত করতে সক্ষম। যে দেশে একটি হত্যা স্বৈরাচারী শাসকের শক্ত ভিতকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। হাজার হাজার লাখ লাখ বাঙালির বেঘোর ঘুমে বজ্রাঘাত করে জাগিয়ে তুলেছিল, সে দেশে আজ যখন বদরুলেরা খাদিজাদের প্রকাশ্যে রাস্তায় ফেলে কুপিয়ে জখম করে, প্রকাশ্যে জনসম্মুখে রিফাতদের সন্ত্রাসীদের চাপাতির খোরাকে পরিণত হতে হয়, যেখানে মিন্নিদের আকুল আবেদন উপস্থিত জনতার আত্মমর্যাদাবোধে আঘাত হানতে সক্ষম না হয়, সে দেশে কিভাবে মানবতার বিজয় সাধিত হবে, কিভাবে মানুষ্যত্বের উন্নত বিকাশ সমাজকে আলোকিত করবে, আঁধারের ঘোর অমানিশা থেকে জাতিকে মুক্ত বাতাসে প্রশান্তির শ্বাস গ্রহণের সুযোগ করে দেবে- তা আমার ক্ষুদ্র বিবেকে অনেক কঠিন বলে মনে হচ্ছে।

দিল্লির রাজপথে যখন ধর্ষিতা জ্যোতির নগ্নদেহ বিশ্ব মানবতার বিবেককে মারাত্মকভাবে আহত করেছিল তখন এর ধাক্কা ঢাকায়ও এসে আছড়ে পড়েছিল। সে সময়ের পত্রপত্রিকা সভা সেমিনারগুলোর আলোচনার অন্যতম প্রতিপাদ্য হয়ে উঠেছিল দিল্লি ধর্ষণ, সে সময়ে ঢাকার কোনো এক পত্রিকায় দেখিছিলাম লেখা হয়েছে, ধর্ষণের শহর দিল্লি। পত্রপত্রিকার প্রবন্ধ নিবন্ধে ফুটে উঠেছিল দিল্লি নারীদের জন্য কতটা অনিরাপদ তার লোমহর্ষক বর্ণনা। কিন্তু তা আজ সুদূর অতীত। একের পর এক চলন্ত বাসে গণধর্ষণ ও ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা আন্তর্জাতিকভাবে দারুণভাবে ক্ষুণœ করেছে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা। বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রতিনিয়ত প্রকাশ পাচ্ছে শিশুধর্ষণ থেকে নিয়ে রাজনৈতিক কারণে গণধর্ষণের বীভৎস বর্ণনা। ঢাকার জাতীয় দৈনিকের প্রবন্ধের শিরোনাম হচ্ছে ‘ধর্ষণে দিল্লির পথে হাঁটছে ঢাকা’। গুম খুন ধর্ষণের কুৎসিত ঘটনার জঘন্য বিবরণ সংবলিত ইত্যাকার নানা বিষয় প্রতিনিয়ত প্রকাশ পাচ্ছে নানা সংবাদ। যা একটি স্বাধীন দেশের ভাবমর্যাদাকে নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে আন্তর্জাতিক সভ্য মহলের কাছে।

৯০ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে যখন মহান আল্লাহর নাফরমানি এতটা ব্যাপক ও প্রকাশ্যভাবে চলতে থাকে, তখন একজন মুসলিম হিসেবে আল্লাহর প্রিয় রাসূল সা:-এর সতর্কবাণী আমাদের অন্তরাত্মাকে কাঁপিয়ে তোলে। আল্লাহর রাসূল সা: বলেন, যখন কোনো সম্প্রদায়ের মধ্যে গুনাহ চলতে থাকে, আর তাদের বেশির ভাগ লোক গুনাহে মত্ত, লোকেরা সক্ষম তাদের অবস্থা পরিবর্তন করতে অথচ তারা তা করে না, অতিসত্বর সে জাতির ওপর আল্লাহ ব্যাপক আজাব অবতীর্ণ করবেন। আবু দাউদ-হা. ৪৩৩৮

এহেন পরিস্থিতিতে জনবহুল এই ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে একের পর এক ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা আল্লাহর প্রিয় হাবিব সা:-এর সতর্কবাণীর কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

আল্লাহর ভূখণ্ডে আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ কেবল আমাদের ধ্বংসকেই ত্বরান্বিত করবে, তাছাড়া আমাদের আর কিছুই অর্জিত হবে না। অতএব খোদা প্রদত্ত আজাব গজব থেকে বাঁচার জন্য ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র সবার ঐক্যবদ্ধ প্রয়াশ অত্যাবশ্যকীয়। আল্লাহ আমাদের তার ক্রোধাগ্নি থেকে বাঁচার তৌফিক দান করুন। আমীন।

লেখক : শিক্ষানবিস, কওমি মাদরাসা


আরো সংবাদ

৭৫-এর পরিকল্পনাকারীদের বিচারে জাতীয় কমিশন গঠনের দাবি রাজধানীতে জেএমবির চার সদস্য গ্রেফতার ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে : প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমারে ফিরে না গেলে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে পাঠানো হবে : পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদ সচিবালয়ের আবাসন সমস্যা দূর করতে আরো ৫০০ ফ্যাট কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদে ভেলায় সবজি চাষ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে বিনিয়োগ করার আহ্বান অবশেষে রোহিঙ্গারা ফিরছেন আজ থেকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি আরো অবনতির আশঙ্কা ১৫ আগস্ট আর ২১ আগস্টের হত্যাকাণ্ড একই সূত্রে গাঁথা : কাদের কাশ্মির নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে যাবে পাকিস্তান

সকল




mp3 indir bedava internet