২১ আগস্ট ২০১৯

ভাগ্যবান এরশাদ

হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ - ফাইল ছবি

বাংলাদেশের একটি বড় রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। সামরিক বাহিনীর প্রধান থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ সহ নানা কারণে আলোচিত-সমালোচিত এই ব্যক্তিকে আমার কাছে ‘ভাগ্যবান রাজনৈতিক ব্যক্তি’ বলেই মনে হয়। চিন্তা করে দেখুন, এ যাবৎকালে বাংলাদেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধানদের মধ্য থেকে একমাত্র হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদেরই স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। স্বাধীনতার পরপরই পচাঁত্তরের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর একদল বিপদগামী সদস্যরা বঙ্গবন্ধুসহ পরিবারকে হত্যা করে ধ্বংসের রাজনীতি শুরু করেছেন। একই বছরের ৩ নভেম্বর প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদে, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মুনসুর আলী ও কামরুজ্জামানের মতো জাতির সূর্যসন্তানদের কথিত জেল হত্যার মাধ্যমে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকেও মিলিটারী ক্যু’র মাধ্যমে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।

এ ধরণের নজির সাম্প্রতিক মিশরেও তৈরী হয়েছে। মিশরের প্রথম গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসি আদালতের এজলাসেই মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েন। স্বৈরাচার সিসি এতে কোন পাত্তাই দিচ্ছে না বরং মুরসির পরিবার ও তার ছেলেদের নজরবন্দি করে রাখা হয়েছে। মুরসির দল ফ্রিডম এন্ড জাস্টিস পার্টির নেতাকর্মীদের হত্যা, হয়রানি, দেশান্তর করা হচ্ছে। ঠিক তেমনি যখন বাংলাদেশে অতিত এবং বর্তমানে বড় দলের প্রতিষ্ঠাতারা জেল হত্যা, গুপ্তহত্যা, ষড়যন্ত্রে মৃত্যু বরণ করেছে। বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কারাগারে রয়েছে। তিনিও অন্যান্যদের মতো জেলেই মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েন কিনা তাও বলা যায় না। যখন দেশে বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, খুন বেড়ে গেছে। স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি কমে গেছে। রাজনৈতিক টর্চারিং ফ্যাশন হয়ে গেছে তখন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সুন্দর-স্বাভাবিক মৃত্যুতে এরশাদকে ‘ভাগ্যবান’ বলাই যায়।

অনেকে বলবে, এরশাদ যদি পল্টিবাজির রাজনীতি না করতেন এবং ক্ষমতার কাছাকাছি না থাকতেন, ম্যানেজের রাজনীতি না করতেন তাহলে তাকেও এ ধরণেই ভাগ্যবরণ করতে হতো। বিষয়টিতে আমিও একমত।কারণ এরশাদের পতনের পর তিনি যতটানা আবারও ক্ষমতারোহনের চেষ্টা করছেন তার চেয়ে বেশি নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য রাজনীতি করেছেন।

প্রেসিডেন্ট এরশাদ ক্ষমতা দখল, দেশ পরিচালনা, রাজনৈতিক কারসাজির কারণে স্বৈরাচারী তকমা নিয়ে বেঁচে ছিলেন র্দীঘদিন। এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রথম বলি হলেন জয়নাল, কাঞ্চন, মোজাম্মেল, জাফর ও দীপালি সাহা। এছাড়াও নূর হোসেন, মঞ্জু ও ডা. মিলন সংগ্রাম ও শহীদ হওয়ার ঘটনা সকলের জানা। এর পাশাপাশি প্রবীণদের বলতে শুনেছি, এরশাদ সামরিক শাসনের কড়াকড়ির সঙ্গে নরম জবানের একটা সুন্দর সমন্বয় সাধন করতে পারতেন। মানুষকে বোকা বানানোর ক্ষমতাও ছিল অসাধারণ। তার শাসনামলে কিছু প্রশাসনিক ও শাসনতান্ত্রিক উন্নয়নের কথা অস্বীকার করা যায় না। লোকপ্রশাসন পড়তে হলে আপনাকে অবশ্যই তখনকার উপজেলা ব্যবস্থা প্রবর্তন, জেলা-উপজেলা ভিত্তিক ৩ স্তরবিশিষ্ট বিকেন্দ্রীকরণমূলক প্রশাসন প্রবর্তন, ৪৬০ থানাকে উপজেলায় উন্নীত করা, শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি ঘোষণা, গ্রাম সরকার পদ্ধতি বিলোপ, হাইকোর্ট বেঞ্চ সম্প্রসারণ, প্রতি জেলায় মুন্সেফ কোর্ট তৈরীর অবদান স্বীকার করতে হবে। নারী নির্যাতনের জন্য কঠোর শাস্তি, প্রেস কাউন্সিল গঠন, আর্থিক নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ, কৃষক ও কৃষি উপকরণ সহজলভ্য করা, সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণ, জাতীয় ঈদগাহ নির্মাণ, তিন জাতীয় নেতার মাজারের নির্মাণ কাজসহ ভূমিহীনদের জমি প্রদান ও গুচ্ছগ্রাম করে পল্লী-গ্রামের মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয়তা ছিল তার। এছাড়াও তার শাসনামলে সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম যোগ করে একটা বড় জনসংখ্যাকে খুশি রেখেছেন।

সর্বশেষ এরশাদ মসনদ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ সালে। তারপর অবৈধ শাসন ও দুর্নীতির দায়ে জেল খেটেছেন। কিন্তু আবারও এই আওয়ামীলীগ বিএনপি তাকে প্রয়োজনে রাজনীতিতে পুর্নবাসন করেছে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর হাসিনা এবং খালেদা দুই নেত্রী এরশাদের কাছে হাজির হয়ে জোট করতে অনুনয় বিনয় করেন। তাদের সমর্থন দানের জন্য আবারও রাষ্ট্রপতি বানানোর প্রলোভনও দেখানো হয়েছে বারবার। তারপর থেকে ক্ষমতা ও রাজনীতির ক্রীড়নক হয়েছিলেন তিনি। এখনও তার দল সিস্টেমাটিক বিরোধী দলে আছে। রংপুরের মানুষ এখন সংবাদ সম্মেলন করে তার মরদেহ সেখানে দাফনের দাবি করছে। তবে এরশাদ শূন্য বর্তমান জাতীয় পার্টির অস্তিত্ব ও দাপট কতদিন টিকে থাকবে? নাকি আবার নেতৃত্বের দ্বন্ধে ভাঙ্গণ বা বিভাজন তৈরী হবে তা দেখার বিষয়।

সেই আশির দশক থেকে আজও সবচেয়ে আলোচিত এরশাদের ভালোমন্দ ইতিহাস মূল্যায়ন করবে। তবে একটা বিষয় বলতে হয় যে, এরশাদ ক্ষমতা থাকা অবস্থায় যে স্বৈরাচারী নীতি অবলম্বন করেছেন কিংবা কিছু কাজ করেছেন। সেটা তরুণ প্রজন্ম দেখেনি! শুনেছে আর প্রতিবাদ করেছে। কিন্তু ৯০ সালের পরে এরশাদ যখন আবারও রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হলেন, তখন থেকেও যদি স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে গণতন্ত্রের পক্ষে থাকতেন, জনগণের পক্ষে লড়াই করে দেখাতে পারতেন, তাহলে ৯০ পরবর্তী তরুণ প্রজন্ম আরো বেশি দিন তাকে মনে রাখতেন!

লেখক : শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (মাস্টার্স, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ)


আরো সংবাদ




mp3 indir bedava internet