০৭ ডিসেম্বর ২০১৯

মক্কায় পরাজয়

রমজানুল মোবারকের শেষ জুমা। ১৬ বছরের আব্দুল্লাহ মসজিদে আকসায় জুমার নামাজ আদায়ে দৃঢ়সঙ্কল্পবদ্ধ। সে জানত, মসজিদে আকসায় নামাজ আদায়ের খায়েশ তার জীবন পর্যন্ত নিয়ে নিতে পারে। কেননা ইসরাইলি সৈন্য মসজিদের দিকে যাওয়ার সব রাস্তায় চেকপোস্ট বসিয়ে রেখেছে। মসজিদে আকসার দিকে গমনকারী ফিলিস্তিনি মুসলমানদের ওই চেকপোস্টে নিজের পরিচয় দিতে হয়। জুমার নামাজের অনুমতি শুধু তারাই পায়, যাদের বয়স ৪০ বছরের বেশি অথবা ১৩ বছরের কম।

ফিলিস্তিনি যুবকদের জুমার দিন মুসলমানদের প্রথম কিবলায় প্রবেশ করা নিষিদ্ধ। তবে আব্দুল্লাহ এ নিষেধাজ্ঞা ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে অজু করে চুপিচুপি ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে। মসজিদে আকসার দিকে যাওয়ার সব রাস্তায় ইসরাইলি সৈন্যের পাহারা তার মনোবল ভাঙতে পারেনি। বেথেলহাম থেকে পূর্ব জেরুসালেমের দিকে যাওয়ার একটি রাস্তা ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। আব্দুল্লাহ ব্যারিকেড টপকানোর চেষ্টা করলে কাছের একটি ভবনের ছাদে থাকা ইসরাইলি সৈন্য তার বুক লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে।

যে হৃদয় মসজিদে আকসায় জুমাতুল বিদার নামাজ আদায় করার জন্য ছিল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, ইসরাইলি সৈন্যের গুলি সে হৃদয়ের এপার-ওপার হয়ে গেল। আব্দুল্লাহকে বেথেলহামের একটি হাসপাতালে নেয়া হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে তার পিতা হাসপাতালে পৌঁছে যান। তিনি তার কলিজার টুকরার নিঃশ্বাস তালাশের চেষ্টা করেন, কিন্তু তার কলিজার টুকরা রোজা থাকা অবস্থাতেই শহীদ হয়ে যায়। পিতা পুত্রের চুলে হাত বুলাতে থাকেন। তার মাথায় চুম্বন করে বললেন, ‘তুমি নামাজ আদায় করতে গিয়েছিলে। কোনো অন্যায় তো করতে যাওনি। জালিমরা তোমাকে গুলি মেরেছে। আল্লাহ তোমার কোরবানি কবুল করুন।’

শহীদ পুত্রের মাথার কাছে দাঁড়ানো ওই পিতার ভিডিও মক্কা মোয়াজ্জামায় দেখেছি। আমি জুমার নামাজ আদায় করার পর ওআইসি নেতৃবৃন্দের সম্মেলনের মিডিয়া সেন্টারে সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত জোট বাহিনীর মুখপাত্র, কর্নেল তুরকি আল মালিকির প্রেস ব্রিফিংয়ে বসেছিলাম। কর্নেল আল মালিকির সাথে ইয়েমেনস্থ সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত মুহাম্মদ আল জাবেরও ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন। তুরকি আল মালিকির দাবি, হুতি বিদ্রোহীরা ইরানের পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে। তারা এ পর্যন্ত সৌদি আরবে ২২৫টি মিসাইল বর্ষণ এবং ১৫৫টি ড্রোন হামলা করেছে। আমার পাশে বসা এক সুদানি সাংবাদিক আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, এ কনফারেন্সে জেনারেল রাহিল শরিফকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। তিনি কোথায়? আমি এ ব্যাপারে অজ্ঞতা প্রকাশ করলাম।

একজন ইরাকি সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলেন, জেনারেল শরিফ কি মোটা অঙ্কের বেতনের জন্য জোট বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করেছেন, নাকি তিনি সরকারি পলিসির আওতায় এ পদ নিয়েছেন? তার জবাব দিতে যাবো, তার আগেই এক ফিলিস্তিনি বন্ধু শহীদ আব্দুল্লাহর পিতার ভিডিও আমাকে প্রেরণ করে। আমি ভিডিও দেখে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ওই ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে আরো অনেক তথ্য পেলাম। আমি আসন বদল করে এবং পেছনে গিয়ে বসলাম। এক বাংলাদেশী সাংবাদিক ভিডিওটিই এক মিসরি সাংবাদিককে দেখিয়ে তাকে ইংরেজিতে বলছেন- ‘দেখো, মক্কায় পুরো ইসলামী দুনিয়ার নেতৃবৃন্দ এক জায়গায় বসে আছেন, আর ইসরাইল আজ জুমাতুল বিদার দিনে নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের ওপর গুলি বর্ষণ করছে।’

মিসরের সাংবাদিক এ কথাটির প্রতি মনোযোগ দিলেন না। তার সব মনোযোগ আটকে ছিল কর্নেল তুরকি আল মালিকির পক্ষ থেকে ইরানের ওপর আরোপিত অভিযোগগুলোর প্রতি। তার ভ্রুক্ষেপহীনতায় বাংলাদেশী সাংবাদিক অভিযোগভরা দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। তার চোখে ছিল অশ্র“। তার অশ্র“ দেখে আমার চোখে পানি এসে গেল। তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, ইনশাআল্লাহ আজ রাতে ওআইসির নেতৃবৃন্দের বৈঠকে ফিলিস্তিনিদের ওপর যে নির্যাতন চলছে, তার সর্বাত্মক নিন্দা জ্ঞাপন করা হবে। তিনি জানতে চাইলেন, ‘এটা কি আপনি কোনো সংবাদের ভিত্তিতে বলছেন, নাকি অনুমান?’ আমি বললাম, সংবাদও, অনুমানও। তিনি কানে কানে জানতে চাইলেন, ‘আপনার প্রধানমন্ত্রী কি ফিলিস্তিনের কথা উল্লেখ করবেন?’ দৃঢ়তার সাথে বললাম, আমাদের প্রধানমন্ত্রী ফিলিস্তিনের কথাও বলবেন এবং কাশ্মিরের কথাও বলবেন। ইফতারের কাছাকাছি সময়ে কর্নেল তুরকি আল মালিকির দীর্ঘ ব্রিফিং শেষ হলো। ইফতারের পর আমাদের ওআইসির কনফারেন্সের স্থানে পৌঁছে দেয়া হলো, যার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল রয়েল গার্ডস।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বক্তব্য শেষ হলে বাংলাদেশী সাংবাদিক দৌড়ে আমার কাছে এসে বললেন, ইমরান খান আজ তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের শূন্যতা পূরণ করে দিলেন। ইমরান খানের মুখে গোলানের কথা শুনে বেশির ভাগ আরব সাংবাদিক বিস্ময়াভিভূত হয়েছেন। কেননা এখন কিছু আরব শাসক গোলানের কথা উল্লেখ করেন না, পাছে আমেরিকা অসন্তুষ্ট না হয়ে যায়। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের সময় ইসরাইল গোলানের বিস্তীর্ণ এলাকা সিরিয়ার কাছ থেকে দখল করে নেয়। এখন ওখানে তেল-গ্যাস বের হচ্ছে।

ইমরান খান গোলান থেকে ইসরাইলের দখলদারিত্বের অবসানের দাবি জানান। তিনি ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি বাহিনীর নির্যাতনের কঠোর ভাষায় নিন্দা জ্ঞাপনের পাশাপাশি কাশ্মিরের কথাও উল্লেখ করেছেন। সাহরি পর্যন্ত বহু রাষ্ট্রপ্রধান বক্তৃতা করেন। কনফারেন্সে উপস্থিত পঞ্চাশের বেশি ইসলামী দেশের বেশির ভাগ সাংবাদিকের ধারণা, সবচেয়ে ভালো বক্তৃতা ছিল ইমরান খানের। তার বক্তৃতায় রাসূল সা:-এর অবমাননা থেকে নিয়ে ইসলামোফোবিয়া ও ফিলিস্তিন-কাশ্মিরসহ অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা মক্কা ঘোষণার অপেক্ষায় ছিলাম। এ ঘোষণা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এটা জুমাতুল বিদার দিন মক্কা মোকাররমায় হচ্ছিল।

ঘোষণা সামনে এলে প্রথমে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হলাম যে, এতে ফিলিস্তিনিদের সর্বাত্মক সহযোগিতার সঙ্কল্পের কথা প্রকাশ করা হয়েছে। ঘোষণার মধ্যে কাশ্মিরের বিষয়টি খুঁজছিলাম। আমি খুব দ্রুততার সাথে তা বারবার পড়ছিলাম। আমার অস্থিরতা আঁচ করতে পেরে ভারতীয় পর্যবেক্ষক জিকরুর রহমান মুচকি হেসে আমাকে বললেন, ‘জনাব, এতে কাশ্মিরের উল্লেখ নেই।’ ভারত ওআইসির সদস্য নয়, তথাপি সৌদি সরকার এ সম্মেলনে কয়েকজন ভারতীয় সাংবাদিককেও আমন্ত্রণ করেছিল। কিছুক্ষণ পরই ওআইসির সেক্রেটারি জেনারেলের প্রেস কনফারেন্স শুরু হয়ে গেল।

তিনি সোমালিয়া, রোহিঙ্গা ও শ্রীলঙ্কার মুসলমানের কথা উল্লেখ করলেন; কিন্তু তিনিও কাশ্মিরের কথা ভুলে গেলেন। যখন আমরা তার সাথে বসা সৌদি মন্ত্রী আদিল আল জাবেরকে কাশ্মিরের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলাম, তখন প্রেস কনফারেন্স শেষ করে দেয়া হলো। ইমরান খান এখানে ভালো বক্তৃতা করেছেন, তবে মক্কা ঘোষণা থেকে কাশ্মির শব্দ গায়েব হয়ে যাওয়া পাকিস্তানের জন্য কূটনৈতিক ধাক্কার চেয়ে কম নয়। আব্দুল্লাহ শুধু ফিলিস্তিনে নয়, বরং ‘আব্দুল্লাহ’ তো প্রতিদিন কাশ্মিরেও শহীদ হচ্ছে। কিন্তু আফসোস, মক্কায় পাকিস্তান কাশ্মির মামলায় হেরে গেছে। মক্কা থেকে অবনত দৃষ্টিতে ফিরে এসেছি, প্রধানমন্ত্রীর চোখের দিকে আমি তাকাতে পারিনি। 

হামিদ মীর : পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট,
প্রেসিডেন্ট জি নিউজ নেটওয়ার্ক (জিএনএন)

পাকিস্তানের দৈনিক জং ৩ জুন ২০১৯ সংখ্যা থেকে ভাষান্তর
ইমতিয়াজ বিন মাহতাব


আরো সংবাদ




Paykwik Paykasa
Paykwik